সকাল সকাল ফোনের আওয়াজে ঘুমটা ভাঙলো রিয়ার।
"হ্যালো বাবু..." ঘুমের চোখে বললো রিয়া।
" উঠে গেছে আমার সোনাই ? " জিজ্ঞাস করলো অভীক।
" না.....উঠবো...তুমি কি করছো বাবু ? " জিজ্ঞাস করলো রিয়া।
" আমি উঠে গেছি সোনাই... শোনো তুমি উঠে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে নাও...আমি অফিসে বেরোলাম...লাভ ইউ সোনাই " বললো অভীক।
" লাভ ইউ টু বাবু। সাবধানে যেও। " বলে ফোনটা রাখলো রিয়া।
আজ ৬ মাস হয়ে গেল রিয়া আর অভীকের সম্পর্কের।
রিয়ার আজও মনে আছে। সেদিন সকাল সকাল ফেসবুক খুলেই প্রথম ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট ছিলো অভীকের।
দেখতে বেশ ভালো অভীক। একটি বেসরকারি ফার্মে ভালো পোস্টে চাকরিও করে। রিয়া ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট অ্যাকসেপ্টও করে নেয়। তারপর থেকেই কথা বলা শুরু। শুরু হয় দুজনের দুজনকে ভালোলাগা। হয়তো বরুণের দেওয়া আঘাতটাই রিয়াকে আরো বেশি কাছে ঠেলে দেয় অভীকের। রিয়া অভীককে সব বলেছিল। কীভাবে সে বরুণের মিথ্যে প্রেমের জালে ফাঁসে। কীভাবে বরণ তাকে দিনের পরদিন মিথ্যা বলে ঠকিয়েছে। কীভাবে সে দিনের পর দিন রিয়ার মনের অনুভূতি গুলো নিয়ে খেলেছে। অভীক সব শুনত। সত্যি বলতে অভীকই রিয়াকে আবার নতুন করে হাসতে শিখিয়েছে। রিয়া বুঝতো অভীক তাকে খুব ভালোবাসে। একদম যাকে বলে নিঃসার্থ ভালোবাসা। সত্যি বলতে যদি অভীক না থাকতো তালে হয়তো রিয়া আজও চোখের জলে দিন কাটাতো। হয়তো আস্তে আস্তে পাগলই হয়ে যেত। তাই তিন মাস আগে যখন রিয়ার সাথে প্রথম দেখাতেই অভীক তাকে নিজের ভালোবাসার কথা জানায় রিয়া আর মানা করতে পারেনি অভীককে। আসলে রিয়াও নিজের অজান্তেই অভীককে ভালোবেসে ফেলেছিল। অভীককে রিয়ার মা বাবারও খুব পছন্দ। অভীক বলেছে এই বছর পুজোয় গ্রামের বাড়ি থেকে তার মা বাবাকে আনবে রিয়াদের বাড়িতে। বিয়ের পাকা কথাটাও সেদিনই বলে নেবে। রিয়ার মা বাবাও অমত করেনি। আর করবেনই বা কেন... অভীকের মতন এরম ভালোছেলেতো সব মা বাবাই চায় নিজের মেয়ের জন্য। দেখতে ভালো। চাকরিও ভালো করে। শিক্ষিত এবং সাথে ব্যবহারও খুব ভালো। বড়দের শ্রদ্ধা করে। সব চেয়ে বড়ো কথা রিয়ার মা বাবাকেও অভীক নিজের মা বাবার মতনই ভালোবাসে। এর চেয়ে বেশি আর কি বা চাইবে এক মেয়ের মা বাবা....।
সত্যি খুব ভাগ্যবান সে। নয়তো আজকাল যা সব ছেলে। এইতো গতকালেরই কথা। পেপারএ দেখলো একটা মেয়ে নাকি সুইসাইড করেছে। মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড নাকি মেয়েটাকে কিছু ছবি নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছিল। সত্যি কি করে পারে মানুষ এসব। আর মেয়েটাই বা কেমন...!! সত্যি হতভাগী মেয়েটা নয়তো এরম ভুলভাল ছেলেদের কেউ বিশ্বাস করে...!!!
ভগবানের অশেষ কৃপা যে সে অভীকের মতন কাউকে পেয়েছে নয়তো না জানি তার কি হতো....এসবই ভাবছিল রিয়া হঠাৎ তার মা বলে উঠলো " কি রে উঠবি না ? তুই নাকি বাজার যাবি... বললি কি সব রান্না করার জিনিস আনবি কাল অভীকের জন্মদিনে রান্না করবি বলে....১১টা বাজতে যায়...আর কখন বাজার যাবি..."
"হম উঠছি দাড়াও " বললো রিয়া।
দুপুর ১টা নাগাদ বাজার থেকে ফিরলো রিয়া। অভীকের পছন্দের সব জিনিস এনেছে সে। জীবনে প্রথমবার কাউর জন্য রান্না করবে রিয়া। মনে মনে খুব একসাইটেড লাগছে তার।
সে মাকে বললো " মা আমি সব নিয়ে এসছি। তুমি একটু ধুয়ে রেডী করে রাখো। আমি সন্ধ্যে বেলা কিছুটা করে রাখবো। নয়তো কাল সকালে সময় পাবো না। আর বলছি শোনো আমি কেকটা অর্ডার করে এসছি। বাবা কে বলবে কাল একটু গিয়ে কেকটা সকাল সকাল নিয়ে আসতে। "
আজ সারাটা দিন শুধুই খালি অভীককে মনে পড়ছে রিয়ার। মনে হচ্ছে কখন রাত ১২টা বাজবে সে প্রথম উইসটা করবে তার অভীককে। এই প্রথম অভীকের জন্মদিন সেলিব্রেট করবে সে। কিছু যেন খামতি না থাকে। সবকিছু পারফেক্ট করতে হবে তাকে। আসলে রিয়ার হাসির একমাত্র কারণও তো শুধু অভীকই। তাই অভীকের খুশিটাই রিয়ার কাছে সব চেয়ে দামি।
রাতের খাবার সেরে উঠে আজ ব্যাকুল ভাবে অপেক্ষা করছিল রিয়া ১২টা বাজার। অবশেষে ১২টা বাজলো।
" হ্যাপি বার্থডে বাবু " বললো রিয়া।
" থ্যাঙ্ক ইউ সোনাই " বললো অভীক।
" বলো বাবুর কি চাই বার্থডেতে ?" জিজ্ঞাস করলো রিয়া।
" আমি আর কি চাইবো সোনাই...আমায় তো ভগবান তোমার মতন একজনকে দিয়েছে। আর আমার কিছু চাইবার নেই। শুধু এটুকু বলবো সবসময় এভাবেই আমার সাথে থেকো। কখনো আমায় ছেড়ে যেও না। লাভ ইউ সোনাই। " বললো অভীক।
" লাভ ইউ টু বাবু। তোমায় ছেড়ে কোথায় যাবো বলো বাবু...... তুমিইতো আমার সব।
যাইহোক কালকের প্ল্যান মনে আছেতো ? আমি কিন্তু রান্না করে কেক নিয়ে তোমার ফ্ল্যাটে আসছি ওই ধরো সাড়ে নটা নাগাদ। " বললো রিয়া।
" আচ্ছা সোনাই । ঠিক আছে সোনাই আমি ফোনটা রাখি বাড়ি থেকেও ফোন করছে। লাভ ইউ। কাল দেখা হচ্ছে। " বললো অভীক।
" আচ্ছা বাবু । লাভ ইউ টু। " এই বলে ফোনটা রাখলো রিয়া।
আজ ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই অধীর ভাবে অভীক অপেক্ষা করছিল রিয়ার।
আজ প্রথমবার রিয়া তার ফ্ল্যাটে আসবে। সব কিছু সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে অভীক।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো। তাড়াতাড়ি গিয়ে গেট খুললো অভীক।
উফ্!!!!!! কি অসাধারণ সুন্দর লাগছে রিয়াকে....!!! গেট খুলে রিয়ার দিকেই তাকিয়ে রইলো অভীক।
" আরে কি হলো.....ভেতরে যেতে দেবে নাকি এখানেই দাড়িয়ে থাকবো ? " হাসতে হাসতে বললো রিয়া।
" হম হম ভেতরে এসো। " একটু লজ্জা পেয়ে বললো অভীক।
" বাবু তোমার বার্থডের জন্য দেখো আমি কতো কিছু রান্না করেছি। সেই কাল সন্ধ্যে থেকে করছি। এই দেখো চিকেন কষা...চিংড়ির মালাইকারি...কাবাব...আর সাথে বিরিয়ানি। কি জমবে তো বাবু ? আর চকোলেট কেকও আছে সাথে। " বললো রিয়া।
" বাবারে এতো কিছু রান্না করেছো তুমি.....!!! সত্যি বলতো নিজে করেছো নাকি আমার সাসু মাকে খাটিয়েছো ? হেসে জিজ্ঞাস করলো অভীক।
" এরম বললে তো.... যেন আমি কবে থেকে ইউটিউব দেখে দেখে রান্না গুলো খুঁজে রেখেছিলাম তোমার জন্মদিনে করবো বলে আর তুমি আমায় এরম বলছো। " বেশ একটু অভিমান করেই বললো রিয়া।
এবার রিয়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে অভীক বললো " রাগ করতে নেই সোনাই....তুমিতো আমার সোনামনা....তুমি রাগ করলে হয়নাকি....আমিতো মজা করছিলাম। "
রিয়া যেন অনুভব করতে পারছিল অভীকের নিশ্বাস গুলো। কখনও এতো কাছে আসেনি কেউ তার। অভীকের গরম নিশ্বাস গুলো যেন রিয়াকে আরো অভীকের কাছে টানছিল। অভীকের গায়ের গন্ধ যেন রিয়াকে পাগল করছিল।
" বাবু....!!!" লজ্জা পেয়ে বললো রিয়া।
" কি হল সোনাই....!!! তুমিতো আমারই তাই নয়কি ? আর আমিওতো তোমারই .......বিশ্বাস আছেতো সোনাই ? "
" হম বাবু..... আই লাভ ইউ বাবু..." বললো রিয়া।
এবার রিয়াকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে অভীক বললো " আই লাভ ইউ টু সোনাই.....কাছে এসো...আর দূরে থেকো না। "
" হম বাবু " বললো রিয়া।
ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হল দুজনে। আজ প্রথম বার কাউকে এতো কাছে পাবার অনুভূতি। আজ নিজের সর্বস্ব দিয়ে অভীককে ভালোবাসলো রিয়া। তার সবটা আজ থেকে অভীকের। তার জীবন এখন থেকে শুধুই অভীকের।
" বাবু আমরা ঠিক করলামতো ? " অভীকের বুকে মাথা রেখে জিজ্ঞাস করলো রিয়া।
" সোনাই তোমার ট্রাস্ট নেই আমায় ? আমি আছিতো। আর তুমিতো আমারই আর আমি তোমার। " বললো অভীক।
" বাবু আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। তারপর কেকটা কাটবো আর খাবার গুলোও খেয়ে নিতে হবে এবার নয়তো নষ্ট হবে সবটা। " এই বলে উঠে বাথরুমে ফ্রেশ হতে গেল রিয়া।
অভীক বিছানা থেকে নেমে আসতে আসতে সামনে রাখা বইএর টেবিলটার দিকে এগোলো।
" রেকর্ডিংটা ঠিকঠাক হয়েছেতো ? আজকাল ভালো ভালো রেকর্ডিং না হলে ভিডিও মার্কেটে ভালো কাটে না " মনে মনে এই ভাবতে ভাবতে বইএর পেছন থেকে ক্যামেরাটা বার করলো অভীক।
" রিয়া মালটার বেশ পইসা আছে। বেশ মালদার আইটেম। দেখি যদি লাখ পাঁচ সাত আদায় করা যায়। একে পটাতে এমনি অনেক ধার হয়েছে তার উপর আগের ভিডিওটা থেকে কিছুই ইনকাম হয়নি। তার উপর পুলিশের ঝামেলা সামলাতে হয়েছে। সব মিলিয়ে বহুত ধার বাকী হয়ে গেছে। দেখাযাক কতো আদায় করা যায় মালটার থেকে। " এসবই মনে মনে ভাবছিল অভীক। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো।
" রিয়া কলিং..." মোবাইলের উপর ভেসে উঠলো।
বেশ আশ্চর্য হল অভীক।
" বাথরুম থেকে ফোন করছে....!!!! কি আশ্চর্য মেয়েরে বাবা...!!! " মনে মনে ভাবলো অভীক।
" হ্যালো " ফোনটা ধরে বললো অভীক।
" বাবু বাবু প্লীজ রাগ কোরোনা....দেখো আমি সকালে উঠে রেডী হচ্ছিলাম। বাবা তোমার কেকটা আনতে যাচ্ছিল হঠাৎ কিভাবে যেন সিড়ি থেকে পড়ে গেল। বাড়িতে সেকি অবস্থা জানো না। এই ডক্টর গেল বাবাকে দেখে। প্লীজ বাবু রাগ কোরোনা। আমি কথা দিচ্ছি কাল আসবো। আর তুমি পারলে একটু এসো সময় করে। অনেক কিছু রান্না করেছি তোমার জন্য। " বললো রিয়া।
তাড়াতাড়ি বাথরুমের দিকে ছুটলো অভীক।
এক ধাক্কা মেরে বাথরুমের দরজা খুলে ফেললো অভীক।
কিন্তু কোথায় কে.....!!!!! কেউ নেই কোথাও....
অভীক তাড়াতাড়ি এসে ভিডিওটা অন করলো। বুকের ভেতর তার হৃদস্পন্দন এখন দ্বিগুণ বেগে চলছে। এসির মধ্যেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে অভীকের কপালে। ধীরে ধীরে ভিডিওটা অন করলো অভীক।
" কিন্তু একি........!!!!! ভিডিওতে এটা কে!!!!... এ... তো.. এ তো দিয়া !!!!.... কিন্তু দিয়া তো..!!! দিয়াতো দুদিন আগে আত্মহত্যা করেছে......!!!!!"
পেছন থেকে যেন এবার এক বিকট হাসি শুনতে পেল অভীক.....
এক ভিসৎসো গলায় ভেসে এলো " ও বাবু.....কাছে আসবে না আমার.....এসো বাবু......কাছে এসো...."
ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো রিয়ার।
" সীমা ফোন করছে.....!!! কি ব্যাপার হঠাৎ বিকাল বিকাল ফোন...." মনে মনে ভাবতে ভাবতে ফোনটা ধরলো রিয়া।
"হ্যালো রিয়া…...এক্ষুনি একবার খবরটা শোন " বললো সীমা।
" আরে কেন? কি হলো বলবি তো ? " জিজ্ঞাস করলো রিয়া।
" তুই এক্ষুনি দেখ একবার। আমি রাখছি...। " বললো সীমা।
" কি আজব মেয়ে....!!! হঠাৎ করে ঘুম থেকে ডেকে খবর শুনতে বলে কেটে দিলো...." মনে মনে ভাবলো রিয়া।
বিছানা থেকে উঠে রিমোটটা নিয়ে খবর চালালো।
.....ব্রেকিং নিউজ....
নিজের ফ্ল্যাটে আত্মঘাতী যুবক।
যুবকের নাম অভীক সরকার। দুপুর ১টা নাগাদ নিজের ফ্ল্যাটে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় যুবকের দেহ।
পুলিশ যুবকের ফ্ল্যাট থেকে একটি ভিডিও উদ্ধার করে যেখানে যুবকের স্বীকারোক্তি....
" তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে তাদের গোপন ছবি নিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল করাই তার পেশা। দুদিন আগে দিয়া বলে যে মেয়েটির আত্মহত্যার ঘটনা সামনে আসে তার জন্যও সেই দায়ী। সে ওই মেয়েটিকে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করায় সেই মেয়েটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। "
পুলিশ যুবকের ল্যাপটপ থেকে অনেক মেয়ের গোপন ছবি এবং ভিডিও উদ্ধার করে। ঘটনাটির তদন্ত করছে লোকাল থানার পুলিশ।
নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলো না রিয়া। ধীরে ধীরে দুঃখে কান্নায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লো রিয়া।
শুধু একটাই কথা তার মনে হচ্ছিল " কি বলবে আজ সে নিজেকে....হতভাগী...নাকি... ভাগ্যবান..!!!? "