দেখতে দেখতে আজ তিন মাস হয়ে গেল কিন্তু উপেনবাবুর কলম যেন আর আগের মতন চলতে চায় না। একসময় ভূতের গল্প লিখে খুব নাম করেছিলেন উপেনবাবু।কলেজস্ট্রিট চত্ত্বরে উপেন্দ্রনারায়ণ চ্যাটার্জীর বই কিনতে লাইন পড়ত। কিন্তু শেষ একবছর ধরে যেন মা সরস্বতী আর মুখ তুলে চাইছেন না তার দিকে। শেষ দুটো গল্পের বই একদম চলেনি। শেষ তিনমাস একটা গল্প পর্যন্ত লিখে উঠতে পারেনি সে। মাথা যেন আর কাজ করছে না তার। এদিকে প্রকাশকের তাগাদা বাড়ছে দিনদিন। কি করবে এসবই ভাবছিলেন হঠাৎ পাশের ফোনটা বেজে উঠলো।
"হ্যালো" বললেন উপেনবাবু।
"উপেনদা আমি মণ্ডল পাবলিশার্স থেকে বলছি। আমাদের নতুন ভূতের গল্প সমগ্রর জন্য বাকী সব লেখকরা গল্প দিয়ে গেছেন। আপনার গল্পটা পেলে মানে বুঝতেই পারছেন পুজো আসতে চললো এবারতো ছাপাতে দেরি হয়ে যাবে।"
"হম, ঠিক আছে পরের সপ্তাহে এসে নিয়ে যাবেন।" এই বলে ফোনটা রাখলেন উপেনবাবু।
"বলেতো দিলাম পরের সপ্তাহে গল্প নিতে আসতে কিন্তুু দেবটাকি ??? মাথাতো একদম ফাঁকা। একটা প্লট ও মাথায় নেই। না জানি কি হতে চলেছে।" এসবই মনে মনে ভাবছিলেন হঠাৎ পেছন থেকে চাকর নিধিরাম বললো " বাবু খাইয়া লন, অনেক বেলা হইসে।"
"তুই রেখেদেরে নিধি। আমার মনটা ভালো নেই। খেতে ইচ্ছে করছে না" বেশ নিরাশ ভাবেই বললেন উপেন বাবু।
"কেন বাবু ? কি হইলো আপনার ? খাওন ফালাইয়া থুইতে নাই। খাইয়া লন।" বললো নিধিরাম।
"তুই বুঝবি না। তিনমাস কেটে গেল কিছু লিখে উঠতে পারিনি। এদিকে প্রকাশকরা তাগাদা দিচ্ছে। কিছু ভালো লাগছেনা " বেশ দুঃখের সাথেই বললেন উপেনবাবু।
"হও...তো হের লিগা আপনে খাওনের পাত ফালাইয়া থুইলেন।
দেখেন কর্তা মশাই আমি মুক্কসুক্কো মানুষ। আপনাগো এতো লেখাপড়া আমি বুঝিনে। তবে এমন ঘরের মৈধা আটকাইয়া থাকেন বৈল্লাই আপনার মন খারাপ করে। এককাম করুন একটু ঘুইরা আহুন কোথাও দিয়া। দেখবেন সব ঠিক হইয়া যাইবো। আর এখন মন খারাপ না কইরা খাইয়া লন।" এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নিধিরাম।
"কথাটা কিন্তুু ঠিকই বলেছে নিধিরাম। সত্যিতো কতদিন হয়ে গেছে কোথাও যাওয়া হয়নি তার। তার ছোটো ভাই থাকে মালদাতে। কতবার সে তাকে যেতে বলেছে কিন্তু উপেনবাবুর আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তবে এবার সে যাবে। দুদিনের জন্য একটু ঘুরে আসলে মনটা একটু ভালো হবে। তারপর কলকাতায় ফিরে না হয় কিছু একটা লেখা যাবে।" এসবই ভাবতে ভাবতে খেতে বসলেন উপেন বাবু।
দুপুরে খেয়ে উঠে ছোটো ভাইকে ফোন করলেন উপেন বাবু।
"হ্যালো, ছোটন..." বললেন উপেন বাবু।
"হ্যা দাদা বল। কেমন আছো তুমি ? " তার ভাই জিজ্ঞাস করলো।
"হ্যা আমি ভালো আছি। শোন যেটা বলার জন্য তোকে ফোন করলাম। বলছি কাল রাতের ট্রেনে আমি আসছি তোদের ওখানে। দুদিনের থাকবো। " বললেন উপেন বাবু।
" আরে বাহ। আমি ড্রাইভার পাঠিয়েদেব দাদা। শ্যামলী খুব খুশি হবে।" বললো ছোটন।
"হম সেসব ঠিক আছে। তবে বেশি রান্না করিস না। আমার এমনি পেট ভালো নেই। একটু জল হাওয়া বদলাতে আসবো। রাখলাম তবে। " এই বলে ফোনটা রাখলেন উপেন বাবু।
পরদিন রবিবার। হাওড়া থেকে দুপুর ৩:২৫ এর মালদা ইন্টারসিটি ধরে রওনা দিলেন উপেনবাবু। অন্যান্য দিনের থেকে আজ কামরাটা একটু বেশিই ফাঁকা। জালনার ধারে বসে বাইরের পরিবেশ দেখতে বেশ ভালই লাগছিল তার। সত্যি এতদিন পর বাইরে বেরিয়ে বেশ মনটা ভালো লাগছে। কতদিন পর ভাইকে দেখবে। ছোটো বেলার স্মৃতি গুলো বেশ মনে পড়ছিল। তার বাবা সেবার তাদের নিয়ে সিমলা বেড়াতে যাবার সময় এই জানলার ধারে বসা নিয়ে কি ঝগড়াই না হয়ে ছিল তার সাথে তার ভায়ের। সত্যি ওই দিন গুলোই ভালো ছিল। বড় হয়ে যেন জীবনের মজাটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
"কত দূর যাওয়া হবে মশাইয়ের ?" হঠাৎ একটা অচেনা গলার প্রশ্নে চমকে উঠলেন উপেনবাবু।
সে লক্ষ্যই করেনি কখন একজন ব্যক্তি এসে তার সামনের সিটে বসেছে।
"যাওয়া বলতে এই একটু মালদা যাচ্ছি" বললেন উপেনবাবু।
"ও আচ্ছা। কী বাড়ি নাকি মালদাতে নাকি চাকরি ?" জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
"দুটোর একটাও না।" বললেন উপেনবাবু।
"ও তাহলে ? " জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
"আমি যাচ্ছি নিজের ভায়ের বাড়ি।" বললেন উপেনবাবু।
লোকটার হঠাৎ করে এরম গায়ে পড়ে প্রশ্ন করা দেখে বেশ বিরক্তই অনুভব করছিলেন উপেনবাবু। বেশ ভালোই বসে ছিলেন কোথা থেকে এ এক উটকো লোক এসে সব গন্ডগোল পাকিয়ে দিল।
" তো মশাইয়ের নাম কি ? কি করা হয় ?
মনে মনে ভাবছেন বলুন, কি এক উটকো লোক গায়ে পড়ে খালি প্রশ্ন করে যাচ্ছে। কি ঠিক বললাম তো ? " একটু হেসে জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
এবার একটু লজ্জা পেয়ে উপেনবাবু বললেন " আরে না না তেমন কিছু না। আমার নাম উপেন্দ্রনারায়ণ চ্যাটার্জি। আমি পেশায় লেখক।"
"ওরে বাবা!!! লেখক !! বিশাল ব্যাপারতো !!!
তো কি রকম গল্প লেখা হয় ? ওই সমাজ আর জাতীর উত্থানের জন্য সোশ্যালিস্ট লেখা নাকি ওই সম্পর্কের ঘোর প্যাঁচালো উপন্যাস??" একটু ব্যাঙ্গাত্মক ভাবেই জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
" আজ্ঞে না। আমি ভূতের গল্প লিখি।" বেশ একটু রেগেই বললেন এবার উপেন বাবু।
"ওমা ভূত !!!!!!!!
তো মশাই রেগে যাচ্ছেন কেন ? আমিতো এমনি একটু মজা করলাম। আর বাঙালি মানেই তো একটু মজা একটু আড্ডা নিয়ে জীবন কাটানো। ঠিক কি না বলুন ?"
বললো আগুন্তক।
উপেনবাবু এবার একটু মুচকি হেসে সম্মতি দিলেন।
"আচ্ছা তো মশাই ভূতের গল্প লেখেন.....তো ভূত দেখেছেন কখনও ? " জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
"না আমি কখনো দেখিনি আর সত্যি বলতে আমি ভূতে বিশ্বাসও করি না। " বললেন উপেনবাবু।
" সেকি মশাই !!! আপনি ভূতের গল্প লেখেন আর এদিকে নিজেই ভূতে বিশ্বাস করেন না?? " জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
" হ্যা তো ? মানে আপনি কি বলতে চাইছেন ভূতের গল্প লিখি বলে আমায় ভূতে বিশ্বাস করতেই হবে তাই তো ? মানে ধরুন আপনার কথা অনুযায়ী যারা ধরুন ক্রাইম নোভেল লেখে তারা এক একজন ক্রিমিনাল বা ক্রাইম করাতে বিশ্বাসী তাই তো ?" বেশ রেগেই বললেন এবার উপেন বাবু।
" আরে মশাই রাগ করছেন কেন? আমি সেটা বলিনি। আমি তো জাস্ট জিজ্ঞাস করলাম।
আচ্ছা চলুন আপনিতো ভূতে বিশ্বাস করেন না ঠিক আছে আপনাকে আমি একটা কাহিনী শোনাবো। আপনি শুনে বলুন ভূত আছে কি নেই ....ঠিক আছে? " জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
উপেনবাবু এবার মনে মনে ভাবলেন যে ঠিক আছে, না হয় শোনাই যাক একটা গল্প। এতটা রাস্তা একা একা বসার চেয়ে একটা গল্প শুনলে ক্ষতি কি....আর এমনিও সে নতুন গল্প খুঁজছিল তো কোন নতুন প্লটও হয়তো মাথায় এসে যেতে পারে গল্প শুনতে শুনতে।
উপেনবাবু উত্তর দিলেন " ঠিক আছে শোনান " ।
আগুন্তক বলা শুরু করলো......
এই কাহিনীটা দুই বন্ধুর। ছোটো থেকেই খুব ভালো বন্ধু রাতুল আর সৌরভ। স্কুল কলেজ সব জায়গাতেই একসাথে ছিলো তারা। ভগবান যেন সব কিছুই তাদের মধ্যে সমান ভাবে ভাগ করে দিয়েছিল। সে তাদের পরীক্ষার নম্বর হোক বা ফুটবল মাঠের গোল সংখ্যা সবেতেই যেন দুজনে সমান। এমনকী কলেজের গন্ডি পেরিয়ে চাকরিও দুজনে একসাথে এক অফিসেই পেল। বেশ ভালই দিন কাটছিল তাদের। এরপর তাদের একদিন আলাপ হল নিশার সাথে। তাদের অফিসে ইন্টার্নশিপ করতে এসছিল নিশা। সেখান থেকেই আলাপ দুই বন্ধুর সাথে। দেখতে খুবই সুশ্রী ছিল নিশা। সত্যি বলতে যেন রূপে গুনে পরিপূর্ণ এক অপ্সরা ছিল নিশা। কিছু দিনের মধ্যেই রাতুল নিশার প্রেমে পড়ে। নিশাও মনে মনে রাতুলকে পছন্দ করতো। তাই রাতুল নিজের মনের কথা বলার পর নিশা নিজের গোপন ভালোলাগার কথা রাতুলকে জানায় এবং আস্তে আস্তে তাদের প্রেম আরো গভীর হয়ে ওঠে। একবছর কোর্টসিপের পর তারা বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হয়। বেশ ভালই চলছিল সব। রাতুল আর নিশা ঘুরতে যেত সাথে সৌরভও থাকতো। তিনজনের বেশ একটা জুটি হয়ে গেছিলো। রাতুল আর নিশার বিয়ে হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাদের সেই জুটি কিন্তুু ভাঙেনি।
একদিন শীতকালে সৌরভ বললো " বলছি ভাই একটা পিকনিকে গেলে হয়না? অনেকদিন কোথাও যাইনা। চলনা আমি তুই আর নিশা মিলে ঘুরে আসি।"
এবার নিশা মুচকি হেসে বললো " সেই শুধু কি আমরা তিনজন?? সাথে কিন্তুু আরেকজন থাকলে মন্দ হয়না...
আমি কিন্তু সব খবরই পাচ্ছি।"
এবার রাতুল জিজ্ঞাস করলো " কি খবর গো ? কি গল্পটা কি ? "
নিশা হেসে বললো " গল্প.....সে তো তোমার বন্ধুই বলবে। খুবতো ঘুরতে যাওয়া হচ্ছে রিয়াকে নিয়ে....খবর কানে আসছে সৌরভদা...কি ঠিক বলছি তো ???"
এবার রাতুল বললো " আরে রিয়া মানে তোমার ঐ ছোটো মামার মেয়ে???"
"আজ্ঞে হ্যাঁ.....আপনার প্রিয় বন্ধুটি আপনার ভায়রা হতে চাইছে বুঝছেন তো মশাই......" মুচকি হেসে বললো নিশা।
"আরে ধুর....তেমন কিছু না....ওই মানে একটু কথা হয়....কখনো একটু এদিক ওদিক দেখা হয়ে যায় ব্যাস...তেমন কিছুনা গো..." বেশ লজ্জা পেয়ে বললো সৌরভ।
"আরে বুঝি বুঝি সৌরভদা......প্রেম জমে ক্ষীর হচ্ছে। মামা একটু রাগী কিন্তুু আমায় খুব ভালোবাসে। আমি যদি রিয়াকে আমার সাথে ঘুরতে নিতে চাই তবে মামা মানা করবে না" হাসতে হাসতে বললো নিশা।
"ঠিক আছে তবে এই কথাই রইলো যে আমরা চারজন ঘুরতে যাচ্ছি।" বললো সৌরভ।
"হম সে ঠিক আছে কিন্তু যাবিটা কোথায় সেটা ভেবেছিস ? " জিজ্ঞাস করলো রাতুল।
" আমার এক বন্ধুর বাপ ঠাকুর্দার একটা ডাক বাংলো আছে ওই হুগলির ওদিকটায়। ভাবছি ওখানেই যাব। একটু গ্রাম্য পরিবেশে সময় কাটাতে ভালই লাগবে। নয়তো এই কলকাতা শহরের এত শোরগোল আর যেন ভালো লাগেনা। " বললো সৌরভ।
" হম... আইডিয়াটা মন্দ না। হুগলি মোটামুটি কাছের মধ্যেই হবে তো যাতায়াতের চাপও হবে না। কি বলিস ??? " বললো রাতুল।
" একদম ঠিক ভাই। তবে রাতুল ভাই তোকে কিন্তু একটা কাজ করতে হবে। আমি খোজ নিয়েছিলাম বুঝলিতো। জায়গাটার আসে পাশে তেমন কোনো হোটেল নেই তাই রান্নাটা ওখানের থেকে ঠাকুর জোগাড় করেই করতে হবে। তো আগের দিন তোকে একটু চলে যেতে হবে। গিয়ে ওই বাড়িতে উঠবি। সন্ধেবেলা বেরিয়ে একটু একটা ঠাকুর ঠিক করে রাখবি আর একটু বাজারটা করে রাখবি। আমি নিজেই চলে যেতাম কিন্তু জানিসতো মার বয়েশ হয়েছে। রাতে একা রাখতে ভরসা পাইনা তাই তোকে বলছি আর কী।" বললো সৌরভ।
" ঠিক আছে ভাই চাপ নেই। আমি নিশা আর রিয়া আগেরদিন চলে যাব। তুই পরের দিন সকাল সকাল চলে আয় ঠিক আছে? " বললো রাতুল।
"আরে ভাই শোন শোন রিয়া আর নিশাকে আগের দিন নিয়ে যাসনা। গ্রামের জায়গা ভাই। তার উপর নির্জন পরিবেশ। দুটো মেয়ে নিয়ে তুই একা থাকবি রিস্ক হয়ে যাবে।" বললো সৌরভ।
" হম....সৌরভদা ঠিকই বলেছে। আর এমনিতেও মামা রিয়াকে সারা রাত বাইরে থাকতে দেবেনা। আমি বললে যেতে দেবে কিন্তু সারা রাত বাড়ির বাইরে মামা কিছুতেই রিয়াকে ছাড়বে না। " বললো নিশা।
" ঠিক আছে....কিন্তু মানে আমি একা পুরো বাড়িতে থাকবো!!!!? " একটু ইতস্তত করে বললো রাতুল।
এবার সৌরভ হো হো করে হেসে উঠলো..." ভাই তোর সেই ভূতের ভয় এখনও যায়নি না? একা থাকতে ভঁয় পাচ্ছিস? ঠিক আছে ভাই ছার আমিই চলে যাব আগের দিন। "
এবার নিশাও হেসে উঠলো...." সেকি তুমি ভূতে ভয় পাও....এটা তো জানা ছিল না।"
" আরে নিশা তুমি জানো না। রাতুলের ভূতে খুব ভয়। স্কুল কলেজে ওকে যে আমরা কতবার ভয় দেখিয়েছি.....মানে তুমি বললে বিশ্বাস করবে না। " বললো সৌরভ।
এবার একটু লজ্জাই হল রাতুলের। যতই হোক বৌএর সামনে এরম বললে খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক।
"ধুর ভাই তুই না। ওসব ভূতের ব্যাপার না ভাই। আমি জাস্ট বললাম যে আমি একাই থাকবো।
যাই হোক আমি পৌঁছে যাব। কোন চাপ নেই। এবার কবে যাবি সেটা বল " বললো রাতুল।
"এইতো আজ বুধবার তো এককাজ কর এই রবিবারই চল, এখনতো এমনিও অফিসে কাজের চাপ কম তাই চল এই সপ্তাহে ঘুরে আসি। কবে আবার হেড অফিস থেকে নতুন প্রজেক্টের অর্ডার এসে যাবে তখন দেখবি রোববারও কাজে যেতে হবে। তুই তালে শনিবার বিকেল বিকেল বেরিয়েযা আমি তোকে ঠিকানাটা বলে দেব।" বললো সৌরভ।
"হম সে যা বলেছিস। হেড অফিস যেকোনো দিন মাথায় বাজ ফেলবে....। যাই হোক ঠিক আছে তালে একদম এই কথাই রইলো। আর তুমি মামা কে আজ ফোন করে রিয়াকে ম্যানেজ কর ঠিক আছে।" নিশাকে বললো রাতুল।
"হম দেখি রাতেই করবো ফোন আজ " বললো নিশা।
"এই রাতুল ভাই একটু লাঞ্চ টাইমে আসিস কথা আছে..." পরদিন অফিসে এসেই বলল সৌরভ।
"হম...বল ভাই.." বললো রাতুল।
" লাঞ্চ করে নিয়েছিস নাকি ক্যান্টিন যাবি ?" জিজ্ঞাস করলো সৌরভ।
"না না লাঞ্চ করে নিয়েছি ভাই...তুই বল তখন কি কথা আছে বললি।" বললো রাতুল।
" ও হ্যা....বলছি ভাই শোন আমি দুদিন অফিস আসবো না। মার বাতের ব্যাথাটা বেড়েছে। দেখি কাল একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। তুই এই চাবি টা রাখ আর এই কাগজ টায় ঠিকানা লেখা আছে। ওই খন্নান স্টেশনে নেমে টোটো করে নিবি। আর যাবার সময় বাজারটা করে নিস। আর ভাই শোন না ওখানে বাজারে বিলের দোকানের খাসী নাকি হেব্বি ভাই...একটু দুকেজি নিয়ে নিস ভাই। রবিবার অনেক লাইন পড়বে তাই তুই আগেরদিনই নিয়ে রাখিস ভাই।" বললো সৌরভ।
" ঠিক আছে ভাই সব হয়ে যাবে। তুই শুধু সকালে নিশা আর রিয়াকে নিয়ে এসে যাস ব্যস....লেট করিস না আবার " বললো রাতুল।
শনিবার সন্ধ্যা ৭টা। খন্যান স্টেশনে নামলো রাতুল। স্টেশনের কাছেই বাজার। আগে গিয়ে বাজারটা করতে হবে। সৌরভ আবার বলেছে বিলের দোকানের খাসীর মাংস নিতে হবে। বাজারে জিজ্ঞাস করাতে বিলের দোকান খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না রাতুলের।
" ভাই রাং এর কাছ থেকে দু কেজি কাটো না " খাসীর দোকানে গিয়ে বললো রাতুল।
"এই রাং এর কাছ থেকে দু কেজি মাল কাট রে " দোকানে বসে থাকা একটা সন্ডা মার্কা লোক চিৎকার করলো।
"দাদা....নতুন নাকি...আপনাকে তো আগে দেখিনি এখানে। " জিজ্ঞাস করলো দোকানের লোকটা।
"হম...একটু পিকনিকে এসছি। ওই ডাকবাংলোয় উঠেছি।" বললো রাতুল।
"ডাকবাংলো.... মানে ওই মিত্তিরদের ডাক বাংলো ?" বেশ আশ্চর্য্য হয়েই জিজ্ঞাস করলো লোকটা।
"হম...ওটাই " উত্তর দিল রাতুল।
" দাদা...একটু সামলে থাকবেন। বাড়িটা ভালো না" বললো লোকটা।
" মানে ? " জিজ্ঞাস করলো রাতুল।
" মানে বলতে দাদা...বাপ ঠাকুরদার মুখে শুনেছি...ওই বাড়িতে এক পাগলী মহিলা থাকত। বাড়ির চারি দিকে একটা পুতুলকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো আর কি সব আবোল তাবোল ইংরেজি ছড়া বলতো। তারপর একদিন হঠাৎ রাতে নিজের স্বামীকে খুন করে দোতলার বারান্দার করিকাঠ থেকে ঝুলিয়ে দেয় এবং নিজেও দোতলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে। তারপর থেকে ওই বাড়িতে আর কেউ থাকেনি। তাই বললাম একটু সামলে থাকবেন।
যাই হোক এই নিন দাদা। আপনার হলো ১২০০ টাকা। " মাংসের ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে বললো লোকটা।
লোকটাকে টাকা মিটিয়ে এগিয়ে গেল রাতুল।
একটা টোটো ধরে ডাক বাংলোয় পৌঁছালো রাতুল।
"কিন্তু গেটে তালা নেই কেন... তালে কি ভেতরে কেউ আছে ?" এমনটা ই মনে মনে ভাবছিল রাতুল।
হঠাৎ গেট খুলে বেরিয়ে এলো সৌরভ...
"একি তুই এখানে ? " বেশ আশ্চর্য্য হয়েই জিজ্ঞাস করলো রাতুল।
"তুই তো বললি কাকিমা কে রাতে একা রাখবি না...তালে আবার এলি কেন ?? " জিজ্ঞাস করলো রাতুল।
" আরে ভাই...ভাবলাম তুই একা ভয় পাস যদি তাই চলে এলাম। পাশের বাড়ির কাকীমাকে বলে এসছি একটু মাকে দেখতে " বললো সৌরভ।
" যাক ভালই হল। নে এবার মাল গুলো ধর একটু। এতো বাজার টেনে হাত ব্যাথা হয়ে গেছে ভাই। " বললো রাতুল।
"হম...হম দে ভাই " বললো সৌরভ।
" এই ছোট ব্যাগটা সামলে ধরিস একটু মিষ্টি আর পাউরুটি আছে রাতে খাওয়া যাবে ভাই। আর ভাই বলছি ঠাকুরের ব্যাবস্থা হয়নি। ওটার কি হবে ? " বললো রাতুল।
" হম....চাপ নিতে হবে না। আমি দেখছি। তুই ভেতরে আয়ে.." বললো সৌরভ।
" উপরে দোতলার রুমটা পরিষ্কার করা আছে। ওটাতেই চলে যা। আমি আসছি এগুলো গুছিয়ে।" বললো সৌরভ।
রাতে ডিনার সেরে রাতুল একটা ম্যাগাজিন খুলে পড়তে পড়তে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ সৌরভের গলার আওয়াজে ঘুম ভাঙলো রাতুলের।
" জেগে আছিস রাতুল ভাই? " বাইরে থেকে জিজ্ঞাস করলো সৌরভ।
" হম রে ভাই....আয়ে ভেতরে " বললো রাতুল।
ঘরে ঢুকলো সৌরভ।
" কিরে তোর কি ব্যাপার বলতো??? ডিনারটাও করলি না। খালি এদিক ওদিক চলে যাচ্ছিস। পাচ্ছিই না তোকে..." বললো রাতুল।
" ভাই রাতুল তোকে কটা কথা আমি বলতে চাই। তোকে না বললে আমি শান্তি পাচ্ছি না। " বললো সৌরভ।
" হম বল কি কথা...?" জিজ্ঞাস করলো রাতুল।
"তুই জানিস আজ তোকে এখানে আসতে বলার একটা কারণ ছিল।" জিজ্ঞাস করলো সৌরভ।
" হম জানি তো....সে তো তুই সেদিন ই বললি" বললো রাতুল।
একটু মুচকি হেসে সৌরভ বললো " না...তুই জানিস না...জানলে আসতিস না কখনো। তুই জানিস তোকে আজ আমি এখানে খুন করবো বলে ডেকেছিলাম।"
কথাটা শুনে বুকটা কেপে উঠলো রাতুলের।
"কি বলছে তার বন্ধু। সে তো সৌরভের কোন ক্ষতি করেনি। তালে কেন এসব বলছে সৌরভ.... সৌরভ কি আবার ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে তাকে..." এসব ই মনে মনে ভাবছিল রাতুল।
হঠাৎ সৌরভ আবার বলে উঠলো " কি ভাবছিস আমি মজা করছি....তোকে ভয় দেখাচ্ছি?
ভুল ভাবছিস। আমি এক বিন্দুও মজা করছি না। আমি সত্যি তোকে আজ খুন করতে ডেকেছিলাম" ।
এবার রাতুল একটু আশ্চর্য্য হল যে সৌরভ বুঝলো কি করে সে মনে মনে কি ভাবছে। অনেক সাহস করে জিজ্ঞাস করলো রাতুল " আমায় কেন মারতে চাস ভাই? তুই তো আমার বন্ধু সেই ছোটো বেলা থেকে। আমি কি ক্ষতি করেছি ভাই তোর ? "
" ক্ষতি.....জানিসনা তাই না...যেদিন নিশাকে প্রথম দেখি সেদিন থেকে আমি নিশাকে পাগলের মতন ভালোবেসেছি কিন্তুু ও পছন্দ করলো তোকে। তোর জন্য আমি নিশাকে হারিয়েছি..." রাগের সাথে চিৎকার করে বললো সৌরভ।
সৌরভ বলে চললো " ভেবেছিলাম তোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে তারপর নিশাকে নিজের মনের কথা জানাবো। তাই আজ তোকে ডাকি। তোকে ভয় দেখিয়ে খুন করতাম। সেই ভাবে প্ল্যানও করেছিলাম। সেই বৃহস্পিবার রাতেই আমি এখানে এসে যাই। এই বাড়িটা আমি আগেই বুক করে...বুড়ো গার্ডকে কিছু টাকা দিয়ে চাবি নিয়ে যাই। এই বাড়ি আমার কোন বন্ধুর বাড়ি না। তোকে প্ল্যান করে সেদিন আগের রাতে আনানোর ব্যবস্থা করি যাতে রাতে তোকে ভয় দেখানো যায়। ওই যে মাংসের দোকানে তোকে গল্প শোনানো হল এই বাড়ির ব্যাপারে। সেই গল্পটাও আমার তৈরি। একটু টাকা দিতেই সে রাজি হয়ে গেল তোকে ওই গল্প শোনাতে। একটা মেয়েও ঠিক করেছিলাম যে এসে সেই গল্পের মতনই হাতে পুতুল নিয়ে ঘুরতো আর টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল কবিতাটা বলতো।"
একটু থামলো সৌরভ।
"তো আমায় মারলি না কেন ?" কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাস করলো রাতুল।
হা হা করে ঘর কাপিয়ে হাসলো সৌরভ।
"তোকে মারবো ঠিক করেতো ছিলামরে বন্ধু কিন্তুু জানিসতো উপর ওয়ালা সব কিছুর বিচার করে। তুই খুব ভালো। আমায় ভাইয়ের মতন দেখতিস আর আমি বন্ধুর বৌএর দিকে বাজে নজর দিয়েছি। ভগবান মাফ করেনিরে ভাই। ভগবান মাফ করেনি। আমার শাস্তি আমি পেয়ে গেছি। তবে আমি তোর অপরাধী তাই তোকে সব সত্যিটা বলে শান্তি পেলাম। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস।" আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সৌরভ।
তাড়াতাড়ি সৌরভের পেছন পেছন বেরোলো রাতুল।
"দাড়া ভাই... দাড়া দাড়া" চিৎকার করলো রাতুল।
ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাড়ালো রাতুল কিন্তুু কোথায় সৌরভ। কেউ নেই কোথাও....হঠাৎ
সামনে তাকাতেই রক্ত জল হয়ে এলো রাতুলের। সামনে দোতলার বারান্দার করিকাঠ থেকে ঝুলছে সৌরভের প্রাণহীন দেহ।
রাতুল চিৎকার করলো "সৌরভ!!!"
উত্তরে শুধু একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো " টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটল স্টার... হাউ আই ওয়ান্ডার ওয়াট ইউ আর...."।
"কি বলুন কি বলবেন এবার" জিজ্ঞাস করলো আগুন্তক।
" রাতুলের কি হল ? আর আপনি এই গল্প জানলেন কি করে ? " জিজ্ঞাস করলেন উপেন বাবু।
মুচকি হেসে উত্তর দিল আগুন্তক " সব প্রশ্নের উত্তর হয়না মিস্টার উপেন্দ্র নারাযণ চ্যাটার্জী "।
"আমি উঠি...ফারাক্কা এসে গেছে আমায় নামতে হবে " এই বলে আগুন্তক উঠে গেল।
"আরে মশাই দাড়ান..." এই বলে উঠতে যাবেন উপেন বাবু হঠাৎ নজর পড়লো একটা ডায়েরির দিকে।
" আরে ও মশাই দাড়ান...দাড়ান...আরে আপনার নামটা বলে যান। আপনার ডায়েরি ফেলে গেলেন মনে হয় দেখুন " এই বলে পেছন পেছন চিৎকার করতে করতে এগিয়ে গেলেন উপেন বাবু।
কিন্তু কোথায় কেউ....কেউ কোথাও নেই...যেন অদৃশ্য হয়ে গেল মানুষটা। অগত্যা আবার নিজের সিটে ফেরৎ আসার সময় কৌতূহল বসত ডায়েরিটা খুললেন উপেন বাবু।
ডায়েরিতে লেখা ছিল...
ক্ষমা করবেন। ৪ মাস হল আমার চাকরি নেই। বাড়িতে দুই মেয়ে আছে আমার। খুবই ছোটো তারা। আমার স্ত্রী মারা গেছে ৬ মাস হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে এই চুরির পথ বেছে নিলাম। আপনি স্টেশনে যখন ট্রেনের টিকিট মেলাতে ব্যাগ খুললেন তখনই আপনার ব্যাগে দুহাজার টাকার নোটের বান্ডিলটা লক্ষ্য করেছিলাম। তাই প্ল্যান করে জিনিসটা চুরি করলাম। পারলে ক্ষমা করবেন। আপনার নাম জানা রইলো। কখনো সম্ভব হলে আপনাকে টাকা ফেরত দিয়ে আসবো।
ইতি
এক অসহায় বাবা
উপেন বাবু তাড়াতাড়ি নিজের সিটে পৌঁছালেন। না তার ব্যাগটা আর নেই।
উপেন বাবু মনে মনে ভাবলেন " একটা নতুন গল্পের বদলে একটা অসহায় বাবকে সাহায্য। না খুব একটা ক্ষতি হয়নি তার।
মুচকি হেসে নিজের সিটে বসে পড়লেন উপেন বাবু।