Monday, December 15, 2025

SIR

কাটছে দিন আজ ভয়ের মাঝে,
সবাই ভাবছে হলো একি হঠাৎ,
SIR নাকি CAA 
নাকি নতুন কিছুতে হবে সে বাদ।

করছে সবাই জোগাড় নথি,
খুঁজছে ভোটার আধার প্যান,
না জানি কি ভাগ্যে আছে,
মনে হয় সবই উপর ওয়ালার প্ল্যান।

ঘাটছে সবাই পুরোনো নথি,
সবাই খুঁজছে বাবার নাম,
বৃদ্ধাশ্রমে মা ফিরে পাচ্ছে,
তার হারানো সন্তান।

দাবী সবারই পুরোনো তারা,
বহুকাল ধরে তাদের বাস,
বহু যুগের বাসিন্দা তারা,
তাতে নেই কোনো সন্দেহের অবকাশ।

দাবী বহু যুগের ভোটার তারা,
দিয়েছে ভোট প্রতিবার,
তবে কেনো এখন লাগবে নথি,
এই প্রশ্নই এখন সবার।

চিন্তা সবার একই এখন,
যদি না পাওয়া যায় নথি,
যদি না পাওয়া যায় যোগ্য প্রমাণ,
না জানি হবে কোন দুর্গতি।

হতে হবে কি তাদের দেশান্তরী,
দিতে হবে অন্য দেশে পাড়ি,
হারাতে হবে নাকি সেসব কিছু,
যার ছিল তারা অধিকারী।

তবে ভয় এখন বৃথাই করা,
নেই ভয়ের কোনো কারণ,
থাকবে সবাই এই দেশেই,
যারা ছিল এই দেশেরই জনগণ।
পাবে তারা সব অধিকার,
পাবে যোগ্য সম্মান,
বাঁচবে সবাই নিয়ে পরিচয়,
সবাই ভারত মাতার সন্তান।

















Thursday, April 24, 2025

ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর

ভূস্বর্গ হলো ভয়ঙ্কর আজ,
আতঙ্কে হতভম্ব চারিদিক,
নিরস্ত্রদের নিধন হল,
কোন ধর্মে এ হলো ঠিক ?

হিন্দু, তামিল, শিখ, ইসাই,
বাদ তো গেলনা কেউ,
কান্নায় হলো স্বর্গ মুখর,
উঠলো জমিতে রক্তের ঢেউ।

দেখলো দেশ এই নিধন মেলা,
গর্জে উঠলো চারিদিক,
মানবিকতার সীমা পেরিয়ে,
এখন শুধু বদলাই সঠিক।

বদলা সেই চোখের জলের,
বদলা সেই কান্নার,
র্নিদোষদের নিধন হলো,
তাই মানবিকতার পাঠ আর না।

শেষ করতে হবে আতঙ্ককে,
আতঙ্কিদের শেষ করে,
জাতি ধর্ম নির্বিশেষে,
এই রব উঠেছে দেশ জুড়ে।

শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে,
এই আতঙ্কিদের মরতে হবে,
করতে হবে শ্মশান সম,
তাদের আশ্রয়ের সেই স্তান।

নিশ্চিহ্ন হবে মানচিত্রে তারা,
৬৫, ৭১, ৯৯ ভুলে গেছে যারা।
আরও একবার রাক্ষস বধে,
ভারত অবতীর্ণ হবে।

রাক্ষস কুল ধ্বংস হবে,
আতঙ্ক সব নির্মূল হবে,
ফিরবে শান্তি চারিদিকে ফের,
ভূস্বর্গ আবারও সুন্দর হবে।








Friday, April 18, 2025

পিশাচিনী

সকাল সকাল রাজশেখর কে দেখে বেশ অবাকই হলো অবিনাশ।
আসলে রাজশেখর আর অবিনাশ ছোটবেলার বন্ধু যদিও বহু বছর যোগাযোগ ছিলনা তাদের। আসলে অবিনাশের গ্রামের জমিদারের ছেলে রাজশেখর আর অবিনাশের বাবা ছিলেন জমিদার বাড়ির কুলো পুরোহিত। কুলো পুরোহিতের ছেলে হিসাবে অবিনাশের ছোট থেকেই জমিদার বাড়িতে ছিল অবাধ আনাগোনা আর তার সুবাদেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল রাজশেখর আর অবিনাশের। তবে সময়ের সাথে সাথে বন্ধুত্ব গভীর হলেও একসময় রাজশেখর পড়াশুনার জন্য বিদেশে পাড়ি দেয় যদিও অবিনাশ কিন্তু নিজের বাবার পেশাকেই বেঁচে নেয় কিন্তু তার সাথে ধীরে ধীরে তার আগ্রহ বেড়ে ওঠে তন্দ্র সাধনার দিকে এবং তার বাবার মৃত্যুর পর সে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে যায় তন্ত্রের সাধনার জন্য।

তাই আজ বহু বছর পর নিজের ছোটবেলার বন্ধুকে দেখে বেশ অবাকই হলো অবিনাশ।

অবিনাশ : কি রে তুই ? মানে এখানে কি করে ? ঠিকানা কোথায় পেলি ?
রাজশেখর : এত বড় তন্ত্র সাধকের কি আর ঠিকানা খুঁজে পেতে সময় লাগে.....?
অবিনাশ : আরে যা কি যে বলিস....ভেতরে আয়।
এই বলে দুজনে ঘরের ভেতর ঢুকলো।

অবিনাশ : যাক এসেছিস ভালই হলো, দুই বন্ধু মিলে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে। দাড়া দুপুরের খাবারটা বলেদি, এই নিধিরাম....

রাজশেখর : এই না না ব্যস্ত হোসনা, আমি একটা খুব বিপদে পড়েছি ভাই।

অবিনাশ : বিপদ ! কেনো রে ? কি হলো আবার ? সব ঠিক আছে তো ?

রাজশেখর : না ভাই কিছুই ঠিক নেই....
গত ছয় মাস ধরে, গ্রামে মড়ক লেগেছেরে, প্রায় তিরিশ জন মারা গেছে, না জানি আর কত জন বলি হবে এর।

অবিনাশ : সেকি ? কোনো রোগ নাকি ? কোনো ডাক্তার বদ্দি কিছু করতে পারছে না ?

রাজশেখর : ডাক্তার বদ্দির কাজ নয়রে, আর সেই জন্যই তোর কাছে আসা। বড় আশা করে এসেছি, তুই ই পারবি এর কিছু একটা ব্যবস্থা করতে।

অবিনাশ : আমি !......ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলতো....

রাজশেখর : আজ থেকে ছয় মাস আগে এক রাতে হঠাৎ করে এক ভয়াবহ ঝড় ওঠে। গরম কালে এরম কাল বৈশাখী ওঠাটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু পরদিন সকালে গ্রামের পশ্চিমে ওই যে আমবাগানটা ছিল সেখানে গ্রামের একজনের লাশ পাওয়া গেলো। লাশের মুখ পুরো বিস্মিত, চোখ গুলো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, ঠিক যেন কিছু দেখে খুব ভয় পেয়েছে। আর লাশের পুরো শরীরটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে যেন শরীর থেকে সব রক্ত কেউ বার করে নিয়েছে। গ্রামের দারোগা বাবু এসে লাশ নিয়ে গেল কিন্তু খুনের কোনো কুল কিনারা করতে পারলো না।
এই বলে একটু থামলো রাজ শেখর।

অবিনাশ : তারপর ???

দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো নিধিরাম।

নিধিরাম : ডাকছিলেন বাবু ?

অবিনাশ : গ্রাম থেকে আমার ছোটবেলার বন্ধু এসেছে। চট করে একটু জল খাবার করে নিয়ে এসো।

রাজশেখর : না না ব্যস্ত হবার দরকার নেই। আমি কিছু খাবো না। তবে একটু জল হলে ভালো হয়।

অবিনাশ : এই না না এটা হয় নাকি...।

রাজশেখর : না ভাই, বিশ্বাস কর এসবের দরকার নেই, আমি যেটা তোকে বলতে এসছি সেটা বলা বেশি দরকার।
নিধিরাম তুমি শুধু একটু জল নিয়ে এসো।

রাজশেখরের কথামত এক গ্লাস জল এনে টেবিলের উপর রাখলো নিধিরাম।

নিমিষের মধ্যে গ্লাস ফাঁকা করে টেবিলের উপর রাখলো রাজশেখর।
অবিনাশ লক্ষ্য করলো রাজশেখর যেন কিছুতে খুব ভয় পেয়ে আছে, তার কাহিনীর বর্ণনা দিতে গিয়ে যেন তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

অবিনাশ : আর একটু জল দিতে বলবো?

অবিনাশের কথায় যেন হুশ ফিরল রাজশেখরের।

রাজশেখর : না না....

অবিনাশ : তারপর কি হলো ???

রাজশেখর : তারপর........, তারপর আবার বেশ কিছুদিন স্বাভাবিক ভাবেই কাটল কিন্তু আবার একই ভাবে আর একদিন রাতে এরম ঝড় উঠলো এবং একই ভাবে পরদিন সকালে আরো এক গ্রামবাসীর লাশ পাওয়া গেলো। এভাবে কিছুদিন পর আবারও ঠিক একই ঘটনা ঘটলো। এবার সবাই হিসাব করে দেখলো প্রতিটা খুনের মাঝে ঠিক এক সপ্তাহের ব্যবধান থাকে, এদিকে দারোগা বাবুও এই সব খুনের হদিস করে পারছে না। আর এরম একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষের শরীর থেকে রক্ত বের করে তাকে মেরে ফেলাটা খুব স্বাভাবিক ঘটনাতো নয়। গ্রামবাসীর এবার ভয়ে দিন গুনতে লাগলো না জানি এবার কার পালা। আবার এক সপ্তাহের শেষে সেই ঝড় এবং পরদিন ফের একটি লাশ মিলল একই অবস্থায়। গ্রামের লোকেরা জমিদার বাড়িতে এসে বিচার চাইলো। আমি নিজে একটা লেঠেল দল তৈরি করে ঠিক করলাম এই বার ঝড় উঠলে আমি নিজে যাব লেঠেলদের নিয়ে। অবশেষে একসপ্তাহ পর আবার সেই রাত এলো, আমি আগে থেকেই কিছু লেঠেলদের গ্রামের আনাচে কানাচে মোতায়েন করে রেখেছিলাম। রাত হতেই আমি নিজে লেঠেলদের নিয়ে টহল দিতে শুরু করলাম। একটু রাত বাড়তেই সেই ঝড় উঠলো কিন্তু আশ্চর্য ভাবে ঝড় উঠতেই কিভাবে যেন আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ একটা শোরগোলে ঘুম থেকে উঠে দেখি ভোর হয়ে গেছে, এক গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাস করায় সে বলল " হুজুর লাশ মিলেছে আবার....না জানি কার কপাল পুড়লো এবার....." এভাবে আরো বেশ কিছু সপ্তাহ কাটলো কিন্তু কোনো কিছুই বদলালো না, ধীরে ধীরে গ্রামবাসীরা ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাতে লাগলো। এরপর একদিন আমাদের ছোটবেলার অ্যালবামটা দেখতে দেখতে তোর কথা খুব মনে হলো, খোঁজ নিয়ে জানলাম তুই বড় তান্ত্রিক হয়েছিস, অনেক নাম ডাক তোর, তাই অসহায় হয়ে তোর কাছে এলাম। আমার চারিদিক অন্ধকার, এখন তুইই ভরসা কারণ আমার বিশ্বাস এই খুন গুলো কোনো সাধারণ খুন নয়। এর পিছনে লুকিয়ে আছে কোনো বড় অশুভ শক্তি।

অবিনাশ : হম, বুঝলাম....আমারও মনে হয় তোর অনুমান সঠিক। তবে একবার গ্রামে গিয়ে সবটা না দেখে এখনই সবটা বলা সম্ভব না।

রাজশেখর : বেশ তো..... চলনা....সেই ছোটবেলার স্মৃতি গুল আবার জেগে উঠবে। আর জানিস তো খুব একা হয়ে গেছিরে, তুই সাথে থাকলে একটু ভরসাও পাবো।

অবিনাশ : আচ্ছা দাড়া আমি কয়েকটা দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিয়ে তোর সাথেই যাব, হ্যা তবে দুপুরে খেয়ে যেতে হবে কিন্তু।
এই নিধিরাম.....

নিধিরাম : হ্যা বাবু ডাকলেন....

অবিনাশ : হ্যা, শোনো আজ দুপুরে আমরা দুজনে খাবো, বেশ কষিয়ে সুন্দর করে রান্না করে দেখি।

মুচকি হেসে অবিনাশের কথায় সম্মতি জানালো রাজশেখর।

নিধিরাম : আচ্ছা বাবু।

এই বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো নিধিরাম।


যেমনি কথা তেমনি কাজ, অগত্যা দুই বন্ধু মিলে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে পড়ল তাদের গ্রামের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে যেতে যেতে অবিনাশের তাদের ছোট বেলার কথা খুব মনে পড়ছিল। কিভাবে তারা দুজনে ক্ষেতের মাঝে সারাদিন খেলে বেড়াতো, নদীর জলে সাঁতার কাটা, বাগান থেকে ফল চুরি কোনো কিছুই তারা বাদ দেয়নি। ভাবলে মনে হয় এই তো কিছু দিন আগেরই কথা, কিন্তু দেখতে দেখতে বহু বছর পেরিয়ে গেছে। শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে আজ সবই অতীত। সত্যি কত ভালো ছিল সেই দিন গুলো। সত্যি যদি কোনো জাদুবলে আবার ফেরত যাওয়া যেতো সেই দিন গুলোতে। আবার গাছে দোল খাওয়া যেত সেই গ্রীষ্মের দুপুর গুলোতে বা আবার ছুটে বেড়ানো যেতো শীতের ভোরের শিশির কণা গুলোর উপর.......

অবশেষে জমিদার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো। অবিনাশ গাড়ি থেকে নেমে বেশ খানিক ক্ষণ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো, এই বাড়িতেই তার ছোটবেলা কেটেছে। কত কোলাহল, শোরগোলের মাঝে। জমিদার কাকু থাকার সময়তো প্রতিদিন উৎসব হতো এই বাড়িতে, সকাল থেকে রান্না, হৈ হুল্লোড়.....সে যেন এক আলাদাই আনন্দের পরিবেশ ছিল। অবিনাশের এখন মনে আছে, সকালে গ্রামের স্কুল থেকে ফিরেই সে সোজা চলে আসতো এই জমিদার বাড়িতে, মা ঠাকুরাণীর হাতের লুচি আর আলুরদম তাদের দুই বন্ধু মিলে একসাথে খাওয়া, যেন এক আলাদাই শান্তি ছিল, কিন্তু আজ সব নিস্তব্ধ, যেন কোনো এক অশুভ কালো অন্ধকারে ডুবে আছে পুরো বাড়িটা।

রাজশেখর : কিরে ভেতরে আয়...

রাজশেখর এর কথায় হুশ ফিরল অবিনাশের।

অবিনাশ ঘরে প্রবেশ করতেই একজন পরমা সুন্দরী তরুণী তাকে এসে প্রণাম জানালো।

অবিনাশ একটু আশ্চর্য হওয়াতে রাজশেখর বলল : তোকে বলা হয়নি রে, ও লিলি, আমার স্ত্রী। বেশ কিছু মাস আগেই আমাদের বিয়ে হয়। লিলির মা বাবা কেউ নেই। যাই হোক পড়ে বলব তোকে সব আপাতত এতটা রাস্তা এসেছিস এখন একটু বিশ্রাম কর বিকালে কথা হবে।

বিকাল হতে রাজশেখর এসে অবিনাশকে বলল : চল একটু বেরিয়ে আসবি নাকি ? আর তোকে ওই আমবাগানের জায়গাটাতেও নিয়ে যাচ্ছি চল যেখানে মৃত দেহ গুলো পাওয়া গেছে।

অবিনাশ : হম চল।
এই বলে দুই বন্ধু মিলে গ্রামে বেরোলো। রাস্তায় যেতে যেতে অবিনাশ লিলির ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলো।

অবিনাশ : এই তুই বিয়ে করেছিস এটাতো বলিসনি। কিভাবে আলাপ ? বৌঠান দেখতে তো অপূর্ব সুন্দরী।

রাজশেখর : আর বলিসনা ভাই, লিলির পরিবারে কেউ নেই। আসলে একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের ওই দক্ষিণ দিকের জঙ্গলটা মনে আছে তার মাঝের ওই মন্দিরটাতে গিয়ে বসেছিলাম। আসলে মনটা ভালো লাগছিলনা। আর ওই জায়গাটা বেশ নির্জন হওয়াতে মাঝে মধ্যেই আমি ওখানে বসে থাকতাম। সেদিন একটু বেশি সময় বসে ছিলাম মনটা ভালো লাগছিলনা তাই, কিন্তু হঠাৎ একটা মহিলা কণ্ঠের আর্তনাদে হুশ এলো আমার।
আমি বেশ একটু আশ্চর্যই হলাম। এত রাতে এরম নির্জন জায়গাতে মহিলার আর্তনাদ!! আমি সেই আর্তনাদ অনুসরণ করে এগোলাম। বেশ কিছুটা যেতেই দেখি একজন তান্ত্রিক একজন মাঝ বয়সী মেয়েকে হাত পা বেঁধে ফেলে রেখেছে এবং তাকে বলি দেবার জন্য তৈরি হচ্ছে। আমি তখন পকেট থেকে রিভলবার বার করে এগিয়ে গেলাম তান্ত্রিকের দিকে। শূন্যে একটা ফায়ার করতেই তান্ত্রিক ভয়ে ছুটে পালালো। যাবার সময় বিড়বিড় করে গালাগাল করতে লাগলো আমায়

তান্ত্রিক : ভুল করছিস তুই....ধ্বংস হয়ে যাবে সব...ভুল করছিস...

রাজশেখর : তান্ত্রিক চলে গেলে সেখান থেকেই আমি লিলিকে উদ্ধার করি। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেছিলাম। পরে জানতে পারলাম লিলির কেউ নেই। তান্ত্রিক নাকি তার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে। আজ নাকি ওকেও বলি দিয়ে দিত কিন্তু আমি এসে যাওয়াতে ও রক্ষা পায়।

খুব মায়া হয়েছিল সেদিন লিলিকে দেখে, এরম অসহায় একটা মেয়ে, কোথায় যাবে, আবার হয়তো এরম কোনো বিপদে গিয়ে পড়বে। তাই ঠিক করলাম ওকে বিয়ে করবো। লিলিকে প্রস্তাব দিতেই সে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যায়।

কিন্তু বিয়ের পর লিলি আমায় খুশি রাখলেও আমি কিন্তু ওকে সুখী করতে পারিনি। এই ক্রমাগত একের পর এক খুন হয়ে যাওয়াতে আমি মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত।

এই বলে একটা গাছের বেদির নিচে বসে পড়ল রাজশেখর।

অভিনাশ : চিন্তা করিসনা। আমি আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। 
আচ্ছা শেষ খুনটা ঠিক কতদিন আগে হয়েছিল ?
রাজশেখর : এই তো গত বুধবার রাতে। 
অবিনাশ : আচ্ছা তাহলে হিসাব মতন পরের খুনটা হবে সামনের বুধবার। আজ সোমবার তার মনে কাল বাদে পরশুই কিছু একটা হতে চলেছে।
ঠিক আছে আজ বাড়ি ফেরত চল।
বাকি আমি দেখছি। কিছু চিন্তা করিস না।

রাতে খাবার টেবিলে খেতে বসে অবিনাশের আবার দেখা হলো লিলির সাথে।

অবিনাশ : বৌঠান তুমি খাবে না ? এই তুই কেমন নিজে খেতে বসে গেলি আর বৌঠান কে খেতে বসতে বললি না।

রাজশেখরের উদ্দেশ্যে বলল অবিনাশ।

রাজশেখর : আরে লিলি সবার শেষে খায়। বিয়ের পর আজ অবদি ওকে আমি একসাথে খাওয়াতে পারিনি। ওর কথা আমি ওর গুরু জন তাই আমার সামনে খেলে ওর পাপ হবে। তাই আমার খাওয়া হয়ে গেলে ও রান্না ঘরে একা বসে খেয়ে নেবে। বিয়ের পর থেকে একবারও এই নিয়মের পরিবর্তন হয়নি।

অবিনাশ : সে ঠিক আছে তবে আজ অনেকদিন পর আমরা দুই বন্ধু একসাথে খেতে বসেছি, বৌঠান তুমিও যদি আজ আমাদের সাথে খেতে বসতে তাহলে খুব ভালো হতো।

লিলি : না আপনারা খান। আমি পড়ে খাবো। 

রাত্রি বেলা খেয়ে সবাই ঘুমাতে চলে গেলো। তবে অবিনাশের কিন্তু ঘুম এলো না। এই গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো নিয়ে অবিনাশ ভাবতে লাগলো।
অবিনাশ মনে মনে ভাবতে লাগলো : প্রতি এক সপ্তাহ পর পর এরম খুন কি করে হচ্ছে ??? এই খুনের সাথে এই ঝড়ের কি সম্পর্ক ? রাজশেখর যেই তান্ত্রিকের থেকে বৌঠানকে মুক্ত করে এগুলো সেই তান্ত্রিকের কোনো কাজ না তো ?

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল অবিনাশ।
সকালে লিলির ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো অবিনাশের।

লিলি : চা তৈরি আছে। আপনার বন্ধু অপেক্ষা করছে বাইরে।
এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো লিলি।
অবিনাশ : সকালে আরো যেন বেশি অপুর্ব লাগছিল লিলিকে। কেমন যেন মন মুগ্ধের মত তাকিয়ে রইল সে।

রাজশেখর : কি রে উঠতে দেরি হল ? কাল ঘুম হয়েছিল ?
বাইরের বারান্দায় অবিনাশকে দেখে বলল রাজশেখর।

অবিনাশ : না না সেরকম কিছু না।
দুটো কাপ কেন? বৌঠান খাবে না ?

লিলি : না আপনারা খান। আমি পড়ে খাবো।

রাজশেখর : তোকে বললাম না, ও আমার সাথে খাবে না। আমাদের খাওয়া হলে তবেই ও খাবে।

এই বলে চায়ে চুমুক দিল রাজশেখর।

রাজশেখর : আচ্ছা, তুই কিছু ভাবলি ?

অবিনাশ : দেখ প্রতি এক সপ্তাহ গুণে গুণে খুন হচ্ছে তার মানে এটা কোনো পশুর কাজ না। আর একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষের শরীর থেকে সমস্ত রক্ত বার করে নিচ্ছে তার মনে এটা কোনো মানুষের পক্ষেও করা খুব কষ্টকর। তাই এটা কোনো অশুভ শক্তির কাজ সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
আচ্ছা তুই বৌঠান কে তান্ত্রিকের হাত থেকে মুক্ত করে বাড়ি নিয়ে আসার ঠিক কতদিন পর থেকে এই খুন গুলো হচ্ছে বলতো ?

এবার রাজশেখর একটু ভেবে বলল : ওই ধর তিন চারদিন পর থেকেই। দাড়া দাড়া এটাতো ভেবে দেখিনি। তাহলে তুই কি বলছিস ওই তান্ত্রিকের কারসাজি এই গুলো ? হম হম ঠিক ওই তান্ত্রিকই করছে তার মানে এই সব। দাড়া এখুনি লেঠেলদের বলছি যেখান থেকে হোক ওই তান্ত্রিককে তুলে আনতে আজকেই ওর বিচার করবো। এত গুলো লোকের প্রাণনাশ করেছে। ওকে আমি নিজের হাতে শেষ করবো।

অবিনাশ : দাড়া দাড়া তাড়াহুড়ো করিসনা। আমি দেখছি কি করা যায়। তুই শান্ত হও। তুই থাক আমি একটু গ্রামটা ঘুরে দেখে আসি দাড়া। 

এই বলে বেড়িয়ে গেল অবিনাশ।

কিন্তু সূর্য অস্ত যাবার পরও অবিনাশ না ফেরায় বেশ চিন্তায় পড়ে গেল রাজশেখর।

রাজশেখর : সন্ধ্যে হয়ে গেলো কই অবিনাশতো এখনো ফিরল না। 

লিলি : আপনার বন্ধু বিপদ দেখে পালিয়েছে। খুব বড় তান্ত্রিক কিনা, বিপদ বুঝে পালিয়েছে।

রাজশেখর : না অবিনাশ ওরকম নয়। নিশ্চই ওর কোনো বিপদ হয়েছে। ও আমায় ছেড়ে পালাবার লোক নয়।

লিলি : জীবনের মায়া খুব বড় মায়া, তার কাছে বন্ধু পরিবার কোনো কিছুরই দাম নেই।

এই বলে নিজের ঘরে চলে গেল লিলি।

দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেলো কিন্তু অবিনাশ ফিরল না।

রাজশেখরের ধীরে ধীরে লিলির কথা গুলোই সত্যি মনে হতে লাগলো, হয়তো সত্যি তার বন্ধু তার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে পালিয়েছে। 
আর সত্যিই তো এত বছর যোগাযোগ নেই, হঠাৎ করে ছোটবেলার বন্ধুর কথায় নিজের প্রাণের ঝুঁকি কেউ নেয় নাকি...!!! আসলে সেই বোকা যে অনেক বেশি আশা করে বসেছিল ছোট বেলার বন্ধুর থেকে.......কিন্তু অবিনাশ বিচক্ষণ মানুষ তাই বিপদ বুঝে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছে, সরাসরি হয়তো বলতে পারেনি তাই এভাবে চলে গেছে।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল রাজশেখর। সকালে পাখির কোলাহলে ঘুম ভাঙ্গলো রাজশেখরের।

তাড়াতাড়ি বাইরে এসে রাজশেখর দাড়োয়ান কে জিজ্ঞাস করলো : অবিনাশ বাবু ফিরেছেন ?

দাড়োয়ান : কই বাবু নাতো......

দাড়োয়ানের কথায় বেশ নিরাশই হলো রাজশেখর।

সে যেন কিছুতেই তার বন্ধুর এই চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিল না। তার বার বার মনে হচ্ছিল এই বুঝি অবিনাশ ফিরে আসবে। কিন্তু বৃথা আশা। সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে এলো কিন্তু অবিনাশ ফিরল না।
মনটা দুঃখে আর যেন বেশি কাতর হয়ে গেলো রাজশেখরের। এই বিপদের দিনে যাকে সে নিজের শেষ ভরসা ভেবেছিল সেও তাকে ছেড়ে চলে গেল।
আসলে লিলি ঠিকই বলেছে, প্রাণের মায়া বড় মায়া। তাই হয়তো অবিনাশও নিজের প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছে। কিন্তু সে কোথায় পালাবে এই গ্রাম ছেড়ে......? না হয়তো এই তার নিয়তি, এই অজানা বিভীষিকার হাতে হয়তো তার প্রানটাও যাবে। 

কিন্তু বিনা চেষ্টায় সে হাল ছাড়বে না। অবিনাশ চলে গেছে তো কি হয়েছে.....তবে সে যাবার আগে তান্ত্রিকের কথাটা কিন্তু ঠিকই বলে গেছে। সত্যি তো সেই তান্ত্রিক তাকে হুমকি দিয়েছিল সব ধ্বংস করে দেবার। হয়তো তার ই কোনো তন্ত্র বলে তাদের গ্রামে এই অজানা বিভীষিকার আবির্ভাব। এসব ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে চলল, সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাস আসতে আসতে রাতের সেই চেনা ঝড় হয়ে উঠলো ।

রাজশেখর ব্যাকুল ভাবে ভগবানকে ডাকতে শুরু করলো,
রাজশেখর : হে ভগবান, আমাদের রক্ষা করো। এই বিপদের থেকে আমাদের রক্ষা করো।

অবিনাশ : উপায় এনেছি কিন্তু সাহস রাখতে হবে কিন্তু.....।

রাজশেখর পেছন ঘুরে দেখতেই দেখে দাড়িয়ে অবিনাশ। তবে আজ সে তার তন্ত্র সাধকের বেশে। গায়ে লাল বস্ত্র। হাতে ত্রিশুল, কপালে মায়ের তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।

রাজশেখর : তুই এসেছিস......
এই বলে অবিনাশকে জড়িয়ে ধরলো রাজশেখর।
রাজশেখর : কোথায় চলে গেছিলিস ? কোনো খোঁজ নেয়। কাল সারারাত আজ সারাদিন কেটে গেলো।

অবিনাশ : থাক ওসব বলব তোকে পড়ে। এখন যা বলব কোনো প্রশ্ন ছাড়া শুনবি। সময় খুব কম আমাদের হাতে। 
বৌঠান কোথায়?

রাজশেখর : ওই তো শোওয়ার ঘরে ঘুমাচ্ছে, সন্ধ্যে থেকে ওর শরীরটা ভালো নেই।

অবিনাশ : তুই এই তাবিজটা নিজের গলায় পড়েনে আর এইনে এই ত্রিশুলটা তোদের শোওয়ার ঘরের দরজার সামনে দাড় করিয়ে রেখে দে।

রাজশেখর কোনো প্রশ্ন না করে ত্রিশুলটা নিয়ে রেখে এলো তাদের শোওয়ার ঘরের দরজার সামনে।

অবিনাশ : আমার সাথে আয়। 

এই বলে রাজশেখর কে সাথে নিয়ে মন্ত্র বলে বলে বাড়ির চারিধারে একটা গণ্ডি কাটলো অবিনাশ।

ধীরে ধীরে ঝড় বেড়ে উঠলো।

রাজশেখর : আজ যেন ঝড়টা অন্য দিনের চেয়ে বেশি জোরে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আজ পৃথিবী ধ্বংস না করে এই ঝড় থামবে না।

অবিনাশ : চিন্তা করিস না। তুই আমার সাথে থাক আর ঈশ্বরের নাম জব। উনিই রক্ষা করবেন।

ধীরে ধীরে ঝড় থেমে গেলো। 

রাজশেখর : বিপদ কি কেটে গেলো ?
অবিনাশ : কেটে এখনো যায়নি তবে জব্দ হয়েছে কিছুটা।
এখন আয় আমার সাথে।

এই বলে রাজশেখর কে হাত ধরে টানতে টানতে তার শোওয়ার ঘরের সামনে নিয়ে গেলো।

ধীরে ধীরে ত্রিশুলটা সরিয়ে দরজা খুলতে বলল অবিনাশ।

কিন্তু একি ভেতরে বসে আছে এক কদাকার পিশাচীনি।

এই দৃশ্য দেখে রক্ত হিম হয়ে গেলো রাজশেখরের।
রাজশেখর : এ কে ? লিলি কোথায় ? কে এই পিশাচীনি ?
অবিনাশ সাথে সাথে রাজশেখরের হাত ধরে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই উঠে দাড়ালো সেই কদাকার পিশাচীনি ।

রাজশেখর : লিলি কোথায় ? কি করেছিস তুই লিলির সাথে.....নরকের কীট....তোকে আমি ছাড়বো না।

পিশাচীনি : আগে তোদের কে আমার হাত থেকে কে বাঁচায় দেখ....তোদের দুজনের রক্ত খাবো আজ।

এই বলে একটা বিকট হাসি হেসে রাজশেখরের দিকে ঝাপাল সেই পিশাচীনি।

অবস্থা বেগতিক দেখে নিজের ব্যাগ থেকে একটা কি বার করে পিশাচীনির দিকে ছুঁড়ে দিলো অবিনাশ।
অমনি সেই পিশাচীনি বাবাগো মাগো বলে দূরে সরে গেলো। 
অবিনাশ : আজ তোর খেলা শেষ নরকের কীট।

এই বলে ব্যাগ থেকে একটা ছুরি বার করে সেই পিশাচীনির দিকে ছুটে গিয়ে তার বুকে সেই ছুরি বসিয়ে দিতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে আর ধীরে ধীরে ছাই হয়ে মিলিয়ে গেলো সেই কদাকার দেহটা।

অবিনাশ : আজ থেকে এই গ্রাম মুক্ত। আর কাউকে এই পিশাচীনির হাতে বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে না।

রাজশেখরের উদ্দেশ্যে বলল অবিনাশ।

রাজশেখর : কিন্তু লিলি কোথায় অবিনাশ ? আর তুই বুঝলি কি করে এটা কোনো পিশাচীনির কাজ ? 

অবিনাশ : সব বলছি দাড়া। আসলে সেদিন রাতে আমার জানলার নিচে কিছু বিড়ালের কান্নার আওয়াজ পাই। তবে আওয়াজটা কেমন যেনো আর্তনাদের মতন ছিল। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির পেছনটাতে যেতেই দেখি বিড়ালের সদ্য খাওয়া কয়েকটা কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। তখন হাড়ে কিছু মাংস লেগে রয়েছে। এই দেখে আমার একটা খটকা লাগে। আমি তখন তোর থেকে তোদের বিয়ের আর এই খুনের সময়টা জানি এবং সেই তান্ত্রিকের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাই। মন্ত্রবলে সেই তান্ত্রিক কে খুঁজে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। তবে তান্ত্রিক যা বলল তা খুবই ভয়াবহ। আসলে সেদিন তুই যে লিলি কে উদ্ধার করে ছিলিস সে কোনো সাধারণ মহিলা নয়। "লিলি" আসল নাম "লিলিথ" অন্ধকারের রানি, রাক্ষসী রানি "লিলিথ".....

শুনে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো রাজশেখরের।

অবিনাশ আরো বলে চলল : আসলে এরা এক ধরনের নারকীয় জীব। এদের নিজেদের যৌবন ধরে রাখতে এবং নিজেদের শক্তিশালী করে রাখতে মানুষের রক্ত প্রয়োজন হয়। একদিন মানুষের রক্ত পান করলে এরা সাত দিন অবদি নিজের রূপ এবং শক্তি ধরে রাখতে পারে তাই খুন গুলো প্রতি সাত দিন বাদে বাদে হতো এবং এরা মানুষের খাদ্য খেতে সক্ষম নয় তাই তোর লিলি কখনও তোর সাথে খেতে না, কারণ তার খাবার ছিল বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো বেড়াল, কুকুর, পাখি এসব। এই রাক্ষসী পিশাচীনিদের তাদের যৌবন রূপে যদি বলি দেওয়া যায় তাহলে তা তন্ত্র সাধনার পক্ষে খুবই উপযোগী। এর দ্বারা অমরত্ব লাভ করাও সম্ভব। আর সেদিন সেই তান্ত্রিক সেই প্রচেষ্টাই করছিল।
তুই যখন আমায় বললি যে লিলির পুরো পরিবার কে এই তান্ত্রিক শেষ করে দিয়েছে তখন আমি আন্দাজ করেছিলাম এই লিলি কে মারার উপায়ও ওই তান্ত্রিকের কাছেই আছে।
সেই তান্ত্রিকের থেকে জানতে পারিযে এই পিশাচীনিদের মারার একমাত্র উপায় হলো রুপোর ছুরি যদি পূর্ণিমার রাতে কোনো সদ্য মৃত কোনো মৃতদেহের রক্ত দিয়ে পরিশুদ্ধ করা হয় তবেই সেই ছুরি দিয়েই এদের মারা সম্ভব। তান্ত্রিকের কাছ থেকেই সেইরকম ছুরি পেলাম আর তারপর এখানে এসে আগে মা কালীর ত্রিশুল মন্ত্র পড়ে তোকে দিয়েছিলাম তোদের শোয়ার ঘরের দরজার বাইরে রাখতে, যাতে সেই পিশাচীনি বেরোতে না পারে আর বাকি বাড়ির চারপাশে গাত্রবন্ধন করেদি যাতে সেই অশুভ শক্তি কোনো ভাবে আর কারুর ক্ষতি না করতে পারে ।

রাজশেখর : আচ্ছা একটা কথা বল, তুই বললি তুই বিড়ালের কান্না শুনেছিলিস এবং সেখান থেকেই তোর সন্দেহ হয়। কিন্তু আমি এতদিন ধরে কিছু শুনতে পেলাম না কেনো ?

অবিনাশ : সেদিন যখন তুই লেঠেলদের নিয়ে রাত্রি বেলা বেড়িয়েছিলিস তখন ঝড় ওঠার পর তোরা ঘুমিয়ে গেছিলিশ। কারণ ওই পিশাচীনি নিজের মন্ত্র বলে তোকে এবং এই জমিদার বাড়ির সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দিত যাতে রাতে তার কার্যকলাপ তোরা কেউ টের না পাস। কিন্তু আজ তোকে এই তাবিজটা পরানোতে সেই পিশাচিনীর মন্ত্র আর কাজ করেনি। তাই তুই ঘুমাসনি আজ।

রাজশেখর : কি বলে যে তোকে ধন্যবাদ দেব। আমাকে আর পুরো গ্রামকে তুই রক্ষা করলি ভাই।

অবিনাশ : মুচকি হেসে, একটা কচি পাঠা খাওয়ালে মন্দ হবে না।

দুই বন্ধু হেসে উঠলো..........


Sunday, February 23, 2025

বাঁশ বাগানের ভূত

রতন ( একটি গ্রামের ছেলে ) : কিরে খেলতে যাবি না ? বাকিরা কোথায় ?

নিতাই ( গ্রামের আরেকটি ছেলে ) : না ধূর, আর কেউ খেলতে যাবে না। ক্ষেতের ধারে খেলতে গিয়ে রোজ বকা খেতে হয়। এমন রোজ রোজ বকা খেতে কার ভালো লাগে বলতো..?? 
( বেশ আক্ষেপের সুরেই বলল সে )

আসলে রতন আর নিতাই হলো গ্রামের ছেলেদের খেলার দলের নেতা কিন্তু রোজ রোজ খেলতে গিয়ে বকা খেতে খেতে সবাই বিরক্ত। আসলে রূপনারায়ণ নদীর ধারে তাদের এই ছোট্ট গ্রাম। গ্রামটি খুব মনোরম হলেই অসুবিধা শুধু একটাই যে গ্রামে ছেলেদের খেলার কোনো মাঠ নেই তাই অগত্যা তারা ক্ষেতের মধ্যেই নিজেদের খেলার জায়গা করে নেয় কিন্তু তার জন্য প্রতিদিনই তাদের সবাই কে বকা শুনতে হয়। তাই এখন খেলার জায়গা পাওয়াটাই তাদের কাছে খুব চিন্তার ব্যাপার হয়ে গেছে।

রতন : এই বলছি শোন না সবাই কে ডাকি চল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তাতে আমাদের প্রতিদিন খেলার ব্যবস্থাও হয়ে যাবে আর কেউ বকবেও না।

নিতাই : ঠিক আছে চল ডাকি সবাই কে।

এই বলে দুজন মিলে সবাই কে ডাকতে বেরোলো।
ধীরে গ্রামের সব ছেলেদের বাড়ি থেকে ডেকে একজায়গায় জড়ো করলো রতন এবং নিতাই মিলে।
এবার রতন সবার উদ্দেশ্যে বলল : ভাই দেখ আমরা সবাই রোজ রোজ ক্ষেতের মধ্যে খেলতে গিয়ে বকা খাই তার চেয়ে বরং আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকে যেই বাঁশ বাগানটা আছে সেটার ভেতরে একটা জায়গা যদি আমরা সবাই পরিষ্কার করেনি তাহলে আর কোনো অসুবিধাও হবে না আর কেউ জানতেও পারবে না।

ছেলেদের দলের একজন : কিন্তু ওই বাঁশ বাগানটাতে তো কেউ যায় না। সবাই বলে জায়গাটা নাকি ভালো নয়। ওখানে নাকি বাচ্চাদের যেতে নেই।

ছেলেদের দলের আর একজন : হ্যাঁ ঠিক ঠিক, আমার দাদু বেঁচে থাকতে বলতো ওই বাঁশবাগান নাকি খুব ভয়ানক, ওখানে ডাকাত আছে, বাচ্চারা গেলে তুলে নিয়ে যাবে।

রতন : আরে ধুর যত ভুলভাল কথা। দেখ ওদিকটায় কেউ সচরাচর যায়না তাই আমাদের কেউ জ্বালাতেও আসবে না। বিশ্বাস কর কোনো অসুবিধা হবে না। বরং সারাদিন জমিয়ে খেলা যাবে।

রতনের এত জোর দিয়ে সব কথা গুলো বলাতে গ্রামের সব ছেলেরা রতনের কথায় রাজী হয়ে গেলো এবং ওই বাঁশবাগানে একটা জায়গা ঠিক করে সেটাকে পরিষ্কার করার কাজ শুরু করলো।

বেশ কিছুক্ষণ কাজ ভালো ভাবেই চলল।

হঠাৎ নিতাই কোথা থেকে একটা সিদুর মাখা লাল সুতো নিয়ে আসলো।

রতন : এই এটা কি ? কোথায় পেলি এটা ?

নিতাই : কি জানি কি.....ওই গাছটার গায়ে বাঁধা ছিল দেখে আমি খুলে আনলাম।

রতন : ধুর এসব ছেড়ে কাজে হাত লাগা জলদি।

এবার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কেমন যেন একটা পচা গন্ধ সবার নাকে আসতে শুরু হলো। 

নিতাই : ঈশ কি পঁচা গন্ধ আসছে রে, সামনে কিছু মোড়ে পড়ে আছে নিশ্চয়ই।

ছেলেদের একজন : কিন্তু এতক্ষণ তো গন্ধটা ছিল না। হঠাৎ এরম গন্ধ এলো কি করে ????

রতন : ধুর ওসব ছাড়। তাড়াতাড়ি পরিষ্কার করলে আজ বিকালেই খেলতে পারা যাবে। 

রতনের কথায় আবার সবাই জায়গা পরিষ্কার করতে শুরু করলো ।

এবার হঠাৎ নিতাই চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেলো।

রতন : এই.... কি হলো রে ? পড়ে গেলি কি করে ?
নিতাই : এই আমায় পেছন থেকে কে একজন খুব জোড়ে ধাক্কা মারলো রে।

রতন : কে ধাক্কা মারবে..? আমরা সবাই তো রয়েছি কেউ তো তোকে কোনো ধাক্কা মারেনি।

নিতাই : আরে বিশ্বাস কর। সত্যি কেউ ধাক্কা মারলো।

নিতাইয়ের কথা শেষ হতে হতেই দিক বিদিক কাপিয়ে এক ভয়ানক অট্টহাসি শোনা গেলো।

সেই হাসি শুনে সবার রক্ত হিম হয়ে গেলো। সবাই দেখলো সামনে কাল ধোয়ার এক কুণ্ডলী থেকে বেরিয়ে আসছে একটা সাদা ধবধবে কঙ্কাল । সেই কঙ্কালের চোখের কোটর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে আগুন। এই দেখে সবাই ভয়ে দিক বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুট দিলো।

কোনো মতে সবাই সেই বাঁশবাগান থেকে বেরিয়ে গ্রামে ফিরলো।
প্রত্যেকেই তখন ভিত সন্ত্রস্ত। 
রতন বলল : দেখ বাঁশবাগানে আমাদের সাথে যা হলো সেটা কেউ জানলে কিন্তু আমাদের বিপদ আরও বাড়বে তার চেয়ে বরং এসব কথা আর কাউকে বলার দরকার নেই। ওদিকে আর ভুলেও আমরা কখনও যাব না। তাহলে আর কোনো বিপদ হবে না।

সবাই তখন রতনের কথায় রাজি হয়ে যে যার মতন বাড়ি চলে গেলো।

তবে এই ঘটনার কিছুদিন পর থেকেই এই গ্রামে ঘটা শুরু করলো নানান আশ্চর্য ঘটনা। কখনও কারোর বাড়ির দাওয়া থেকে হাঁস মুরগী চুরি হল কখনও বা কারোর সুস্থ দুধেলা গাই রাতারাতি শুকিয়ে মারা গেলো। গ্রামের মানুষ এসব ঘটনায় আশ্চর্য হয়ে পড়ছিল তবে এবার ধীরে ধীরে পশু বাদ দিয়ে আক্রমণ এগিয়ে চলল এই গ্রামের মানুষের দিকে। রাত দুপুরে অনেকেই সেই কঙ্কালের আক্রমণের শিকার হলো। আতঙ্কে মানুষের রাতের দিকে বেরোনো মুসকিল হয়ে উঠলো। একদিন রাত্রি বেলা শহরে কাজ সেরে গ্রামে ফেরার পথে নগেন মিত্তিরের সদ্য বিবাহিত জামাই এই কঙ্কালের হাতে বেঘোরে প্রাণ হারালো। গ্রামে নেমে এলো শোকের ছায়া। তখন গ্রামের সবাই ঠিক করলো যে এই অপদেবতার কোনো একটা বিহিত না করলে এই গ্রামে তাদের পরিবার নিয়ে থাকা দুষ্কর হয়ে যাবে তাই তারা দল বেঁধে গ্রামের মোড়লের কাছে গেলো এবং এর এক বিহিত করার আরজি জানালো। গ্রামের মোড়ল সমস্ত ঘটনা আগে থেকেই শুনেছিল কিন্তু সবাই একজোট হয়ে তার কাছে যাওয়াতে সে তখন সবাইকে নিয়ে এক তান্ত্রিকের কাছে গেল। 
তান্ত্রিক কে সবটা বলাতে তান্ত্রিক বুঝতে পারল এটা কোনো সাধারণ প্রেতাত্মার কাজ না। নিশ্চই কোনো খুব শক্তিশালী পাপী আত্মা এই কাজ করছে।

তান্ত্রিক এবার চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কি সব মন্ত্র পড়তে লাগলো। গ্রামের মানুষ আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগলো যে ধীরে ধীরে তান্ত্রিকের সামনে একটা সাদা ধোয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠলো এবং তার ভেতর থেকে এক কদাকার বিভৎস মূর্তি এসে সামনে দাড়ালো। 
এই দেখে গ্রামের মানুষ সবাই ভয় পেয়ে গেলো। 
তখন তান্ত্রিক বলল : ভয় পাবেন না। এই প্রেতটি আমার কাছে বন্দী । ও আপনাদের কোনো ক্ষতি করবে না। ওকে ডেকেছি আপনাদের গ্রামে যেই প্রেতটি আপনাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে তার ব্যাপারে জানার জন্য।
এবার তান্ত্রিক প্রেতের উদ্দেশ্যে সমস্ত ঘটনা বলল এবং তাকে আদেশ দিলো সেই প্রেতের সমস্ত খোজ নিয়ে আসতে।
এই বলে সেই প্রেতটি আবার আগের মতন সেই সাদা ধোয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

বেশ কিছুক্ষণ পর আবার সেই সাদা ধোঁয়া দেখা দিলো এবং আবার সেই কদাকার বিভৎস মূর্তির আবির্ভাব হলো।
তান্ত্রিক : কি খোজ আনলি বল?

প্রেতাত্মা : আজ থেকে অনেক বছর আগে এই গ্রামে এক ডাকাতের আনাগোনা ছিল। পশু চুরি থেকে মানুষ খুন কোনো কিছুই সে বাদ রাখেনি। এমনকি তার উপদ্রবে মানুষের দিনে দুপুরে বেরোনো বন্ধ হয়ে উঠেছিল। পুরো গ্রাম তার অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে উঠেছিল। গ্রামের লোকেরা তখন একদিন এক ফন্দি করে এবং তাকে সেই ফাঁদে ফেলে তারপর তাকে পিটিয়ে আধমরা করে তাকে ওই বাঁশবাগানে ফেলে রাখলো। যন্ত্রণায় চিতকার করতে থাকলো ডাকাত কিন্তু কেউ এলো নাহ। রাতের বেলা শেয়াল কুকুর মিলে তার শরীর থেকে মাংস খুবলে খুবলে খেলো। যন্ত্রণায় বারবার চিতকার করে উঠলো ডাকাত কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারলো না। ধীরে ধীরে তার প্রাণ দেহ থেকে বেরিয়ে গেলো আর দিনের পরদিন সেই বাঁশবাগানে সেই ডাকাতের মৃত দেহ পড়ে থেকে ধীরে ধীরে পচে গলে গেলো।
গ্রামের মানুষ ডাকাতের মৃত্যুতে খুশিতে মেতে ওঠে। গ্রামে উৎসব শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে সেই ডাকাতের প্রেতাত্মা গ্রামে উপদ্রব শুরু করলো। প্রতিদিনই গ্রামের কেউ না কেউ সেই ডাকাতের প্রেতাত্মার শিকার হতে থাকলো। তখন গ্রামের লোকেরা দলবেধে এক তান্ত্রিকের কাছে সাহায্য চাইতে গেল।

গ্রামের মানুষরা তান্ত্রিক কে সমস্ত ঘটনা বললে।

গ্রামের মানুষ : আমাদের বাঁচান ঠাকুর মশাই। আপনাকে তো আমরা সবটাই বললাম এবার আপনি এর একটা উপায় করুন নয়ত ওই ডাকাতের প্রেতাত্মা আমাদের সবাইকে গ্রাম ছাড়া করে ছাড়বে। 



তখন তান্ত্রিক সব শুনে বলল : দেখ এই প্রেতাত্মা প্রতিহিংসা পরায়ন। সে নিজের মৃত্যুর বদলা নিচ্ছে। এরম প্রেতাত্মা খুব শক্তিশালী হয়। তবে আমি নিজের শক্তি দিয়ে সেই প্রেতাত্মাকে ওই বাঁশবাগানেই বেঁধে দেব যাতে সে আর তোমাদের আক্রমণ না করতে পারে। কিন্তু কোনো ভাবে যদি সে সেই বাঁধন থেকে মুক্তি পায় তখন কিন্তু সে তোমাদের আবার আক্রমণ করে নিজের মৃত্যুর বদলা নেবে।

এই বলে সেই তান্ত্রিক গ্রামের মানুষদের নিয়ে সেই বাঁশবাগানে যায় এবং সেই প্রেতের উপর নিজের মন্ত্র প্রয়োগ করে তাকে সেই বাঁশবাগানের একটা গাছের সাথে বেঁধে তাতে একটি সিঁদুর মাখা লাল সুতো বেঁধে দেন এবং গ্রামের সবাইকে বলেন যে কোনো ভাবেই যেন এই সুতটি কোনো বাচ্চা না খোলে। চোদ্দ বছরের নিচের কোনো বাচ্চাই এই সুতোটা খুলে ওই প্রেত কে মুক্ত করতে পারবে। নয়ত এই প্রেত চিরকালের মতন এই বাঁশবাগানেই আটকে থাকবে।

এই শুনে গ্রামের মানুষরা তান্ত্রিকের জয় জয়কার করতে করতে গ্রামে ফিরে আসে এবং শান্তিতে বসবাস শুরু করে। তারপর বহু বছর কেটে যায় ওই ভয়ানক প্রেতাত্মা ওই বাঁশবাগানেই আটকে থাকে কিন্তু বেশ কিছু দিন আগে এই গ্রামের কিছু বাচ্চা খেলার জন্য ওই বাঁশবাগানে যায় এবং নিজেদের অজান্তেই সেই প্রেতাত্মাকে মুক্ত করে দেয় এবং তার পর থেকেই এই সমস্ত ঘটনা ওই প্রেতাত্মা ঘটাচ্ছে নিজের বদলা পূর্ণ করার জন্য।

সবটা বলে এবার তান্ত্রিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার সেই সাদা ধোয়ার মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেলো প্রেতটি।

গ্রামের সবাই মিলে তখন সেই তান্ত্রিক কে বলল : আমাদের রক্ষা করুন নয়ত আমরা সবাই এই ভয়ানক প্রেতের হাতে মারা পড়বো।
এই বলে সবাই তান্ত্রিকের পায়ে পড়ে অনুরোধ করায় তখন তান্ত্রিক রাজি হয়ে বলল : 
সামনের অমাবস্যার রাতে ওই বাঁশবাগানে এক যজ্ঞের আয়োজন আমি করব এবং নিজের মন্ত্র বলে সেই প্রেতকে এই গ্রাম ছেড়ে যেতে বাধ্য করবো কিন্তু এই কাজে আপনাদের সবাইকেই সেদিন উপস্থিত থাকতে হবে প্রধানত সেই বাচ্চারা যারা সেদিন সেই বাঁশ বাগানে খেলতে গেছিল।

যেমন কথা ঠিক তেমনি কাজ। অমাবস্যার রাতে সেই তান্ত্রিক গ্রামের লোকেদের নিয়ে সেই বাঁশবাগানে হাজির হলো।

হঠাৎ করে এক বীভৎস ঝড় উঠলো। বাঁশ বাগান যেন এলো মেল হয়ে উঠল।
সবাই ভয় পেতে শুরু করেছে দেখে তান্ত্রিক সবার উদ্দেশ্যে বলল : কেউ ভয় পাবেন না। এটা শুধু সেই দুষ্ট প্রেতাত্মার মায়া। ও আপনাদের ভয় দেখিয়ে আমাদের পরিকল্পনা অসফল করতে চায়। 

এই বলে নিজের ঝোলা থেকে কি একটা বার করে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিতেই ঝড় থেমে গেলো। চারিদিক আবার আগের মতন শান্ত হয়ে উঠল। এবার তান্ত্রিক নিজের ঝোলা থেকে একটি ছুরি বার করে একটা মন্ত্র পড়তে পড়তে গ্রামের লোকেদের চারিপাশে একটা গণ্ডি কাটলো। এবার সে এক এক করে যজ্ঞের সরঞ্জাম ঝোলা থেকে বার করে যজ্ঞে বসলো। 

বসার আগে তান্ত্রিক শুধু বলল : এই যজ্ঞ চলা কালীন অনেক রকম মায়া আপনারা দেখবেন, অনেক কিছু শুনবেন কিন্তু কোনো ভাবেই এই যজ্ঞের স্থানের গণ্ডি পেরিয়ে যাবেন না। এই বন্ধন একবার ভেঙে গেলে কিন্তু আমিও আর কিছু করতে পারব না। তাই কোনো মায়াতে ভ্রমিত হয়ে ভয় পাবেন না। মন ব্যাকুল হয়ে উঠল মা তাঁরা কে ডাকুন। সেই রক্ষা করবে।

এই বলে যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে যজ্ঞে বসলো তান্ত্রিক।

তবে বেশ কিছুক্ষণ পর থেকেই নানা রকম ভয়ানক কাণ্ড হতে শুরু করলো। কখনও কোনো বাচ্চার কান্না ভেসে আসলো, কখনও আবার কোনো মহিলার আর্তনাদ। কখনও বা বাঁশবাগান থেকে বেরিয়ে আসলো সারি সারি কঙ্কালের দল, কখনও বা তাদের দিকে ধেয়ে এল কিছু পচা গলা মৃত দেহ। এসব দেখে গ্রামের সমস্ত মানুষ ভয়ে সিটীয়ে গেলো কিন্তু তান্ত্রিকের কথা অনুযায়ী তারা কেউ গণ্ডি থেকে বেরোলো না। বরং তারা সবাই এবার মা তাঁরা কে স্মরণ করা শুরু করলো।

ধীরে ধীরে সমস্ত কিছু অন্ধকারে মিলিয়ে চারিদিক শান্ত হয়ে গেলো।
এবার হঠাৎ চারিদিক কাপিয়ে এক ভয়ানক অট্টহাসি শোনা গেলো। 
এবার চোখ খুললো তান্ত্রিক।

তান্ত্রিক : কে তুই ? আমি জানি তুমি নিজের বদলা পূর্ণ করতে এসেছিস। কিন্তু আমি তোর এই বদ মতলব কোনো দিনও পূর্ণ হতে দেবো না। যদি ভালো চাস তো এখুনি এই গ্রাম ছেড়ে চলে যা।

আবার সেই অট্টহাসি শোনা গেলো।

এবার প্রেত বলল : তুই আটকাবি আমায় ? আমি বহু বছর অপেক্ষা করেছি এই বদলার আশায়। এই গ্রামের কাউকে আমি ছাড়বো না। এই গ্রামকে শ্মশান না বানিয়ে আমি এই গ্রাম ছাড়বো না।

তান্ত্রিক : তবে এই নে....

বলে যজ্ঞের থেকে কিছুটা ছাই তুলে কি একটা বিড়বিড় করে বলে একটা গুমোট অন্ধকারের দিকে ছুঁড়ে দিলো।

অমনি ভেতর থেকে বাবাগো মাগো বলে একটা কঙ্কাল বেরিয়ে এলো।

তান্ত্রিক : কি ছেড়ে যাবি?

প্রেত : না যাবো না........
এই বলে চিতকার করে এক ভয়ানক হাসি হেসে অদৃশ্য হয়ে গেলো কঙ্কালটা।

গ্রামের লোকেরা এসব দেখে আরো ভয় পেয়ে গেলো। 

তান্ত্রিক কিছুটা যজ্ঞের ছাই তুলে মন্ত্র পড়ে ছুড়তে যাচ্ছিল ওমনি কথা থেকে একটা গাছের বিশাল বড় ডাল এসে লাগলো তান্ত্রিকের গায়ে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলো তান্ত্রিক।

আর সেই আর্তনাদ শুনে আবার সেই কঙ্কাল আবির্ভূত হলো আর সাথে আর বেশি করে শোনা গেলো তার সেই ভয়ানক অট্টহাসি।

এবার তান্ত্রিক রেগে গিয়ে বলল : নরকের কীট তোর এত সাহস.....তুই আমার গায়ে হাত তুললি....বীরভূমের শ্মশানে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে পিশাচ সিদ্ধ তান্ত্রিক আমি। 
এই বলে হাতে কিছুটা যজ্ঞের ছাই তুলে কি একটা মন্ত্র বিড়বিড় করে সেই ছাই ছুঁড়ে মারল কঙ্কালের দিকে।

অমনি কঙ্কালের পুরো গায়ে আগুন জ্বলতে শুরু করলো।

কঙ্কাল : ওরে মাগো, বাবাগো, জ্বলে গেলো গো....

বলে চিৎকার করতে লাগলো।

তান্ত্রিক : জ্বল.... আরও জ্বল.... এ নরকের আগুন...
এই বলে হাসতে শুরু করলো তান্ত্রিক।

কঙ্কাল এবার চিতকার করে বলল : আমায় ছেড়ে দে, কথা দিচ্ছি এই গ্রাম ছেড়ে চিরকালের মতন চলে যাবো। আর কোনো দিনও এই গ্রামের কারোর ক্ষতি করব না।

তান্ত্রিক : প্রমাণ দে যে তুই চলে যাচ্ছিস।

কঙ্কাল : আমি চলে গেলো এই সামনের বট গাছের মগ ডালটা ভেঙে পড়ে যাবে।

এই বলে কঙ্কালটি অদৃশ্য হয়ে গেলো এবং কিছু ক্ষণ পড়েই মরমর করে সামনের বট গাছের মগ ডালটা ভেঙে পড়ল।

এভাবেই সেই তান্ত্রিকের সাহায্যে সেই গ্রামটি সেই প্রেতের হাত থেকে চিরকালের মতন মুক্তি পেল।।











Saturday, January 11, 2025

মুক্তি

অনেক্ষন ধরে দুর্গাপুর স্টেশনে ট্রেনটা দাড়িয়ে রয়েছে দেখে বেশ চিন্তা হয়ে গেলো শ্যামলের। ট্রেন থেকে নেমে একবার কি ব্যাপার খোঁজ নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে ট্রেন থেকে নামলো শ্যামল। সামনে এগিয়ে রেলের গার্ড কে জিজ্ঞাস করায় গার্ড বলল : "পানাগড় এর কাছে একটি মালগাড়ি লাইন থেকে পড়ে যাওয়াতে লাইন বন্ধ আছে। আজ রাতে আর ট্রেন চলবে না।"

এই শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো শ্যামল। 

"কাল সকালে যে করেই হোক কলকাতা পৌঁছাতেই হবে। অনেক চেষ্টা করে মিস্টার রায়ের সাথে এই মিটিংটা ব্যবস্থা করেছি। এই ক্লাইন্টটা হাত ছাড়া হলে বস আর আমাকে চাকরিতে রাখবে না। না যে করেই হোক কাল সকালে পৌঁছাতেই হবে কলকাতা। অনেক কষ্টে এই চাকরিটা পেয়েছি, কোনো ভাবেই এটা হারাতে পারবো না।
আর এমনিতেও এটাতো চেনা জায়গাই। জীবনের অনেক বড় অংশটা তো এই দুর্গাপুর চত্বরেই কেটেছ। তিন বছর আগে যখন দিল্লিতে যাই তার আগে অবধি এই দুর্গাপুর অঞ্চলই ছিল সব। তবে সেদিন যদি......
না থাক গিয়ে ওসব কথা...' মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্টেশনের বাইরের দিকে এগোতে শুরু করলো শ্যামল।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে অনেক চেষ্টা করলো শ্যামল যদি একটা গাড়ি পাওয়া যায় তাহলে তাতে করেই সে কলকাতা চলে যেতো। সে টাকা যা লাগতো সে নয় দিত ....
তবে চেষ্টা এক্ষেত্রে বৃথাই হলো তার। অনেক খোজা খুঁজি করেও একটা গাড়ি জোগাড় করতে পারল না শ্যামল।
অবশেষ সে বাধ্য হয়ে ঠিক করল যে হাইওয়ে ধরে হাঁটা শুরু করবে। কোনো গাড়ি বা লড়ি যদি তাকে কলকাতা নিয়ে যায়। আর এমনতো হয়েই থাকে। কত লোকইতো এরম ভাবে বিপদে পড়ে অচেনা গাড়ির থেকে লিফট নেয় তাতে অসুবিধা কি আছে।
অগত্যা মনস্থির করে হাইওয়ে দিয়ে হাঁটা শুরু করলো সে।
তবে হাঁটতে তার বেশ ভালই লাগছিল। রাতের ঠান্ডা পরিবেশটা বেশ মনরমই মনে হচ্ছিল তার। অনেক পুরোনো কথাও তার মনে পড়ছিল আজ। আসলে ছোট বেলায় মা বাবা কে হারায় শ্যামল। তারপর থেকে এই দুর্গাপুরের অলিতে গলিতে মানুষ হয়েছে সে। বাপ মা হারা ছেলে আত্মীয়র বাড়িতে ঠাঁই পেলেও সেই আত্মীয়র চোখের কাটা যে সে হয়ে ওঠে এটা ছোট থেকেই বুঝে গেছিল শ্যামল। বাড়িতে পাওয়া দুর্ব্যবহার গুলোর সাক্ষী যেন এই দুর্গাপুরের রাস্তাঘাট গুলোই। এসবই ভাবছিল শ্যামল হঠাৎ পেছন থেকে একটা গাড়ির আওয়াজ শুনে ধ্যান ফিরলো শ্যামলের।
" ওই তো একটা গাড়ি আসছে মনে হয় " দুর থেকে গাড়ির আলো দেখে মনে মনে বলল শ্যামল।
প্রাণপণে হাত দেখিয়ে গাড়িটিকে আটকানোর চেষ্টা করলো সে।
গাড়িটি দাড়িয়েছে দেখে তাড়াতাড়ি সে তার বিপদের কথা জানালো " দাদা খুব বিপদে পড়েছি। আমি দিল্লী থেকে অফিসের কাজে কলকাতা যাচ্ছিলাম। এই সামনে পানাগরে মাল গাড়ি লাইন থেকে নেমে যাওয়াতে ট্রেন আটকে পড়েছে কিন্তু আমার কাল কলকাতা যাওয়া খুব জরুরি। আপনি যা টাকা বলবেন আমি দিতে রাজি কিন্তু দাদা একটু কলকাতা ছেড়ে দিন আমায়। আপনার কাছে হাত জোড় করছি দাদা "
শ্যামল কথা বলতে বলতে ড্রাইভারটিকে দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু সে চাদর মুড়ি দিয়ে থাকায় কিছুতেই ঠিক করে দেখতে পেলো না শ্যামল।
এবার চাদরের ভেতর দিয়ে ড্রাইভার বলে উঠলো " সে দাদা নিয়ে যাচ্ছি কিন্তু আমার গাড়িতে পেছনের সিটে আগে থেকেই দুজন আছে। আপনাকে বসলে সামনে বসতে হবে।"

শুনে সাথে সাথেই শ্যামল বলে উঠলো " হ্যা হ্যা দাদা সে অসুবিধা নেই। "

এই বলে গাড়িতে উঠে বসলো শ্যামল। সে দেখলো গাড়ির পিছনের সিটে দুজন চাদর ঢাকা দিয়ে হেলান দিয়ে বসে আছে।
গাড়ি রওনা দিলো হাইওয়ে দিয়ে। 
জানলা দিয়ে আসে পাশে দেখতে দেখতে বেশ ভালই লাগছিল শ্যামলের। 
মনে মনে ভাবছিল " এরম কত রাতই না কেটেছে এই অঞ্চলে, আজ ভাবলে মনেহয় সব যেন আগের জন্মের কথা। 
" দাদা কি দিল্লির নাকি " হঠাৎ ড্রাইভারের প্রশ্নে হুস ফিরল শ্যামলের।
" না না আমি বাংলারই লোক। কাজের সুত্রে দিল্লিতে থাকা হয়। " বলল শ্যামল।

"ও আচ্ছা, তবে দাদা আপনি এত রাতে হাইওয়ে দিয়ে একলা এসে ঠিক করেননি। আসলে রাস্তাটা ভালো না জানেন তো। " বলল ড্রাইভার।

"কেনো ? এখানে আবার কি প্রবলেম ?" জিজ্ঞাস করলো শ্যামল।
" প্রবলেম বলতে দাদা চুরি ডাকাতি হয়....খুন খারাবিও হয় অনেক সময়...আপনি একলা আসছিলেন...." বলে একটু চুপ করলো ড্রাইভারটি।
শ্যামল জিজ্ঞাস করলো " তাই ? তো আপনি দেখছেন কখনও চুরি ডাকাতি বা খুন হতে ? "
" না দাদা তবে শুধু চুরি ডাকাতি নয়, অন্য ভয়ও আছে । " বলল ড্রাইভার।
"মানে অন্য কি ভয় ? ভূত ? " একটু হেসে জিজ্ঞাস করলো শ্যামল।
ড্রাইভার বলল " হাসি নয় দাদা, আপনি জানেন না....." 
শ্যামল বলল " তো আপনি জানেন ? আচ্ছা শুনি আপনি কি জানেন ? একটু ভূতের গল্প হলে মন্দ হবে না..."
ড্রাইভার বলল তবে বলি শুনুন " আজ থেকে তিন বছর আগে এরকমই এক রাতে, একজন ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে দেখে সামনে তিনজন হাত দেখাচ্ছে। সে ভাবে হয়তো কোনো বিপদে পরে তাকে হাত দেখাচ্ছে। এই ধরুন আজ আপনার হাত দেখানোতে যেমন আমি দাড়ালাম। সেরকমই সেদিন সেই ড্রাইভার দাঁড়ায়। তিনটে লোক এগিয়ে আসে তবে কিছু বলার আগেই একজন জানলার কাছে এসে পকেট থেকে একটি রিভলবার বার করে  ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে নেমে যেতে বলে। তবে ড্রাইভারটি ছিল সাহসী সে অত সহজে দমে যাবার পাত্র ছিল না। সে আজমকা জোরে দরজা খোলায়, ধাক্কা লেগে রিভলবারটি পড়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি রিভলবারটি হাতে তুলে নেয় কিন্তু পেছন থেকে হঠাৎ করে একটা প্রচণ্ড আঘাতে তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরে পড়ে। লুটিয়ে পড়ে সে, তার হাত থেকে পড়ে যায় রিভলবারটি। সামনে পড়ে থাকা লোকটি তাড়াতাড়ি এসে রিভলবারটি তুলে নেয় এবং গাড়িতে উঠে পালায়। রাস্তায় পড়ে থাকে ড্রাইভারের মৃত দেহ। আসলে ঐ তিনজন ছিল ডাকাত। এই অঞ্চলেই রাতের বেলা ডাকাতি করত ওই তিনজন মিলে। তবে সেদিন কোনো ভাবে পুলিশ খবর পেয়ে যায় l তাই পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে এই হাইওয়ে দিয়ে পালায় তারা।"
এই বলে থামল ড্রাইভার।

"তো এ তো ডাকাতির গল্প, তো ভূত কোথায় ? " জিজ্ঞাস করলো শ্যামল।
" আছে আছে দাদা, গল্পতো এখানে শেষ নয়...." এই বলে আবার শুরু করলো ড্রাইভারটি...
" সেদিন রাতে ড্রাইভার মারা গেলেও, তার আত্মা কিন্তু মুক্তি পেলো না, সে সেদিন থেকে প্রতি রাতে খুঁজে বেড়ালো ওই তিন জনকে যাদের জন্য তাকে প্রাণ হারাতে হলো। তাদেরকে শেষ করেই তার প্রতিশোধ পূর্ণ হতো....
বেশ কিছু দিন পর ওই তিন জনের মধ্যে যে রিভলবার বার করে মারতে এসেছিল তাকে বাগে পেল সেই ড্রাইভারের প্রেতাত্মা। এই হাইওয়েরই উপর হয়তো সেদিনও কোনো ডাকাতি করে পালাচ্ছিল। কিন্তু এইবার আর পালানো হয়নি তার, সেই প্রেতাত্মা আর তাকে পালাতে দেয়নি। ড্রাইভারের রক্তাক্ত বিভৎস লাশকে সেদিন নিজের চোখের সামনে দেখে ভয় রিভলবার থেকে গুলো ছুড়েছিল ঠিকই  কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, এই হাইওয়ের উপরেই তার সরু সরু আঙুল দিয়ে গলা টিপে মেরে তার মুণ্ডু আর ধর আলাদা করে দিয়েছিল সেই প্রেতাত্মা। তারপর সেই কাটা মুণ্ডু আর ধর ফেলে রেখেছিল এই রাস্তার ধারেই।
এভাবেই বেশ কিছুদিন পড়ে ওই তিনজনের আরও একজন কে হত্যা করে সেই প্রেতাত্মা। হাইওয়ের উপর দিয়ে পালানোর সময় আবারও সেই প্রেতাত্মার খপ্পরে পড়ে সে। ড্রাইভারের বিভৎস রক্তাক্ত লাশকে সামনে দেখে আতঙ্কে হাতপা অবশ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে ড্রাইভারের সরু লিক লিকে হাত গুলো এসে গলা টিপে ধরে তার। অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু বাঁচতে পারেনি। শরীরটাকে মাঝ বরাবর দুই টুকরো করে ফেলে রেখেছিল এই হাইওয়ের ধারেই সে প্রেতাত্মা।
তবে তৃতীয় জনকে এখনো পায়নি সে, আসলে সেই তৃতীয় জন নাকি সেদিন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেছিল। তবে প্রমাণের অভাবে তার বেশদিন সাজা হয়নি। ছয় মাস কলকাতায় জেল খেটে সে মুক্তি পেয়ে এসব চুরি ডাকাতি ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যায়। তবে এখনো এই প্রেতাত্মা তাকে খুঁজছে এবং সে নিজের প্রতিশোধ পূর্ণ করবেই...." এই বলে থামল ড্রাইভারটি।

শ্যামল দেখলো তার কপালে এই ঠান্ডা পরিবেশেও বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটেছে ।
"কি দাদা, ঘেমে গেলেন যে...." একটু ব্যাঙ্গ করেই জিজ্ঞাস করলো ড্রাইভারটি।
" না না কোথায়....বলছি দাদা আপনি গাড়ি থামিয়ে দিন আমি নামবো। " বলল শ্যামল।
"হা হা হা.....গল্পটা খুব চেনা লাগলো নাকি দাদা ? " যেন এক অট্টহাসি হাসলো ড্রাইভারটি।
" আপনি গাড়ি থামান আমি নামবো.....আমি যাব না, গাড়ি থামান বলছি..." এই বলে জোরে ধাক্কা মারে গাড়ির গেট খুলতে গেল শ্যামল।
কিন্তু বৃথা চেষ্টা....গাড়ির গেট খুলল না, বরং গাড়ির গতি যেন আরো বেড়ে গেলো। আর সাথে বেড়ে উঠলো ড্রাইভারের অট্টহাসি....গাড়ি যেন হওয়াতে ভাসতে লাগলো....ভয় হাত পা অবশ হয়ে আসছে শ্যামলের।
" কি দাদা.......নামতে কেন চাইছেন ?
সেদিন এই গাড়ির জন্যই তো পেছন থেকে আমার মাথায় আঘাত করেছিলেন....তাই না ? কি দোষ ছিল আমার.....মাটিতে পড়েছিলাম অনেক্ষন.....কেউ আসেনি সেদিন...." খনা খনা গলায় বলে উঠলো ড্রাইভার।

" না বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে মারতে চাইনি.....আমি সেদিন শুধু পালিয়ে বাঁচতে চেয়ে ছিলাম, আমি ওসব কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম সেদিনের পর....আমি ওদের বলে ছিলাম আপনাকে হাসপাতালে দিয়ে নিজেরা পুলিশে ধরা দিতে কিন্তু ওরা শোনেনি বিশ্বাস করুন দাদা।....." এই বলে আতঙ্কে আর কান্নায় ভেঙে পড়ল শ্যামল।

এবার মুখ থেকে চাদরটা সরালো সেই ড্রাইভার....উফফ কি বিভৎস এই মুখ.....মাথা ফেটে একদিক থেকে ঝরে পড়ছে রক্ত, একটা দিক শুকিয়ে কঙ্কালের খুলিতে পরিণত হয়েছে....
এসব দেখে রক্ত জল হয়ে এলো শ্যামলের। 

" কি দাদা চিনতে পারছেন মুখটা ? এই দেখুন না.... আপনিই মেরেছিলেন.....খুব রক্ত বেরিয়েছিল দাদা....দেখুন না এখনো রক্ত বেরোচ্ছে...."এই বলে নিজের লক লকে জিভ দিয়ে নিজের কপালে মুখে লেখে থাকা রক্তই চেটে নিল সেই ড্রাইভারের প্রেতাত্মা।

"আমাকে ছেড়ে দিন দাদা, আমায় ক্ষমা করুন...আমার ভুল হয়ে গেছে" এই বলে হাত জোড় করে কান্নায় লুটিয়ে পড়ল শ্যামল।

" কাদিস না রে ভাই.... ও তোকে ছাড়বে না....আমাদেরও ছাড়েনি..." আওয়াজটা শুনে চমকে উঠলো শ্যামল। 
" একি এতো রাজুর গলা....." আশ্চর্য হয়ে পেছনে ঘুরল শ্যামল।
পেছনে বসে থাকা দুজনের কথা ভুলেই গেছিল শ্যামল।
কিন্তু এখন চাদর সরে যেতে শ্যামল যা দেখলো তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেলো।
পেছনে নিজের কাটা মুণ্ডু হাত নিয়ে বসে আছে রাজু আর তার পাশে নিজের দু ভাগে বিভক্ত শরীর নিয়ে আমার দিয়ে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসছে সিধু।
"মুক্তি নেই....মৃত্যুই মুক্তি...." এই বলে ড্রাইভারের সাথে রাজু এবং সিধুও অট্টহাসি হেসে চলল।
 শ্যামল প্রাণপণে চেষ্টা করলো গাড়ি থেকে বেরোনোর কিন্তু কিছুতেই পারল না সে।
" মৃত্যুতেই মুক্তি দাদা.....মরতে হবেই.....নয়ত মুক্তি নেই......"এই বলে পুনরায় অট্টহাসি হাসতে থাকলো ড্রাইভার....

"মুক্তি নেই পাগল....বৃথা চেষ্টা করছিস....," এই বলে সমানে হাসতে থাকলো রাজু ও সিধু....সে কি বিকট হাসি....রক্ত হিম করে দেবার মতন....

হঠাৎ আশ্চর্য ভাবে গাড়ির গেট খুলে গেলো.....অমনি গাড়ি থেকে ঝাঁপ মেরে পাশের ঘাসের জমিতে পড়ল শ্যামল। ঘাসের জমতে পড়েই তাড়াতাড়ি উঠে ছুট দিলো শ্যামল। 
যে ভাবেই হোক তাকে বেঁচে পালাতে হবে। এভাবে সে মরতে পারে না। সে পুলিশে যাবে গিয়ে ধরা দেবে। সারা জীবন জেলে কাটাবে কিন্তু এভাবে প্রেতাত্মার হাসতে বেঘোরে প্রাণ দেবে না।
প্রাণপণে ছুটে চললো শ্যামল। মাঠ ঘাট ক্ষেত জমি সব পেরিয়ে ছুটে চলল সে আর পেছনে শুধু ভেসে আসল সেই ভয়ংকর অট্টহাসি।
এভাবেই ছুটতে ছুটতে কখন যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে গেছিল শ্যামল। পরদিন সকালে সূর্যের আলো বেরোতে সে দেখলো সে এক মাঠের ধারে পড়ে রয়েছে। খুব গা হাত পা ব্যথা তার।  তার আবার গতকাল রাতের কথা মনে পড়লো....অমনি তাড়াতাড়ি মাঠ থেকে বেরিয়ে কিছু দূর আসতেই একটা পুলিশ থানা দেখতে পেল সে।
সে মনে মনে বলল " না অনেক হয়েছে, নিজের দোষ স্বীকার করাটাই হয়তো আমার প্রায়শ্চিত্ত হবে, আর তাতেই হয়তো আমার মুক্তি হবে...।" এই ভেবে আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে সে পুলিশ স্টেশনে ঢুকলো।
সামনেই থানার বড়বাবু বসে আছেন।
শ্যামল বড়বাবু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল " বড়বাবু আমার নাম শ্যামল মাহাতো। আমি এই দুর্গাপুর অঞ্চলেরই বাসিন্দা। আজ থেকে তিন বছর আগে আমি এবং আমার দুই বন্ধু মিলে বেশ কিছু ডাকাতি করি....আমার দুই বন্ধু পালিয়ে যায় কিন্তু আমি পুলিশের হাতে ধরা পরি....যদিও তখন আমি জেরাতে মুখ খুলিনি...এবং প্রমাণ আর অভাবে আমারও শুধু ছয় মাসেরই জেল হয়। এই তিন বছরে আমার দুই বন্ধু মারা যায় এবং আমি সেই ডাকাতির দায়ে এখন আত্মসমর্পণ করতে চাই। "

কিন্তু বড়বাবু সব শুনেও কোনো উত্তর করলো না।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা আওয়াজ শুনে চমকে গেলো শ্যামল।
" ও বড়বাবু...., বডি নিয়ে এসছি....হাইওয়ের ধারেই পড়েছিল। ওই সেই তিনটে ডাকাতের একটা এটা....বাকি দুটোকে তো আর পাওয়া গেল না, কেমন যেন উবে গেলো...." এই বলে স্ট্রেচারে করে একটা লাশ নিয়ে ঢুকলো দুজন কনস্টেবল..... 
সাদা কাপড় ঢাকা দিয়ে স্ট্রেচারে পড়ে রয়েছে শ্যামলের মৃতদেহ....
এই দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল শ্যামল....
পেছন থেকে শুধু কানে ভেসে এলো " বলেছিলাম না মুক্তি শুধু মৃত্যুতেই.....আর সাথে সেই অট্টহাসি......"