Saturday, November 12, 2022

অসম্পূর্ণ

জীবনের প্রথম চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা পেয়ে আজ বেজায় খুশি প্রসূন। অনেক দিন ধরে এই দিনটার অপেক্ষাই তো করছিল সে। আজ সে তার বাবা মার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে। তাদের গর্বের অনুভূতি দিতে পেরেছে। তবে তার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে হচ্ছে তৃষার মুখটা দেখতে যখন সে তাকে এই খবরটা শোনাবে। উফ্ কি খুশিটাই না হবে ও। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ইউনিভার্সিটিতে আলাপ প্রসূনের তৃষার সাথে। প্রথম দেখাতেই বেশ ভালো লেগেছিলো তৃষাকে। তারপর থেকেই বাড়তে থাকে আলাপ, ধীরে ধীরে তারা হয়ে ওঠে একে ওপরের খুব কাছের বন্ধু। তবে হয়তো শুধু বন্ধু না। বন্ধুর থেকে অনেক বেশি কিছু তৃষা প্রসূনের কাছে। আসলে প্রথম দেখাতেই তৃষাকে ভালো লেগে গেছিলো প্রসূনের। সময়ের সাথে সেই ভালোলাগা পরিণত হয়েছে ভালোবাসায়। তবে কোনো দিন সে এ কথা বলে উঠতে পারেনি তৃষাকে। আসলে তৃষা সুন্দরী, বড়লোক বাড়ির একমাত্র মেয়ে, কলেজের বহু ছেলে পাগল তার জন্য। এসবের মাঝে তার মতন ছাপোষা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের ভালোবাসা কি স্থান পাবে.......হয়তো বন্ধুত্বটাও নষ্ট হয়ে যাবে....তবে আজ সে বলবে নিজের মনের কথা। এখন আর সে মধ্যবিত্ত নয়, এখন তার কাছে মোটা মাইনের চাকরি আছে বিদেশে। এখন সে নিজের মনের কথা বলবে তৃষাকে।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পাশে রাখা ডায়েরিটার দিকে চোখ গেল প্রসূনের। আগের বছর এই ডায়েরিটা তৃষাই দিয়েছিল প্রসূনকে। পাগলী দুটো একই রকম ডায়েরি কিনে এনেছিল। একটা সে নিজে লিখবে আর একটায় আমি লিখব। মনে মনে বেশ হাসিই পেয়েছিল সেদিন প্রসূনের। তবে বিগত ছয় মাস যখন এই চাকরির প্রস্তুতির জন্য তৃষার সাথে দেখা হয়নি, কথা হয়নি তখন কিন্তু এই ডায়েরিটাই তার একমাত্র সঙ্গী ছিল। প্রতিদিন সে এই ডায়েরিতে লিখেছে সে কতটা ভালোবাসে তৃষাকে। তবে আজ তার ভালোবাসার প্রস্তাবটাও এই ডায়েরিতেই লিখে তৃষাকে জানাবে সে।


( তৃষার বাড়িতে....... )

তৃষার মা : আরে অনেকদিন পর তো!!!

প্রসূন : হ্যাঁ কাকিমা, মানে ওই আসলে চাকরির চেষ্টা করছিলাম।

তৃষার মা : বাহ, খুব ভালো। তো চাকরি হল ?

প্রসূন : হ্যাঁ কাকিমা, আজই চিঠি এল। কানাডাতে পোস্টিং। ভালো মাইনে।

তৃষার মা: বাহ্, খুব ভালো খবর বাবা। আরো অনেক বড় হও।

প্রসূন : তৃষা বাড়িতে নেই?

তৃষার মা: হ্যাঁ আছে তো, যাক তুমি একটা খুশির খবর দিলে খুব ভালো লাগলো। তবে একটা ভালো খবর কিন্তু আমাদেরও আছে, উপরে যাও তোমার বন্ধু শোনাবে।

প্রসূন : আচ্ছা কাকিমা।

এই বলে সিড়ি দিয়ে উপরে তৃষার রুমে গেল প্রসূন।

প্রসূন : কী রে..............

তৃষা : ওমা তুই........( প্রসূন কে দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো তৃষা)
সেই তো চাকরি প্রিপারেশন করবো বলে ছয়মাস আগে যে উধাও হলি, তারপর থেকে কোনো পাত্তাই নেই তোর, ফোন করেছি পাইনি, মেসেজ করেছি উত্তর নেই।

প্রসূন : ( একটু হেসে) আরে ভাই চাকরি পেয়ে গেছিরে। কানাডাতে পোস্টিং আজই চিঠি এলো তাই তোকে সব বলতে এলাম।

তৃষা : ( একটু ব্যঙ্গ করে) হম বাবু এসছেন বিদেশের চাকরী নিয়ে। ওমা ওটা তোর হাতে ওই আমার দেওয়া ডায়েরিটা না ? 

প্রসূন : হ্যাঁ রে। তোকে অনেক কিছু বলার আছে রে।

তৃষা : আয় না বস, ( এই বলে বিছানার দিকে ইশারা করলো তৃষা ) এই দেখ আমারও আছে সেম ডায়েরি। ( এই বলে বিছানা থেকে ডায়েরিটা তুলে দেখলো সে প্রসুনকে)

প্রসূন : একটু হেসে বিছানায় গিয়ে বসলো। ডায়েরিটা পাশে রাখলো। 

তৃষা : ওই আচ্ছা বল তোকে কবে যেতে হবে ? জয়নিং কবে ? আর কি সব বলবি বললি..... বল বল.....প্রেমে পড়েছিস নাকি.....তুই তো আবার ভাই স্কলার স্টুডেন্ট....তুই তো কোনো তোর মত স্কলার দেখে প্রেম করবি। আমরা ভাই তোর ক্যাটাগরির নাহ, টেনে টুনে পাস করা পাবলিক....

( প্রসূন উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিল....তার আগেই তৃষা আবার বললো....)

তৃষা : ওই তোকে মা বলেছে খবরটা......

প্রসূন : কি খবর......?

তৃষা : আরে ভাই আমার বিয়ে পরের সপ্তাহে।

( নিমেষের মধ্যেই প্রসূনের সমস্ত জগৎ যেন অন্ধকার হয়ে গেল, তার সমস্ত খুশি যে একটা কথায় দুঃখে পরিণত হয়ে গেল)

প্রসূন : ( অনেক কষ্ট নিজেকে সামলে) মানে... বিয়ে মানে....কবে ঠিক হলো....

তৃষা : আরে বলিস না। বাবার বন্ধুর ছেলে, ভালো চাকরি করে। দেখাশুনা হল তারা পছন্দ করলো, বাবা মার কোনো অসুবিধা ছিলো না। আর কি ঠিক হয়ে গেল বিয়ে।
আর তোর তো পাত্তাই ছিলনা। তুই তো এমন প্রিপারেশন শুরু করলি.....আমি তো ভাবলাম একদম চাকরি সমেত কোনো স্কলারকে বিয়ে করে ফেসবুকে ছবি দিয়ে জানাবি। আমরা কম পাওয়া স্টুডেন্ট আমাদের তো পাত্তাই দিবি না।

প্রসূন : ( এবার একটু হাসির সাথে ) আরে না রে ভাই.....যাক ভালই হলো তোর বিয়ে.....এবার আর আমার মাথা খাবি না....নতুন চাকরি...শান্তিতে কাজ করবো নয়তো তুই জ্বালিয়ে মারতিস....এবার তোর বড় কে জ্বালাস। 

তৃষা : সেই....... যাই হোক কার্ড টা নিয়ে যাস আর সকাল সকাল আসবি কিন্তু।

প্রসূন : না ভাই কার্ড লাগবে না। আর আমার আসাও হবে না রে। আমার পরের সপ্তাহেই চাকরিতে জয়েন করতে হবে। সব অ্যারেঞ্জ করতে হবে। যায় হোক অনেক শুভ কামনা খুব ভালো থাক তোরা, আচ্ছা চল আজ উঠি আবার সব ব্যবস্থা করতে হবে। পরের সপ্তাহে বেরোনো।

তৃষা : এমা তুই আসবি না.....আচ্ছা তুই আর কি সব বলবি বললি....কই বললি না তো।

প্রসূন : না আজ থাক। দেরি হয়ে গেছে রে ভাই অনেক। 

(এই বলে উঠে বেরোতে এগোলো প্রসূন...)

তৃষা : ভাই তোর ডায়েরিটা.....
(এই বলে প্রসূনের ডায়েরিটা এগিয়ে দিলো তৃষা...)

ডায়েরিটা হাতে নিয়ে এক গাল হেসে রুম থেকে বেরিয়ে গেল প্রসূন।

বাড়ি ফিরে আজ মনটা খুব খারাপ প্রসূনের।

ছাদে বিকেলের পড়ন্ত রোদে বসে তার এই নিয়তির কথাই ভাবছিল প্রসূন। এতদিন ধরে সাজানো তার স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। কত স্বপ্ন না সে বেধেছিল তৃষাকে নিয়ে......সব স্বপ্ন আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আজ মন খুলে খুব কাদতে ইচ্ছে হচ্ছে......পাশে রাখা তৃষার দেওয়া সেই ডায়েরিটা যাতে তার সমস্ত অনুভূতি লেখা। আজ এই ডায়েরি দিয়েই সে তৃষাকে তার মনের কথা জানাবে ভেবেছিল.....কিন্তু....

ডায়েরিটা হাতে নিয়ে একবার খুললো প্রসূন....
"আজ দুমাস হয়ে গেল প্রসূনের সাথে কথা হচ্ছে না। আসলে ও চাকরিটা নিয়ে খুব সিরিয়াস। ওর ভালোর জন্য এই টুকু স্যাক্রিফাইস তো আমি করতেই পারি....যতই হোক ভালোবাসা কি আর এত সোজা....."

একই এ তো তৃষার ডায়েরি......(বিস্ফারিত চোখে ডায়েরির পাতা অল্টালো প্রসূন)

" বাড়িতে ছেলে দেখছে। আমার বিয়ের ইচ্ছে নেই। কিন্তু প্রসূনতো অত শিক্ষিত, সে ভালো চাকরি পাবে। আমার মতন পাগলির জন্য ওর ফিলিংস আসবে না। আমায় সারাজীবন ও পাগলীই ভাবে। হয়তো ওকে আমার মনের কথা গুলো জানালে ও আমায় খারাপ ভাববে। হয়তো বন্ধুত্বটাও নষ্ট হবে। না না থাক। আসলে সব ভালোবাসা হয়তো পরিণতি পায়না।"

(পরের পাতা ওল্টালো প্রসূন.....)

" আজ বাড়িতে ছেলে দেখতে আসবে। শেষ কদিনে অনেক বার প্রসূন কে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করলাম। পারলাম নাহ। হয়তো আমাদের বন্ধুত্ব টুকুই ছিলো আমার ভাগ্যে।"

( পরের পাতা......)

" আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। অনেক বড়লোক বাড়িতে বাবা বিয়ে দিচ্ছে। সবাই খুব খুশি......
আর হয়তো কখনো প্রসূনের সাথে দেখা হবে না। অনেক দূরত্ব হয়ে যাবে যা আর মিটবে না।"

ডায়েরিটা পড়তে পড়তে দু চোখ ভরে জল নেমে এলো প্রসূনের।
হঠাৎ পাশের ফোনটা বেজে উঠলো।
( তৃষা ফোন করেছ......)

তৃষা : হ্যালো......

প্রসূন : হ্যাঁ বল.....

তৃষা : তোর ডায়েরিটা তুই ফেলে গেছিস.....ভুল করে আমারটা নিয়ে গেছিস। আজ অনেকটা দেরি করে এলি রে। আর একটু আগে আসলে তোর সব কথা গুলো তুই বলতে পারতিস। যাই হোক চল রাখলাম। ভালো থাকিস, ভালোভাবে চাকরি করিস।

তৃষার বলা কথা গুলো যেন বার বার কানে বাজতে লাগলো প্রসূনের।

"হয়তো এভাবেই শেষ হয় কিছু কাহিনীর,
যেখানে বাকি থেকে যায় কিছু বলা,
কখনো সময়ের অভাব,
কখনো বা পরিস্থিতির চাপ।
কখনো আবার থাকে
একে অপরকে হারানোর ভয়,
তাই মন বলে নাই হোক সব বলা,
হোক কিছু কাহিনীও এমন,
যা অসম্পূর্ণ রয়েই সম্পূর্ণ হয়।।"