আজ তিনমাস হলো সেলসম্যানের কাজে ঢুকেছে রমেন। তার ইচ্ছে খুব বড়লোক হবে। অনেক টাকা রোজগার করে তিথিকে খুব খুশি রাখবে। প্রায় তিন বছর হতে যায় তাদের সম্পর্কের। খুব ভালোবাসে রমেন তাকে।
তবে শেষ এক সপ্তাহ ধরে কোনো বিক্রি হয়নি রমেনের। বস তাকে বলে দিয়েছে নয়তো বিক্রি করো নাহলে পরের সপ্তাহে কাজ ছেড়ে দাও। রমেন এক একবার ভাবে কাজটা ছেড়ে দেবে কিন্তু ভয় পায় যে কাজটা ছেড়ে দিলে যদি তিথিকে খুশি না রাখতে পারে সে। টাকা ছাড়া কি আর সুখ হয় ????
অগত্যা রমেন ঠিক করলো এই বাড়িটাতেই কিছু বিক্রির চেষ্টা করবে।
যেমন ভাবনা তেমনি কাজ, কলিংবেল টিপলো রমেন।
রমেন : ম্যাডাম আমি "হ্যাপি টেক সার্ভিস" থেকে আসছি। ম্যাডাম আমাদের....
"ইসস.., এত দামের হারটা কিভাবে ফেলে রেখেছে, ফালতু মেয়ে একটা, একে বিয়ে করাটাই আমার ভুল হয়েছিল।" আওয়াজটা ভেতর থেকে এক পুরুষের কণ্ঠে এলো।
বেশ রাগের একটা আমেজ বুঝতে পারলো রমেন। একটা রাগ রাগীর মাঝে এসে পড়েছে দেখে রমেন বললো : ম্যাডাম আমি পড়ে আসছি।
মহিলা : "না দাড়ান, আপনি যাবেন কেনো ?"
"এই তুমি দামের গল্প কাকে শোনাচ্ছ ? আমায় কি গরীব পরিবারের ভেবেছো নাকি ? তোমার মতন লোককে আমার বাবা বাড়ীতে চাকর রাখবে। " ভেতরে নিজের স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে চললো মহিলা।
মহিলা : কি দিয়েছো যে এত শোনাচ্ছ ? ওরম লাখ খানেকের হার আমি বহু দেখেছি,
এরম একটা মানুষকে বিয়ে করাটাই ভুল হয়েছে। সারাদিন খালি টাকা টাকা, জীবনটা নষ্ট করে দিলো আমার ।
পুরুষ : টাকা টাকা করবো না তো কি করবো, এই বাড়ি গাড়ি সব কি আকাশ থেকে পড়েছে ? সব সুখ তো এনে দিয়েছি তোমাকে,
সত্যি বলতে তোমায় বিয়ে করাটাই ভুল ছিল ।
অবস্থা বেগতিক দেখে কিছু না বলেই আসতে আসতে বেড়িয়ে এলো রমেন।
রমেন : "না এই বাড়িতেও বিক্রি হলো না, দেখি অন্য কোথাও যদি বিক্রি করা যায় ।"
ঘুরতে ঘুরতে বিকেল গড়িয়ে এলো, তবে বিক্রি এখনও হলো না একটাও। এদিকে রোদে ঘুরতে ঘুরতে খুব জোর জল তেষ্টা পেয়েছে রমেনের। দুপুর বেলা একটা দোকানও খোলা নেই, ব্যাগের জলটাও গেছে শেষ হয়ে।
অগত্যা এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একটা ছোট দরমার বাড়ি চোখে পড়লো রমেনের।
রমেন ভাবলো একটু জল চাওয়া যাক।
বাড়ির বাইরে গিয়ে আওয়াজ দিলো রমেন : " কেউ আছেন ? আছেন নাকি কেউ ? "
বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো এক মধ্যবয়সী মহিলা। পড়নে একটা জীর্ণ শাড়ী। জায়গা জায়গা থেকে ফেটে গেছে শাড়ীটা।
মহিলা : "কি চাই ?"
রমেন : " না মানে একটু খাবার জল হবে ? সকালে কাজে বেড়িয়েছি দুপুরে রোদে ঘুরতে ঘুরতে জলটা গেলো শেষ হয়ে। তাই যদি একটু জল দেন..."
মহিলা : " নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই ।"
"কে এসে ছে গো ?" ভেতর থেকে এক পুরুষ কণ্ঠে আওয়াজটা এলো।
মহিলা : " আরে কেউনা ওই এক দাদা একটু জল চাইছেন ।"
পুরুষ : " ও আচ্ছা, হম যা গরম ।তো দাদা কে জিজ্ঞাস করো কাঁচা আমের সরবত খাবে নাকি ?"
মহিলা : " দাদা খাবেন ? দাড়ান খেয়ে যান,
আমার বর ওই রোজ কাজ থেকে ফিরে সেই আমার জন্য সরবত নয়তো চা এসব বানাতে বসবে। সে বলে সারাটা দিন ও যেমন বাইরে কাজ করে আমিও তেমনি ঘর সমালাই তাই বিকেল থেকে সমস্ত কাজ আমরা দুজনে মিলে করবো।
জানেন বাবা মানা করেছিল, বলেছিল কামায় কম, কি করে থাকবি !!!
কিন্তু জানেন দাদা সত্যি আমি ভালো আছি,
এমা এই দেখুন আপনাকে দাড় করিয়ে রেখেছি,
দাড়ান দাড়ান ।
"এই তোমার হলো সরবত ? দাদা আর কতক্ষন দাড়িয়ে থাকবে, একটু জলদি করো । ভেতর থেকে টুলটা দাও তো....." এই বলতে বলতে ঘরের ভেতর ঢুকলো মহিলা...
সন্ধ্যে বেলা বসের কেবিনে ঢুকলো রমেন।
রমেন : "স্যার আসতে পারি ?"
বস : "হম..হম..., এসো, আজ সেল হয়েছে ? কটা হল ?? এই মাসটায় টার্গেটটা পূর্ণ করো নয়তো কিন্তু..."
"স্যার এইটা" এই বলে একটা কাগজ রমেন বাড়িয়ে দিলো বসের দিকে।
বস : " কি এটা ? "
রমেন : " স্যার আমার রেজিগনেসান "
বস : " কি !!! রেজিগনেসান??? পাগল হলে নাকি? কাজ ছাড়ছ ?"
রমেন : " না স্যার। পাগল হয়নি, সুস্থ হলাম।সকাল থেকে সন্ধে শুধু আপনার কোম্পানীর সেলসের কথা ভাবি, রাতে বাড়ি ফিরেও ভাবি কি ভাবে পরের দিন কোথায় সেল করবো, কতদিন হয়ে গেছে বাড়ির কারুর সাথে ভালো করে কথা বলিনি, কতদিন তিথিকে নিয়ে ঘুরতে যাইনি, ও ফোন করলে কথা না বলেই ঘুমিয়ে পড়েছি, রাত রাত ভর ও জেগে থাকে আমার ফোনের আসায় আর আমি !!! আমি আপনার কোম্পানীর সেলস বাড়ানোর স্কীম ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি।
না স্যার, আপনার চাকরি আপনি রাখুন।
আমি নিজের আপনজনদের খুশি রাখি।
ভালো থাকবেন, পারলে আমার বলা আজকের কথাগুলো একবার ভেবে দেখবেন ।।"
অফিস থেকে বেরিয়ে অনেকদিন পর বেশ হালকা লাগছিল রমেনের।
" হ্যালো তিথি " তিথিকে ফোন করে বললো রমেন।
তিথি : " বলো আজ এত জলদি ফোন ?"
রমেন : " ওসব রাখো, বলছি ভালো কি সিনেমা রিলিজ হয়েছেগো ? কাল দেখে আসি চলো ।"
No comments:
Post a Comment