সকাল সকাল রাজশেখর কে দেখে বেশ অবাকই হলো অবিনাশ।
আসলে রাজশেখর আর অবিনাশ ছোটবেলার বন্ধু যদিও বহু বছর যোগাযোগ ছিলনা তাদের। আসলে অবিনাশের গ্রামের জমিদারের ছেলে রাজশেখর আর অবিনাশের বাবা ছিলেন জমিদার বাড়ির কুলো পুরোহিত। কুলো পুরোহিতের ছেলে হিসাবে অবিনাশের ছোট থেকেই জমিদার বাড়িতে ছিল অবাধ আনাগোনা আর তার সুবাদেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল রাজশেখর আর অবিনাশের। তবে সময়ের সাথে সাথে বন্ধুত্ব গভীর হলেও একসময় রাজশেখর পড়াশুনার জন্য বিদেশে পাড়ি দেয় যদিও অবিনাশ কিন্তু নিজের বাবার পেশাকেই বেঁচে নেয় কিন্তু তার সাথে ধীরে ধীরে তার আগ্রহ বেড়ে ওঠে তন্দ্র সাধনার দিকে এবং তার বাবার মৃত্যুর পর সে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে যায় তন্ত্রের সাধনার জন্য।
তাই আজ বহু বছর পর নিজের ছোটবেলার বন্ধুকে দেখে বেশ অবাকই হলো অবিনাশ।
অবিনাশ : কি রে তুই ? মানে এখানে কি করে ? ঠিকানা কোথায় পেলি ?
রাজশেখর : এত বড় তন্ত্র সাধকের কি আর ঠিকানা খুঁজে পেতে সময় লাগে.....?
অবিনাশ : আরে যা কি যে বলিস....ভেতরে আয়।
এই বলে দুজনে ঘরের ভেতর ঢুকলো।
অবিনাশ : যাক এসেছিস ভালই হলো, দুই বন্ধু মিলে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে। দাড়া দুপুরের খাবারটা বলেদি, এই নিধিরাম....
রাজশেখর : এই না না ব্যস্ত হোসনা, আমি একটা খুব বিপদে পড়েছি ভাই।
অবিনাশ : বিপদ ! কেনো রে ? কি হলো আবার ? সব ঠিক আছে তো ?
রাজশেখর : না ভাই কিছুই ঠিক নেই....
গত ছয় মাস ধরে, গ্রামে মড়ক লেগেছেরে, প্রায় তিরিশ জন মারা গেছে, না জানি আর কত জন বলি হবে এর।
অবিনাশ : সেকি ? কোনো রোগ নাকি ? কোনো ডাক্তার বদ্দি কিছু করতে পারছে না ?
রাজশেখর : ডাক্তার বদ্দির কাজ নয়রে, আর সেই জন্যই তোর কাছে আসা। বড় আশা করে এসেছি, তুই ই পারবি এর কিছু একটা ব্যবস্থা করতে।
অবিনাশ : আমি !......ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলতো....
রাজশেখর : আজ থেকে ছয় মাস আগে এক রাতে হঠাৎ করে এক ভয়াবহ ঝড় ওঠে। গরম কালে এরম কাল বৈশাখী ওঠাটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু পরদিন সকালে গ্রামের পশ্চিমে ওই যে আমবাগানটা ছিল সেখানে গ্রামের একজনের লাশ পাওয়া গেলো। লাশের মুখ পুরো বিস্মিত, চোখ গুলো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, ঠিক যেন কিছু দেখে খুব ভয় পেয়েছে। আর লাশের পুরো শরীরটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে যেন শরীর থেকে সব রক্ত কেউ বার করে নিয়েছে। গ্রামের দারোগা বাবু এসে লাশ নিয়ে গেল কিন্তু খুনের কোনো কুল কিনারা করতে পারলো না।
এই বলে একটু থামলো রাজ শেখর।
অবিনাশ : তারপর ???
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো নিধিরাম।
নিধিরাম : ডাকছিলেন বাবু ?
অবিনাশ : গ্রাম থেকে আমার ছোটবেলার বন্ধু এসেছে। চট করে একটু জল খাবার করে নিয়ে এসো।
রাজশেখর : না না ব্যস্ত হবার দরকার নেই। আমি কিছু খাবো না। তবে একটু জল হলে ভালো হয়।
অবিনাশ : এই না না এটা হয় নাকি...।
রাজশেখর : না ভাই, বিশ্বাস কর এসবের দরকার নেই, আমি যেটা তোকে বলতে এসছি সেটা বলা বেশি দরকার।
নিধিরাম তুমি শুধু একটু জল নিয়ে এসো।
রাজশেখরের কথামত এক গ্লাস জল এনে টেবিলের উপর রাখলো নিধিরাম।
নিমিষের মধ্যে গ্লাস ফাঁকা করে টেবিলের উপর রাখলো রাজশেখর।
অবিনাশ লক্ষ্য করলো রাজশেখর যেন কিছুতে খুব ভয় পেয়ে আছে, তার কাহিনীর বর্ণনা দিতে গিয়ে যেন তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।
অবিনাশ : আর একটু জল দিতে বলবো?
অবিনাশের কথায় যেন হুশ ফিরল রাজশেখরের।
রাজশেখর : না না....
অবিনাশ : তারপর কি হলো ???
রাজশেখর : তারপর........, তারপর আবার বেশ কিছুদিন স্বাভাবিক ভাবেই কাটল কিন্তু আবার একই ভাবে আর একদিন রাতে এরম ঝড় উঠলো এবং একই ভাবে পরদিন সকালে আরো এক গ্রামবাসীর লাশ পাওয়া গেলো। এভাবে কিছুদিন পর আবারও ঠিক একই ঘটনা ঘটলো। এবার সবাই হিসাব করে দেখলো প্রতিটা খুনের মাঝে ঠিক এক সপ্তাহের ব্যবধান থাকে, এদিকে দারোগা বাবুও এই সব খুনের হদিস করে পারছে না। আর এরম একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষের শরীর থেকে রক্ত বের করে তাকে মেরে ফেলাটা খুব স্বাভাবিক ঘটনাতো নয়। গ্রামবাসীর এবার ভয়ে দিন গুনতে লাগলো না জানি এবার কার পালা। আবার এক সপ্তাহের শেষে সেই ঝড় এবং পরদিন ফের একটি লাশ মিলল একই অবস্থায়। গ্রামের লোকেরা জমিদার বাড়িতে এসে বিচার চাইলো। আমি নিজে একটা লেঠেল দল তৈরি করে ঠিক করলাম এই বার ঝড় উঠলে আমি নিজে যাব লেঠেলদের নিয়ে। অবশেষে একসপ্তাহ পর আবার সেই রাত এলো, আমি আগে থেকেই কিছু লেঠেলদের গ্রামের আনাচে কানাচে মোতায়েন করে রেখেছিলাম। রাত হতেই আমি নিজে লেঠেলদের নিয়ে টহল দিতে শুরু করলাম। একটু রাত বাড়তেই সেই ঝড় উঠলো কিন্তু আশ্চর্য ভাবে ঝড় উঠতেই কিভাবে যেন আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ একটা শোরগোলে ঘুম থেকে উঠে দেখি ভোর হয়ে গেছে, এক গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাস করায় সে বলল " হুজুর লাশ মিলেছে আবার....না জানি কার কপাল পুড়লো এবার....." এভাবে আরো বেশ কিছু সপ্তাহ কাটলো কিন্তু কোনো কিছুই বদলালো না, ধীরে ধীরে গ্রামবাসীরা ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাতে লাগলো। এরপর একদিন আমাদের ছোটবেলার অ্যালবামটা দেখতে দেখতে তোর কথা খুব মনে হলো, খোঁজ নিয়ে জানলাম তুই বড় তান্ত্রিক হয়েছিস, অনেক নাম ডাক তোর, তাই অসহায় হয়ে তোর কাছে এলাম। আমার চারিদিক অন্ধকার, এখন তুইই ভরসা কারণ আমার বিশ্বাস এই খুন গুলো কোনো সাধারণ খুন নয়। এর পিছনে লুকিয়ে আছে কোনো বড় অশুভ শক্তি।
অবিনাশ : হম, বুঝলাম....আমারও মনে হয় তোর অনুমান সঠিক। তবে একবার গ্রামে গিয়ে সবটা না দেখে এখনই সবটা বলা সম্ভব না।
রাজশেখর : বেশ তো..... চলনা....সেই ছোটবেলার স্মৃতি গুল আবার জেগে উঠবে। আর জানিস তো খুব একা হয়ে গেছিরে, তুই সাথে থাকলে একটু ভরসাও পাবো।
অবিনাশ : আচ্ছা দাড়া আমি কয়েকটা দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিয়ে তোর সাথেই যাব, হ্যা তবে দুপুরে খেয়ে যেতে হবে কিন্তু।
এই নিধিরাম.....
নিধিরাম : হ্যা বাবু ডাকলেন....
অবিনাশ : হ্যা, শোনো আজ দুপুরে আমরা দুজনে খাবো, বেশ কষিয়ে সুন্দর করে রান্না করে দেখি।
মুচকি হেসে অবিনাশের কথায় সম্মতি জানালো রাজশেখর।
নিধিরাম : আচ্ছা বাবু।
এই বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো নিধিরাম।
যেমনি কথা তেমনি কাজ, অগত্যা দুই বন্ধু মিলে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে পড়ল তাদের গ্রামের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে যেতে যেতে অবিনাশের তাদের ছোট বেলার কথা খুব মনে পড়ছিল। কিভাবে তারা দুজনে ক্ষেতের মাঝে সারাদিন খেলে বেড়াতো, নদীর জলে সাঁতার কাটা, বাগান থেকে ফল চুরি কোনো কিছুই তারা বাদ দেয়নি। ভাবলে মনে হয় এই তো কিছু দিন আগেরই কথা, কিন্তু দেখতে দেখতে বহু বছর পেরিয়ে গেছে। শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে আজ সবই অতীত। সত্যি কত ভালো ছিল সেই দিন গুলো। সত্যি যদি কোনো জাদুবলে আবার ফেরত যাওয়া যেতো সেই দিন গুলোতে। আবার গাছে দোল খাওয়া যেত সেই গ্রীষ্মের দুপুর গুলোতে বা আবার ছুটে বেড়ানো যেতো শীতের ভোরের শিশির কণা গুলোর উপর.......
অবশেষে জমিদার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো। অবিনাশ গাড়ি থেকে নেমে বেশ খানিক ক্ষণ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো, এই বাড়িতেই তার ছোটবেলা কেটেছে। কত কোলাহল, শোরগোলের মাঝে। জমিদার কাকু থাকার সময়তো প্রতিদিন উৎসব হতো এই বাড়িতে, সকাল থেকে রান্না, হৈ হুল্লোড়.....সে যেন এক আলাদাই আনন্দের পরিবেশ ছিল। অবিনাশের এখন মনে আছে, সকালে গ্রামের স্কুল থেকে ফিরেই সে সোজা চলে আসতো এই জমিদার বাড়িতে, মা ঠাকুরাণীর হাতের লুচি আর আলুরদম তাদের দুই বন্ধু মিলে একসাথে খাওয়া, যেন এক আলাদাই শান্তি ছিল, কিন্তু আজ সব নিস্তব্ধ, যেন কোনো এক অশুভ কালো অন্ধকারে ডুবে আছে পুরো বাড়িটা।
রাজশেখর : কিরে ভেতরে আয়...
রাজশেখর এর কথায় হুশ ফিরল অবিনাশের।
অবিনাশ ঘরে প্রবেশ করতেই একজন পরমা সুন্দরী তরুণী তাকে এসে প্রণাম জানালো।
অবিনাশ একটু আশ্চর্য হওয়াতে রাজশেখর বলল : তোকে বলা হয়নি রে, ও লিলি, আমার স্ত্রী। বেশ কিছু মাস আগেই আমাদের বিয়ে হয়। লিলির মা বাবা কেউ নেই। যাই হোক পড়ে বলব তোকে সব আপাতত এতটা রাস্তা এসেছিস এখন একটু বিশ্রাম কর বিকালে কথা হবে।
বিকাল হতে রাজশেখর এসে অবিনাশকে বলল : চল একটু বেরিয়ে আসবি নাকি ? আর তোকে ওই আমবাগানের জায়গাটাতেও নিয়ে যাচ্ছি চল যেখানে মৃত দেহ গুলো পাওয়া গেছে।
অবিনাশ : হম চল।
এই বলে দুই বন্ধু মিলে গ্রামে বেরোলো। রাস্তায় যেতে যেতে অবিনাশ লিলির ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলো।
অবিনাশ : এই তুই বিয়ে করেছিস এটাতো বলিসনি। কিভাবে আলাপ ? বৌঠান দেখতে তো অপূর্ব সুন্দরী।
রাজশেখর : আর বলিসনা ভাই, লিলির পরিবারে কেউ নেই। আসলে একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের ওই দক্ষিণ দিকের জঙ্গলটা মনে আছে তার মাঝের ওই মন্দিরটাতে গিয়ে বসেছিলাম। আসলে মনটা ভালো লাগছিলনা। আর ওই জায়গাটা বেশ নির্জন হওয়াতে মাঝে মধ্যেই আমি ওখানে বসে থাকতাম। সেদিন একটু বেশি সময় বসে ছিলাম মনটা ভালো লাগছিলনা তাই, কিন্তু হঠাৎ একটা মহিলা কণ্ঠের আর্তনাদে হুশ এলো আমার।
আমি বেশ একটু আশ্চর্যই হলাম। এত রাতে এরম নির্জন জায়গাতে মহিলার আর্তনাদ!! আমি সেই আর্তনাদ অনুসরণ করে এগোলাম। বেশ কিছুটা যেতেই দেখি একজন তান্ত্রিক একজন মাঝ বয়সী মেয়েকে হাত পা বেঁধে ফেলে রেখেছে এবং তাকে বলি দেবার জন্য তৈরি হচ্ছে। আমি তখন পকেট থেকে রিভলবার বার করে এগিয়ে গেলাম তান্ত্রিকের দিকে। শূন্যে একটা ফায়ার করতেই তান্ত্রিক ভয়ে ছুটে পালালো। যাবার সময় বিড়বিড় করে গালাগাল করতে লাগলো আমায়
তান্ত্রিক : ভুল করছিস তুই....ধ্বংস হয়ে যাবে সব...ভুল করছিস...
রাজশেখর : তান্ত্রিক চলে গেলে সেখান থেকেই আমি লিলিকে উদ্ধার করি। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেছিলাম। পরে জানতে পারলাম লিলির কেউ নেই। তান্ত্রিক নাকি তার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে। আজ নাকি ওকেও বলি দিয়ে দিত কিন্তু আমি এসে যাওয়াতে ও রক্ষা পায়।
খুব মায়া হয়েছিল সেদিন লিলিকে দেখে, এরম অসহায় একটা মেয়ে, কোথায় যাবে, আবার হয়তো এরম কোনো বিপদে গিয়ে পড়বে। তাই ঠিক করলাম ওকে বিয়ে করবো। লিলিকে প্রস্তাব দিতেই সে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যায়।
কিন্তু বিয়ের পর লিলি আমায় খুশি রাখলেও আমি কিন্তু ওকে সুখী করতে পারিনি। এই ক্রমাগত একের পর এক খুন হয়ে যাওয়াতে আমি মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত।
এই বলে একটা গাছের বেদির নিচে বসে পড়ল রাজশেখর।
অভিনাশ : চিন্তা করিসনা। আমি আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।
আচ্ছা শেষ খুনটা ঠিক কতদিন আগে হয়েছিল ?
রাজশেখর : এই তো গত বুধবার রাতে।
অবিনাশ : আচ্ছা তাহলে হিসাব মতন পরের খুনটা হবে সামনের বুধবার। আজ সোমবার তার মনে কাল বাদে পরশুই কিছু একটা হতে চলেছে।
ঠিক আছে আজ বাড়ি ফেরত চল।
বাকি আমি দেখছি। কিছু চিন্তা করিস না।
রাতে খাবার টেবিলে খেতে বসে অবিনাশের আবার দেখা হলো লিলির সাথে।
অবিনাশ : বৌঠান তুমি খাবে না ? এই তুই কেমন নিজে খেতে বসে গেলি আর বৌঠান কে খেতে বসতে বললি না।
রাজশেখরের উদ্দেশ্যে বলল অবিনাশ।
রাজশেখর : আরে লিলি সবার শেষে খায়। বিয়ের পর আজ অবদি ওকে আমি একসাথে খাওয়াতে পারিনি। ওর কথা আমি ওর গুরু জন তাই আমার সামনে খেলে ওর পাপ হবে। তাই আমার খাওয়া হয়ে গেলে ও রান্না ঘরে একা বসে খেয়ে নেবে। বিয়ের পর থেকে একবারও এই নিয়মের পরিবর্তন হয়নি।
অবিনাশ : সে ঠিক আছে তবে আজ অনেকদিন পর আমরা দুই বন্ধু একসাথে খেতে বসেছি, বৌঠান তুমিও যদি আজ আমাদের সাথে খেতে বসতে তাহলে খুব ভালো হতো।
লিলি : না আপনারা খান। আমি পড়ে খাবো।
রাত্রি বেলা খেয়ে সবাই ঘুমাতে চলে গেলো। তবে অবিনাশের কিন্তু ঘুম এলো না। এই গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো নিয়ে অবিনাশ ভাবতে লাগলো।
অবিনাশ মনে মনে ভাবতে লাগলো : প্রতি এক সপ্তাহ পর পর এরম খুন কি করে হচ্ছে ??? এই খুনের সাথে এই ঝড়ের কি সম্পর্ক ? রাজশেখর যেই তান্ত্রিকের থেকে বৌঠানকে মুক্ত করে এগুলো সেই তান্ত্রিকের কোনো কাজ না তো ?
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল অবিনাশ।
সকালে লিলির ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো অবিনাশের।
লিলি : চা তৈরি আছে। আপনার বন্ধু অপেক্ষা করছে বাইরে।
এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো লিলি।
অবিনাশ : সকালে আরো যেন বেশি অপুর্ব লাগছিল লিলিকে। কেমন যেন মন মুগ্ধের মত তাকিয়ে রইল সে।
রাজশেখর : কি রে উঠতে দেরি হল ? কাল ঘুম হয়েছিল ?
বাইরের বারান্দায় অবিনাশকে দেখে বলল রাজশেখর।
অবিনাশ : না না সেরকম কিছু না।
দুটো কাপ কেন? বৌঠান খাবে না ?
লিলি : না আপনারা খান। আমি পড়ে খাবো।
রাজশেখর : তোকে বললাম না, ও আমার সাথে খাবে না। আমাদের খাওয়া হলে তবেই ও খাবে।
এই বলে চায়ে চুমুক দিল রাজশেখর।
রাজশেখর : আচ্ছা, তুই কিছু ভাবলি ?
অবিনাশ : দেখ প্রতি এক সপ্তাহ গুণে গুণে খুন হচ্ছে তার মানে এটা কোনো পশুর কাজ না। আর একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষের শরীর থেকে সমস্ত রক্ত বার করে নিচ্ছে তার মনে এটা কোনো মানুষের পক্ষেও করা খুব কষ্টকর। তাই এটা কোনো অশুভ শক্তির কাজ সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
আচ্ছা তুই বৌঠান কে তান্ত্রিকের হাত থেকে মুক্ত করে বাড়ি নিয়ে আসার ঠিক কতদিন পর থেকে এই খুন গুলো হচ্ছে বলতো ?
এবার রাজশেখর একটু ভেবে বলল : ওই ধর তিন চারদিন পর থেকেই। দাড়া দাড়া এটাতো ভেবে দেখিনি। তাহলে তুই কি বলছিস ওই তান্ত্রিকের কারসাজি এই গুলো ? হম হম ঠিক ওই তান্ত্রিকই করছে তার মানে এই সব। দাড়া এখুনি লেঠেলদের বলছি যেখান থেকে হোক ওই তান্ত্রিককে তুলে আনতে আজকেই ওর বিচার করবো। এত গুলো লোকের প্রাণনাশ করেছে। ওকে আমি নিজের হাতে শেষ করবো।
অবিনাশ : দাড়া দাড়া তাড়াহুড়ো করিসনা। আমি দেখছি কি করা যায়। তুই শান্ত হও। তুই থাক আমি একটু গ্রামটা ঘুরে দেখে আসি দাড়া।
এই বলে বেড়িয়ে গেল অবিনাশ।
কিন্তু সূর্য অস্ত যাবার পরও অবিনাশ না ফেরায় বেশ চিন্তায় পড়ে গেল রাজশেখর।
রাজশেখর : সন্ধ্যে হয়ে গেলো কই অবিনাশতো এখনো ফিরল না।
লিলি : আপনার বন্ধু বিপদ দেখে পালিয়েছে। খুব বড় তান্ত্রিক কিনা, বিপদ বুঝে পালিয়েছে।
রাজশেখর : না অবিনাশ ওরকম নয়। নিশ্চই ওর কোনো বিপদ হয়েছে। ও আমায় ছেড়ে পালাবার লোক নয়।
লিলি : জীবনের মায়া খুব বড় মায়া, তার কাছে বন্ধু পরিবার কোনো কিছুরই দাম নেই।
এই বলে নিজের ঘরে চলে গেল লিলি।
দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেলো কিন্তু অবিনাশ ফিরল না।
রাজশেখরের ধীরে ধীরে লিলির কথা গুলোই সত্যি মনে হতে লাগলো, হয়তো সত্যি তার বন্ধু তার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে পালিয়েছে।
আর সত্যিই তো এত বছর যোগাযোগ নেই, হঠাৎ করে ছোটবেলার বন্ধুর কথায় নিজের প্রাণের ঝুঁকি কেউ নেয় নাকি...!!! আসলে সেই বোকা যে অনেক বেশি আশা করে বসেছিল ছোট বেলার বন্ধুর থেকে.......কিন্তু অবিনাশ বিচক্ষণ মানুষ তাই বিপদ বুঝে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছে, সরাসরি হয়তো বলতে পারেনি তাই এভাবে চলে গেছে।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল রাজশেখর। সকালে পাখির কোলাহলে ঘুম ভাঙ্গলো রাজশেখরের।
তাড়াতাড়ি বাইরে এসে রাজশেখর দাড়োয়ান কে জিজ্ঞাস করলো : অবিনাশ বাবু ফিরেছেন ?
দাড়োয়ান : কই বাবু নাতো......
দাড়োয়ানের কথায় বেশ নিরাশই হলো রাজশেখর।
সে যেন কিছুতেই তার বন্ধুর এই চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিল না। তার বার বার মনে হচ্ছিল এই বুঝি অবিনাশ ফিরে আসবে। কিন্তু বৃথা আশা। সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে এলো কিন্তু অবিনাশ ফিরল না।
মনটা দুঃখে আর যেন বেশি কাতর হয়ে গেলো রাজশেখরের। এই বিপদের দিনে যাকে সে নিজের শেষ ভরসা ভেবেছিল সেও তাকে ছেড়ে চলে গেল।
আসলে লিলি ঠিকই বলেছে, প্রাণের মায়া বড় মায়া। তাই হয়তো অবিনাশও নিজের প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছে। কিন্তু সে কোথায় পালাবে এই গ্রাম ছেড়ে......? না হয়তো এই তার নিয়তি, এই অজানা বিভীষিকার হাতে হয়তো তার প্রানটাও যাবে।
কিন্তু বিনা চেষ্টায় সে হাল ছাড়বে না। অবিনাশ চলে গেছে তো কি হয়েছে.....তবে সে যাবার আগে তান্ত্রিকের কথাটা কিন্তু ঠিকই বলে গেছে। সত্যি তো সেই তান্ত্রিক তাকে হুমকি দিয়েছিল সব ধ্বংস করে দেবার। হয়তো তার ই কোনো তন্ত্র বলে তাদের গ্রামে এই অজানা বিভীষিকার আবির্ভাব। এসব ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে চলল, সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাস আসতে আসতে রাতের সেই চেনা ঝড় হয়ে উঠলো ।
রাজশেখর ব্যাকুল ভাবে ভগবানকে ডাকতে শুরু করলো,
রাজশেখর : হে ভগবান, আমাদের রক্ষা করো। এই বিপদের থেকে আমাদের রক্ষা করো।
অবিনাশ : উপায় এনেছি কিন্তু সাহস রাখতে হবে কিন্তু.....।
রাজশেখর পেছন ঘুরে দেখতেই দেখে দাড়িয়ে অবিনাশ। তবে আজ সে তার তন্ত্র সাধকের বেশে। গায়ে লাল বস্ত্র। হাতে ত্রিশুল, কপালে মায়ের তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।
রাজশেখর : তুই এসেছিস......
এই বলে অবিনাশকে জড়িয়ে ধরলো রাজশেখর।
রাজশেখর : কোথায় চলে গেছিলিস ? কোনো খোঁজ নেয়। কাল সারারাত আজ সারাদিন কেটে গেলো।
অবিনাশ : থাক ওসব বলব তোকে পড়ে। এখন যা বলব কোনো প্রশ্ন ছাড়া শুনবি। সময় খুব কম আমাদের হাতে।
বৌঠান কোথায়?
রাজশেখর : ওই তো শোওয়ার ঘরে ঘুমাচ্ছে, সন্ধ্যে থেকে ওর শরীরটা ভালো নেই।
অবিনাশ : তুই এই তাবিজটা নিজের গলায় পড়েনে আর এইনে এই ত্রিশুলটা তোদের শোওয়ার ঘরের দরজার সামনে দাড় করিয়ে রেখে দে।
রাজশেখর কোনো প্রশ্ন না করে ত্রিশুলটা নিয়ে রেখে এলো তাদের শোওয়ার ঘরের দরজার সামনে।
অবিনাশ : আমার সাথে আয়।
এই বলে রাজশেখর কে সাথে নিয়ে মন্ত্র বলে বলে বাড়ির চারিধারে একটা গণ্ডি কাটলো অবিনাশ।
ধীরে ধীরে ঝড় বেড়ে উঠলো।
রাজশেখর : আজ যেন ঝড়টা অন্য দিনের চেয়ে বেশি জোরে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আজ পৃথিবী ধ্বংস না করে এই ঝড় থামবে না।
অবিনাশ : চিন্তা করিস না। তুই আমার সাথে থাক আর ঈশ্বরের নাম জব। উনিই রক্ষা করবেন।
ধীরে ধীরে ঝড় থেমে গেলো।
রাজশেখর : বিপদ কি কেটে গেলো ?
অবিনাশ : কেটে এখনো যায়নি তবে জব্দ হয়েছে কিছুটা।
এখন আয় আমার সাথে।
এই বলে রাজশেখর কে হাত ধরে টানতে টানতে তার শোওয়ার ঘরের সামনে নিয়ে গেলো।
ধীরে ধীরে ত্রিশুলটা সরিয়ে দরজা খুলতে বলল অবিনাশ।
কিন্তু একি ভেতরে বসে আছে এক কদাকার পিশাচীনি।
এই দৃশ্য দেখে রক্ত হিম হয়ে গেলো রাজশেখরের।
রাজশেখর : এ কে ? লিলি কোথায় ? কে এই পিশাচীনি ?
অবিনাশ সাথে সাথে রাজশেখরের হাত ধরে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই উঠে দাড়ালো সেই কদাকার পিশাচীনি ।
রাজশেখর : লিলি কোথায় ? কি করেছিস তুই লিলির সাথে.....নরকের কীট....তোকে আমি ছাড়বো না।
পিশাচীনি : আগে তোদের কে আমার হাত থেকে কে বাঁচায় দেখ....তোদের দুজনের রক্ত খাবো আজ।
এই বলে একটা বিকট হাসি হেসে রাজশেখরের দিকে ঝাপাল সেই পিশাচীনি।
অবস্থা বেগতিক দেখে নিজের ব্যাগ থেকে একটা কি বার করে পিশাচীনির দিকে ছুঁড়ে দিলো অবিনাশ।
অমনি সেই পিশাচীনি বাবাগো মাগো বলে দূরে সরে গেলো।
অবিনাশ : আজ তোর খেলা শেষ নরকের কীট।
এই বলে ব্যাগ থেকে একটা ছুরি বার করে সেই পিশাচীনির দিকে ছুটে গিয়ে তার বুকে সেই ছুরি বসিয়ে দিতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে আর ধীরে ধীরে ছাই হয়ে মিলিয়ে গেলো সেই কদাকার দেহটা।
অবিনাশ : আজ থেকে এই গ্রাম মুক্ত। আর কাউকে এই পিশাচীনির হাতে বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে না।
রাজশেখরের উদ্দেশ্যে বলল অবিনাশ।
রাজশেখর : কিন্তু লিলি কোথায় অবিনাশ ? আর তুই বুঝলি কি করে এটা কোনো পিশাচীনির কাজ ?
অবিনাশ : সব বলছি দাড়া। আসলে সেদিন রাতে আমার জানলার নিচে কিছু বিড়ালের কান্নার আওয়াজ পাই। তবে আওয়াজটা কেমন যেনো আর্তনাদের মতন ছিল। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির পেছনটাতে যেতেই দেখি বিড়ালের সদ্য খাওয়া কয়েকটা কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। তখন হাড়ে কিছু মাংস লেগে রয়েছে। এই দেখে আমার একটা খটকা লাগে। আমি তখন তোর থেকে তোদের বিয়ের আর এই খুনের সময়টা জানি এবং সেই তান্ত্রিকের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাই। মন্ত্রবলে সেই তান্ত্রিক কে খুঁজে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। তবে তান্ত্রিক যা বলল তা খুবই ভয়াবহ। আসলে সেদিন তুই যে লিলি কে উদ্ধার করে ছিলিস সে কোনো সাধারণ মহিলা নয়। "লিলি" আসল নাম "লিলিথ" অন্ধকারের রানি, রাক্ষসী রানি "লিলিথ".....
শুনে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো রাজশেখরের।
অবিনাশ আরো বলে চলল : আসলে এরা এক ধরনের নারকীয় জীব। এদের নিজেদের যৌবন ধরে রাখতে এবং নিজেদের শক্তিশালী করে রাখতে মানুষের রক্ত প্রয়োজন হয়। একদিন মানুষের রক্ত পান করলে এরা সাত দিন অবদি নিজের রূপ এবং শক্তি ধরে রাখতে পারে তাই খুন গুলো প্রতি সাত দিন বাদে বাদে হতো এবং এরা মানুষের খাদ্য খেতে সক্ষম নয় তাই তোর লিলি কখনও তোর সাথে খেতে না, কারণ তার খাবার ছিল বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো বেড়াল, কুকুর, পাখি এসব। এই রাক্ষসী পিশাচীনিদের তাদের যৌবন রূপে যদি বলি দেওয়া যায় তাহলে তা তন্ত্র সাধনার পক্ষে খুবই উপযোগী। এর দ্বারা অমরত্ব লাভ করাও সম্ভব। আর সেদিন সেই তান্ত্রিক সেই প্রচেষ্টাই করছিল।
তুই যখন আমায় বললি যে লিলির পুরো পরিবার কে এই তান্ত্রিক শেষ করে দিয়েছে তখন আমি আন্দাজ করেছিলাম এই লিলি কে মারার উপায়ও ওই তান্ত্রিকের কাছেই আছে।
সেই তান্ত্রিকের থেকে জানতে পারিযে এই পিশাচীনিদের মারার একমাত্র উপায় হলো রুপোর ছুরি যদি পূর্ণিমার রাতে কোনো সদ্য মৃত কোনো মৃতদেহের রক্ত দিয়ে পরিশুদ্ধ করা হয় তবেই সেই ছুরি দিয়েই এদের মারা সম্ভব। তান্ত্রিকের কাছ থেকেই সেইরকম ছুরি পেলাম আর তারপর এখানে এসে আগে মা কালীর ত্রিশুল মন্ত্র পড়ে তোকে দিয়েছিলাম তোদের শোয়ার ঘরের দরজার বাইরে রাখতে, যাতে সেই পিশাচীনি বেরোতে না পারে আর বাকি বাড়ির চারপাশে গাত্রবন্ধন করেদি যাতে সেই অশুভ শক্তি কোনো ভাবে আর কারুর ক্ষতি না করতে পারে ।
রাজশেখর : আচ্ছা একটা কথা বল, তুই বললি তুই বিড়ালের কান্না শুনেছিলিস এবং সেখান থেকেই তোর সন্দেহ হয়। কিন্তু আমি এতদিন ধরে কিছু শুনতে পেলাম না কেনো ?
অবিনাশ : সেদিন যখন তুই লেঠেলদের নিয়ে রাত্রি বেলা বেড়িয়েছিলিস তখন ঝড় ওঠার পর তোরা ঘুমিয়ে গেছিলিশ। কারণ ওই পিশাচীনি নিজের মন্ত্র বলে তোকে এবং এই জমিদার বাড়ির সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দিত যাতে রাতে তার কার্যকলাপ তোরা কেউ টের না পাস। কিন্তু আজ তোকে এই তাবিজটা পরানোতে সেই পিশাচিনীর মন্ত্র আর কাজ করেনি। তাই তুই ঘুমাসনি আজ।
রাজশেখর : কি বলে যে তোকে ধন্যবাদ দেব। আমাকে আর পুরো গ্রামকে তুই রক্ষা করলি ভাই।
অবিনাশ : মুচকি হেসে, একটা কচি পাঠা খাওয়ালে মন্দ হবে না।
দুই বন্ধু হেসে উঠলো..........