Saturday, November 12, 2022

অসম্পূর্ণ

জীবনের প্রথম চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা পেয়ে আজ বেজায় খুশি প্রসূন। অনেক দিন ধরে এই দিনটার অপেক্ষাই তো করছিল সে। আজ সে তার বাবা মার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে। তাদের গর্বের অনুভূতি দিতে পেরেছে। তবে তার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে হচ্ছে তৃষার মুখটা দেখতে যখন সে তাকে এই খবরটা শোনাবে। উফ্ কি খুশিটাই না হবে ও। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ইউনিভার্সিটিতে আলাপ প্রসূনের তৃষার সাথে। প্রথম দেখাতেই বেশ ভালো লেগেছিলো তৃষাকে। তারপর থেকেই বাড়তে থাকে আলাপ, ধীরে ধীরে তারা হয়ে ওঠে একে ওপরের খুব কাছের বন্ধু। তবে হয়তো শুধু বন্ধু না। বন্ধুর থেকে অনেক বেশি কিছু তৃষা প্রসূনের কাছে। আসলে প্রথম দেখাতেই তৃষাকে ভালো লেগে গেছিলো প্রসূনের। সময়ের সাথে সেই ভালোলাগা পরিণত হয়েছে ভালোবাসায়। তবে কোনো দিন সে এ কথা বলে উঠতে পারেনি তৃষাকে। আসলে তৃষা সুন্দরী, বড়লোক বাড়ির একমাত্র মেয়ে, কলেজের বহু ছেলে পাগল তার জন্য। এসবের মাঝে তার মতন ছাপোষা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের ভালোবাসা কি স্থান পাবে.......হয়তো বন্ধুত্বটাও নষ্ট হয়ে যাবে....তবে আজ সে বলবে নিজের মনের কথা। এখন আর সে মধ্যবিত্ত নয়, এখন তার কাছে মোটা মাইনের চাকরি আছে বিদেশে। এখন সে নিজের মনের কথা বলবে তৃষাকে।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পাশে রাখা ডায়েরিটার দিকে চোখ গেল প্রসূনের। আগের বছর এই ডায়েরিটা তৃষাই দিয়েছিল প্রসূনকে। পাগলী দুটো একই রকম ডায়েরি কিনে এনেছিল। একটা সে নিজে লিখবে আর একটায় আমি লিখব। মনে মনে বেশ হাসিই পেয়েছিল সেদিন প্রসূনের। তবে বিগত ছয় মাস যখন এই চাকরির প্রস্তুতির জন্য তৃষার সাথে দেখা হয়নি, কথা হয়নি তখন কিন্তু এই ডায়েরিটাই তার একমাত্র সঙ্গী ছিল। প্রতিদিন সে এই ডায়েরিতে লিখেছে সে কতটা ভালোবাসে তৃষাকে। তবে আজ তার ভালোবাসার প্রস্তাবটাও এই ডায়েরিতেই লিখে তৃষাকে জানাবে সে।


( তৃষার বাড়িতে....... )

তৃষার মা : আরে অনেকদিন পর তো!!!

প্রসূন : হ্যাঁ কাকিমা, মানে ওই আসলে চাকরির চেষ্টা করছিলাম।

তৃষার মা : বাহ, খুব ভালো। তো চাকরি হল ?

প্রসূন : হ্যাঁ কাকিমা, আজই চিঠি এল। কানাডাতে পোস্টিং। ভালো মাইনে।

তৃষার মা: বাহ্, খুব ভালো খবর বাবা। আরো অনেক বড় হও।

প্রসূন : তৃষা বাড়িতে নেই?

তৃষার মা: হ্যাঁ আছে তো, যাক তুমি একটা খুশির খবর দিলে খুব ভালো লাগলো। তবে একটা ভালো খবর কিন্তু আমাদেরও আছে, উপরে যাও তোমার বন্ধু শোনাবে।

প্রসূন : আচ্ছা কাকিমা।

এই বলে সিড়ি দিয়ে উপরে তৃষার রুমে গেল প্রসূন।

প্রসূন : কী রে..............

তৃষা : ওমা তুই........( প্রসূন কে দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো তৃষা)
সেই তো চাকরি প্রিপারেশন করবো বলে ছয়মাস আগে যে উধাও হলি, তারপর থেকে কোনো পাত্তাই নেই তোর, ফোন করেছি পাইনি, মেসেজ করেছি উত্তর নেই।

প্রসূন : ( একটু হেসে) আরে ভাই চাকরি পেয়ে গেছিরে। কানাডাতে পোস্টিং আজই চিঠি এলো তাই তোকে সব বলতে এলাম।

তৃষা : ( একটু ব্যঙ্গ করে) হম বাবু এসছেন বিদেশের চাকরী নিয়ে। ওমা ওটা তোর হাতে ওই আমার দেওয়া ডায়েরিটা না ? 

প্রসূন : হ্যাঁ রে। তোকে অনেক কিছু বলার আছে রে।

তৃষা : আয় না বস, ( এই বলে বিছানার দিকে ইশারা করলো তৃষা ) এই দেখ আমারও আছে সেম ডায়েরি। ( এই বলে বিছানা থেকে ডায়েরিটা তুলে দেখলো সে প্রসুনকে)

প্রসূন : একটু হেসে বিছানায় গিয়ে বসলো। ডায়েরিটা পাশে রাখলো। 

তৃষা : ওই আচ্ছা বল তোকে কবে যেতে হবে ? জয়নিং কবে ? আর কি সব বলবি বললি..... বল বল.....প্রেমে পড়েছিস নাকি.....তুই তো আবার ভাই স্কলার স্টুডেন্ট....তুই তো কোনো তোর মত স্কলার দেখে প্রেম করবি। আমরা ভাই তোর ক্যাটাগরির নাহ, টেনে টুনে পাস করা পাবলিক....

( প্রসূন উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিল....তার আগেই তৃষা আবার বললো....)

তৃষা : ওই তোকে মা বলেছে খবরটা......

প্রসূন : কি খবর......?

তৃষা : আরে ভাই আমার বিয়ে পরের সপ্তাহে।

( নিমেষের মধ্যেই প্রসূনের সমস্ত জগৎ যেন অন্ধকার হয়ে গেল, তার সমস্ত খুশি যে একটা কথায় দুঃখে পরিণত হয়ে গেল)

প্রসূন : ( অনেক কষ্ট নিজেকে সামলে) মানে... বিয়ে মানে....কবে ঠিক হলো....

তৃষা : আরে বলিস না। বাবার বন্ধুর ছেলে, ভালো চাকরি করে। দেখাশুনা হল তারা পছন্দ করলো, বাবা মার কোনো অসুবিধা ছিলো না। আর কি ঠিক হয়ে গেল বিয়ে।
আর তোর তো পাত্তাই ছিলনা। তুই তো এমন প্রিপারেশন শুরু করলি.....আমি তো ভাবলাম একদম চাকরি সমেত কোনো স্কলারকে বিয়ে করে ফেসবুকে ছবি দিয়ে জানাবি। আমরা কম পাওয়া স্টুডেন্ট আমাদের তো পাত্তাই দিবি না।

প্রসূন : ( এবার একটু হাসির সাথে ) আরে না রে ভাই.....যাক ভালই হলো তোর বিয়ে.....এবার আর আমার মাথা খাবি না....নতুন চাকরি...শান্তিতে কাজ করবো নয়তো তুই জ্বালিয়ে মারতিস....এবার তোর বড় কে জ্বালাস। 

তৃষা : সেই....... যাই হোক কার্ড টা নিয়ে যাস আর সকাল সকাল আসবি কিন্তু।

প্রসূন : না ভাই কার্ড লাগবে না। আর আমার আসাও হবে না রে। আমার পরের সপ্তাহেই চাকরিতে জয়েন করতে হবে। সব অ্যারেঞ্জ করতে হবে। যায় হোক অনেক শুভ কামনা খুব ভালো থাক তোরা, আচ্ছা চল আজ উঠি আবার সব ব্যবস্থা করতে হবে। পরের সপ্তাহে বেরোনো।

তৃষা : এমা তুই আসবি না.....আচ্ছা তুই আর কি সব বলবি বললি....কই বললি না তো।

প্রসূন : না আজ থাক। দেরি হয়ে গেছে রে ভাই অনেক। 

(এই বলে উঠে বেরোতে এগোলো প্রসূন...)

তৃষা : ভাই তোর ডায়েরিটা.....
(এই বলে প্রসূনের ডায়েরিটা এগিয়ে দিলো তৃষা...)

ডায়েরিটা হাতে নিয়ে এক গাল হেসে রুম থেকে বেরিয়ে গেল প্রসূন।

বাড়ি ফিরে আজ মনটা খুব খারাপ প্রসূনের।

ছাদে বিকেলের পড়ন্ত রোদে বসে তার এই নিয়তির কথাই ভাবছিল প্রসূন। এতদিন ধরে সাজানো তার স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। কত স্বপ্ন না সে বেধেছিল তৃষাকে নিয়ে......সব স্বপ্ন আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আজ মন খুলে খুব কাদতে ইচ্ছে হচ্ছে......পাশে রাখা তৃষার দেওয়া সেই ডায়েরিটা যাতে তার সমস্ত অনুভূতি লেখা। আজ এই ডায়েরি দিয়েই সে তৃষাকে তার মনের কথা জানাবে ভেবেছিল.....কিন্তু....

ডায়েরিটা হাতে নিয়ে একবার খুললো প্রসূন....
"আজ দুমাস হয়ে গেল প্রসূনের সাথে কথা হচ্ছে না। আসলে ও চাকরিটা নিয়ে খুব সিরিয়াস। ওর ভালোর জন্য এই টুকু স্যাক্রিফাইস তো আমি করতেই পারি....যতই হোক ভালোবাসা কি আর এত সোজা....."

একই এ তো তৃষার ডায়েরি......(বিস্ফারিত চোখে ডায়েরির পাতা অল্টালো প্রসূন)

" বাড়িতে ছেলে দেখছে। আমার বিয়ের ইচ্ছে নেই। কিন্তু প্রসূনতো অত শিক্ষিত, সে ভালো চাকরি পাবে। আমার মতন পাগলির জন্য ওর ফিলিংস আসবে না। আমায় সারাজীবন ও পাগলীই ভাবে। হয়তো ওকে আমার মনের কথা গুলো জানালে ও আমায় খারাপ ভাববে। হয়তো বন্ধুত্বটাও নষ্ট হবে। না না থাক। আসলে সব ভালোবাসা হয়তো পরিণতি পায়না।"

(পরের পাতা ওল্টালো প্রসূন.....)

" আজ বাড়িতে ছেলে দেখতে আসবে। শেষ কদিনে অনেক বার প্রসূন কে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করলাম। পারলাম নাহ। হয়তো আমাদের বন্ধুত্ব টুকুই ছিলো আমার ভাগ্যে।"

( পরের পাতা......)

" আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। অনেক বড়লোক বাড়িতে বাবা বিয়ে দিচ্ছে। সবাই খুব খুশি......
আর হয়তো কখনো প্রসূনের সাথে দেখা হবে না। অনেক দূরত্ব হয়ে যাবে যা আর মিটবে না।"

ডায়েরিটা পড়তে পড়তে দু চোখ ভরে জল নেমে এলো প্রসূনের।
হঠাৎ পাশের ফোনটা বেজে উঠলো।
( তৃষা ফোন করেছ......)

তৃষা : হ্যালো......

প্রসূন : হ্যাঁ বল.....

তৃষা : তোর ডায়েরিটা তুই ফেলে গেছিস.....ভুল করে আমারটা নিয়ে গেছিস। আজ অনেকটা দেরি করে এলি রে। আর একটু আগে আসলে তোর সব কথা গুলো তুই বলতে পারতিস। যাই হোক চল রাখলাম। ভালো থাকিস, ভালোভাবে চাকরি করিস।

তৃষার বলা কথা গুলো যেন বার বার কানে বাজতে লাগলো প্রসূনের।

"হয়তো এভাবেই শেষ হয় কিছু কাহিনীর,
যেখানে বাকি থেকে যায় কিছু বলা,
কখনো সময়ের অভাব,
কখনো বা পরিস্থিতির চাপ।
কখনো আবার থাকে
একে অপরকে হারানোর ভয়,
তাই মন বলে নাই হোক সব বলা,
হোক কিছু কাহিনীও এমন,
যা অসম্পূর্ণ রয়েই সম্পূর্ণ হয়।।"







Thursday, October 6, 2022

মূর্তি

থানা থেকে ফিরতে আজ একটু দেরি হয়ে গেল সমরেশের। আসলে ওসির পদে প্রমোশনসের পর থেকে তার কাজের চাপ একটু বেশিই বেড়ে গেছে। তাই মাঝে মধ্যেই তার ফিরতে দেরি হয়। যদিও তাতে কোনো অসুবিধা নেই তার। একলা মানুষ সে। বাড়িতে লোক বলতে তার এক মাত্র চাকর কানাই দা। তবে আজ একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল। ঘরে ঢুকে হাত পা ধুয়ে কানাইদা কে খাবার বাড়তে বলে একটু টিভিটা চালিয়েছিল অমনি কলিং বেলের আওয়াজ।
হঠাৎ এতো রাতে কলিং বেলের আওয়াজে একটু আশ্চর্য হল সমরেশ।
এত রাতে আবার কে এলো?
অগত্যা সে উঠে গেলো দরজা খুলতে।
কিন্তু একি... এ যে তার ছোট বেলার বন্ধু সোমনাথ !
সেই কলেজ ছাড়ার পর বহু বছর দেখা পায়নি সে সোমনাথের তাই আজ হঠাৎ এভাবে এত রাতে তাকে দেখে বেশ অবাকই হলো সমরেশ।

সমরেশ : কি রে হঠাৎ এত দিন পর উদয় হলি তাও এত রাতে ? সব ঠিক আছে তো ? 

সোমনাথ : ভাই ভেতরে গিয়ে কথা বলি ? 

সমরেশ এবার একটু লজ্জা পেয়ে বললো,
আরে আয় আয়, আসলে তোকে দেখে একটু আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম। আয় ভেতরে। আমি তো এই অফিস থেকে এসে খেতে বসছিলাম। দাড়া কানাইদাকে বলছি তোর জন্যও একটা পাত বাড়তে।

সোমনাথ : না না ভাই, আমি খাবো না কিছু। তোর সাথে খুব দরকার ছিল। তাই এত রাতে বিরক্ত করলাম। জানি তুই এখন থানার ওসি। তাই ভাবলাম তোকে কিছু কথা জানিয়ে যাই। নয়তো........

কথাটা বলতে বলতে থেমে গেল সোমনাথ।

সমরেশ : নয়তো ....? কি নয়তো ....? কি হয়েছে ভাই ? কিছু প্রবলেমে আছিস ?

সোমনাথ : আমি জানি না ভাই কিন্তু হয়তো আমি আর বেশি দিন বেঁচে থাকবো না। তাই তোকে সবটা বলে যেতে চাই।

সমরেশ বেশ একটু আশ্চর্য হল এবার,
কি ভাই কি সব বলছিস ? কিছু রোগ ঠোগ হয়েছে নাকি তোর ? তুই বলতো আমি ভালো হসপিটালে তোর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

সোমনাথ : আরে না না ভাই রোগ আমার শরীরে নেই ভাই। রোগ আমার কপালের। মৃত্যু সবসময় পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার।

এবার সমরেশের একটু সন্দেহ হলো, সোমনাথ কি কোনো নেশা ঠেসা করছে নাকি কোনো ক্রিমিনালের দলে গিয়ে ভিড়েছে...

সমরেশ : ভাই ব্যাপারটা কি তুই একটু ঠিক করে বলবি ? কি সব আবোল তাবোল বলে যাচ্ছিস। আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছেনা।

সোমনাথ এবার একটু গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞাস করলো, 
তোর কি আমার মধ্যে কোনো পাগলের লক্ষণ মনে হচ্ছে ?

সমরেশ উত্তর দিলো, কই না তো।

সোমনাথ : তাহলে একটা গল্প বলি শোন, জানি না তুই কতটা বিশ্বাস করবি কিন্তু বিশ্বাস কর আমি যা বলছি সম্পূর্ণ নিজের স্বজ্ঞানে এবং সত্যি বলছি।

সমরেশ : আরে ভাই তুই নির্দ্বিধায় বল আমায় কি হয়েছে।

সোমনাথ : তবে শোন,
এই বলে নিজের গল্প শুরু করলো সোমনাথ।

কলেজ শেষ হবার পর তুই তো পুলিশ হবি বলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলি। আমাদের গ্রুপের বাকিরাও যে যার মতন কাজে ঢুকে গেলো। তবে আমি কিন্তু যোগ দিলাম আমার বাবার ফ্রিজ এসির ব্যবসাতে। প্রথম কিছু বছর বেশ ভালই কাটছিল। নতুন নতুন টাকার স্বাদ বেশ ভালই লাগছিল। আর ব্যবসা চলছিলো বেশ রম রমিয়ে। জীবনে টাকা পয়সার সাথে সাথে সুমনার রূপে আমার প্রথম প্রেমও এলো। সব কিছু বেশ ভালই চলছিল। ধীরে ধীরে বাবার হাত থেকে ব্যবসার সমস্ত দায়িত্ব নিজের উপর নিয়ে নিলাম। তবে এসবের সাথে সাথে মদ জুয়া এগুলোর প্রতি ও আসক্তি জন্মাতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে নেশায় পরিণত হতে শুরু করলো। দিনের পর দিন নেশা আরো বাড়তে থাকলো আর কমতে থাকলে নিজের ব্যবসার প্রতি ধ্যান। ধীরে ধীরে ব্যবসার প্রসারও কমতে থাকলো। তবে আমার সেসব দিকে ধ্যান গেলো না। আমার নেশা তখন জুয়া আর মদ। এই দুইয়ের জন্য আমি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত। তবে এরই মাঝে একদিন এক আশ্চর্য্য ঘটনা ঘটলো। একদিন জুয়াতে বেশ অনেটা জিতেছি। তবে যার সাথে জুয়া খেলছি সেও সেদিন নিজের সর্বস্ব হারাতেই হয়তো এসছিল। সে বাজিতে তার সমস্ত টাকা শেষ করার পর সে একটা বক্স সমেত পুরনো মূর্তি বার করে টেবিলের উপর রাখলো। বললো এই মূর্তি তার সব চেয়ে দামী সম্বল। এই মূর্তি যার কাছে থাকবে তার নাকি তিনটে ইচ্ছে এই মূর্তিটা পূর্ণ করবে তবে এই মূর্তির যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আর একবার মূর্তির কাজ শেষ হলে সেই মূর্তিকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। আজ এই মূর্তি বাজি রেখে সে একটা শেষ বাজি খেলতে চায়। যথারীতি আমি রাজি হলাম আর ভাগ্য লক্ষ্মীর কৃপায় এই বাজিও আমিই জিতলাম। এর পর বহু দিন কেটে গেল। ধীরে ধীরে আমার আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। সমস্ত ব্যবসা ডুবে গেল। বাজারে দেনাতে ভরে গেল। প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার দেনা হয়ে গেলো। সব শেষে ঠিক করলাম বাড়িটা বিক্রি করে দেনা মিটিয়ে ভাড়া বাড়িতে উঠবো। ওদিকে আমার জীবনের প্রেমও হারিয়ে গেল। সুমনার বাবা আমার আর্থিক অবস্থা দেখে মেয়ের বিয়ে অন্য জায়গাতে ঠিক করলো। অবশেষে বাড়ি বিক্রির সময় উপস্থিত হলো। বাড়ি ছাড়ার আগে সব জিনিস পত্র গোছাতে গিয়ে রাত্রি বেলা হঠাৎ আলমারি থেকে সেদিনের সেই বাকসো সমেত মূর্তিটা বেরোলো। এটাকে দেখে নিজের অতীতের কুকর্ম গুলো মনে পড়লো। মনে পড়লো কিভাবে দিনের পর দিন নিজের দোষে নিজের সব হারিয়ে আমি আজ নিস্ব। হঠাৎ মুহূর্তের মধ্যে সেই দিন সেই লোকটার বলা কথাটা মনে পড়লো। এই মূর্তি যার কাছে থাকবে তার তিনটে ইচ্ছে পূর্ণ করবে। বক্স থেকে মূর্তিটা হাতে ধরে বললাম যদি তুমি সত্যি পারো তাহলে আমার বাড়িটা বিক্রির হাত থেকে বাঁচিয়ে দাও। কিছু ক্ষন নিস্তব্দ ভাবে অপেক্ষা করলাম। ভাবলাম এই বুঝি কোনো জাদুবলে ৫০ লক্ষ টাকা এসে উপস্থিত হবে। কিন্তু কোথায় কি...? কিছু নেই। অগত্যা মূর্তিটা টেবিলের উপর রেখে নিজের নির্বুদ্ধিতার উপর হাসতে হাসতে শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে হঠাৎ ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো আমার। একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসছে। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপর থেকে বললো হ্যালো মিস্টার সোমনাথ বলছেন ? আমি বললাম হ্যাঁ বলছি। ওপর দিক থেকে উত্তর এলো নমস্কার স্যার আসলে আপনি এক বছর আগে একটা টেন্ডার জমা করেছিলেন কিন্তু তখন কাজটা হয়ে ওঠেনি। তবে এখন আমাদের কোম্পানি সমস্ত টেন্ডারের মধ্যে আপনার টেন্ডারটি পছন্দ করেছে। আপনি ৫০ লক্ষ টাকার কোটেশন দিয়েছিলেন। যদি আপনি রাজি থাকেন তাহলে আমি আমাদের ঠিকানা দিচ্ছি দুপুর নাগাদ এসে চেকটা নিয়ে যাবেন। এই বলে ফোনটা কেটে গেল। আর অমনি ফোনে একটা মেসেজ ঢুকলো। তবে আমি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না এত বড় টেন্ডার আমি কবে এবং কোন কোম্পানিকে দিয়েছিলাম। বিছানা থেকে নামতে গিয়ে মূর্তিটার দিকে চোখ পড়তেই হঠাৎ একটা চিন্তায় মাথাটা ঘুরে গেল। কাল রাতে আমি মূর্তির কাছে চেয়েছিলাম যেন বাড়িটা বিক্রি না হয়। তাহলে কি.....
সাথে সাথে মূর্তিটা কে হাতে তুলে নিলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম কিভাবে এই মূর্তির সত্যতা যাচাই করবো। হঠাৎ মাথায় এল কাল তো সুমনার বিয়ে। তাহলে মূর্তি কি সুমনাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবে....? 
সাথে সাথে মূর্তিটা কে শক্ত করে ধরে বললাম আমার দ্বিতীয় ইচ্ছে সুমনার বিয়ে যেন আমার সাথে হয়।

এই বলে মূর্তিটা কে টেবিলের উপর রেখে আমি বাথরুমে গেলাম। কিছুক্ষন পর বাথরুম থেকে বেরোতেই দরজার কলিং বেল বাজলো। গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে সুমনার বাবা। আমি জিজ্ঞাস করলাম কি ব্যাপার আপনি এখানে ? সুমনার বাবা হাউ মাউ করে কেঁদে আমার পা জড়িয়ে বলল বাবা জীবন আমায় বাঁচাও। আমার মেয়েকে উদ্ধার করো। আমি কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাস করলাম আরে কি ব্যাপার সেটা তো বলুন। সুমনার বাবা যা বললো তা অনেকটা এই রকম, সুমনার হবু বর এবং বরযাত্রীর আজ আসার কথা জলপাইগুড়ি থেকে কিন্তু আসার পথে হঠাৎ বাসের ব্রেক ফেল করে পুরো বাস খাইতে পড়ে যায়। মনে মনে শুনে বেশ খুশিই হলাম আর এও বুঝলাম যে মূর্তি নিজের কাজ করেছে। তবে ওপর ওপর দুঃখ দেখিয়ে বললাম আপনি চিন্তা করবেন না আমি আছি আমি বিয়ে করবো সুমনাকে। আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। সুমনার বাবা যেতেই আমার যেন আর আনন্দের সীমা রইল না। নিজের তিন নম্বর ইচ্ছেতে কি চাওয়া যায় এটাই ভাবতে ভাবতে মূর্তিটা হাতে নিতে যাচ্ছিলাম হঠাৎ পায়ে পায়ে জড়িয়ে পড়লাম টেবিলটার উপর আর সাথে সাথেই মূর্তিটা টেবিল থেকে নীচে পড়ে মূর্তির মাথাটা খুলে গেল। তাড়াতাড়ি মূর্তিটা জুড়ে ফেলার চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। এবার মূর্তিটা কে হাতে নিয়ে তার উপর মাথাটাকে ধরে নিজের তৃতীয় ইচ্ছেটা বলে ফেললাম। বললাম মূর্তি আমার তিন নম্বর ইচ্ছে আমার ঘরটা সোনা দিয়ে ভরে দাও। এই বলে মূর্তিটা রেখে স্নানে গেলাম ভাবলাম বেরিয়ে দেখবো পুরো ঘর সোনায় ঢেকে গেছে। কিছুক্ষন পর স্নান সেরে বেরোতে দেখি ঘর যেমন ছিল তেমনই আছে। কই সোনা...? কোথাও কিছু নেই। এমন সময় হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। আমি ফোনটা রিসিভ করলাম। ওপর থেকে উত্তর এলো " হ্যালো মিস্টার সোমনাথ ? " আমি বললাম হ্যা বলছি। উত্তর এলো " সরি স্যার। সকালে আপনাকে আমি ফোন করেছিলাম আসলে ওটা ভুল করে আপনার কাছে চলে গেছে। আসলে আপনাদের নামটা পর পর ছিলো। যার টেন্ডার সিলেক্ট হয়েছে তিনি সোমনাথ রায় আর সকালে ভুল করে রায়ের বদলে সোমনাথ দাস মানে আপনাকে কল করে ফেলা হয়। কিছু মনে করবেন না স্যার। আমরা একান্তই দুঃখিত।" এই বলে ফোনটা কেটে গেল। মুহূর্তের মধ্যে যেন আমার সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে গেল। এই ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আবার ফোনটা বেজে উঠলো। আমি ফোনটা রিসিভ করলাম। ওপর প্রান্ত থেকে উত্তর এলো , " সোমনাথ বাবা আমি সুমনার বাবা বলছি। বলছি তোমায় বলতে খারাপ লাগছে কিন্তু হয়তো তুমি শুনেও খুশি হবে। সুমনার হবু বর এবং বর যাত্রী সবাই সুস্থ আছে। যেই বাসটা খাই তে পরে যায় সেটা ওদের আগের বাসটা ছিলো। তবে তুমি বিপদের মাঝে যে আশ্বাস টা দিয়েছিলে তার জন্য অনেক ধন্যবাদ বাবা। জীবনে অনেক সুখী হও। এই বলে ফোনটা কেটে গেলো। মুহূর্তেই যেন চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল আমার। এমন অবস্থায় হঠাৎ যেন মনে হলো ঘরে আমার সাথে কেউ একজন আছে। পেছন ঘুরতেই দেখি একটা কুড়ুল হাতে এক যোদ্ধার সাজে এক মুণ্ডুহীন দানব রুপি ছায়া মূর্তি আমায় মারতে আসছে আর সেই দিন থেকে প্রতিনিয়ত সর্বক্ষণ আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি সেই ছায়া মূর্তি থেকে। কোথাও সে আমার পিছু ছাড়ে না। হয়তো আমার প্রাণ নিয়েই সে শান্ত হবে।

এই বলে চুপ করলো সোমনাথ।
সে দেখলো সমরেশ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সোমনাথ হেসে বললো, কি পাগল ভাবছিস তো আমায় যে কি গাঁজা খুরি গল্প শোনাচ্ছি তোকে...দাড়া এই দেখ বলে নিজের পকেট থেকে একটা ছোট কালো কাঠের মাথাহীন মূর্তি বার করে সমরেশের সামনে রাখলো সোমনাথ।

এবার সমরেশ বললো, দেখ ভাই আমার মনে হয় তোর একজন ভালো ডাক্তারের প্রয়োজন। তোর উপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে বুঝতে পেরেছি। তাতে একটু মানসিক রোগ গ্রস্ত হয়ে হ্যালুসিনেশন হওয়াটা আশ্চর্য্য না। আজ অনেক রাত হল। তুই বরং এখানেই থাক। কাল না হয় এসব নিয়ে কথা বলা যাবে। এই বলে সমরেশ উঠতে যাবে অমনি হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে গেলো আর অমনি সোমনাথ চিৎকার করে বলে উঠলো " এসে গেছে, সে এখানেও এসে গেছে, আমায় পালাতে হবে, আমায় পালাতে হবে..." এই বলে মূর্তিটা নিয়ে প্রাণপণে ছুট দিয়ে গেটের বাইরে বেরিয়ে গেল সোমনাথ। আশ্চর্য্য ভাবে সে চলে যাবার সাথে সাথেই কারেন্টও এসে গেল। তবে আজ সোমনাথের অবস্থা দেখে বেশ কষ্ট হল সমরেশের ঠিক করলো কাল একবার সোমনাথের বাড়ি যাবে। ওকে কোন একজন ভালো সাইক্রাটিস্ট দেখাবে মনে মনে ঠিক করলো সে। এভাবে নিজের ছোট বেলার বন্ধুকে পাগল হয়ে যেতে দেওয়া যায়না।

পরদিন সকালে থানার কনস্টেবলের ফোনে ঘুম ভাঙলো সমরেশের।
" হ্যালো স্যার, বলছি স্যার আপনার বাড়ির কাছেই খালের ধারে একটা মার্ডার হয়েছে স্যার। মাথাটা কেটে নিয়ে চলে গেছে স্যার।"
সমরেশ বললো , আচ্ছা তুমি লোকেশনে থাকো আমি জলদি পৌঁছাচ্ছি ততক্ষন কাউকে কিছু ছুঁতে দেবে না।
কিছুক্ষনের মধ্যেই স্পটে পৌঁছালো সমরেশ, লাশটা দেখে মনটা কেমন একটা লাগলো সমরেশের। জামা কাপড় পুরো কাদায় মেখে গেছে মাথাটা কেটে মনে হয় খালের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে যাতে চেনা না যায়।
সমরেশ কনস্টেবলকে জিজ্ঞাস করলো, কার লাশ কিছু খোঁজ পেলে ?
না স্যার, কিছুই বোঝা যাচ্ছে নাহ। কি দিয়ে মেরেছে সেটাও তো পেলাম না স্যার। তবে স্যার দেখে মনে হয় ধারালো খুব। একবারেই পুরো মাথা নামিয়ে দিয়েছে।
সমরেশ মাথা নেড়ে বললো হম তাই মনে হচ্ছে, যাই হোক পোস্টমর্টেমে পাঠানোর ব্যবস্থা করো এই বলে উঠে আসতে গিয়ে সমরেশের নজরে পড়লো দূরে পড়ে থাকা একটা বক্সের উপর। বক্সটা হাতে নিয়ে খুলতেই ভেতর থেকে বেরোলো একটা ছোট কালো কাঠের মূর্তি। ঠিক অবিকল কালকের সোমনাথের দেখানো মূর্তিটার মতন। তবে এই মূর্তিটার মাথা আছে এবং মূর্তির মুখটা অবিকল তার বন্ধু সোমনাথের মতন।

Wednesday, September 7, 2022

ভাঙ্গা স্বপ্ন

বাড়িয়েছি হাত বাড়ে বাড়ে,
চেয়েছি ছুঁয়ে দেখতে তোমায়।
তবে দাওনি ধরা,
দাওনি ধরা তুমি,
রয়ে গেছ সদা দূরে বহু দূরে।
তাই আজ সব স্বপ্নের অবসানে,
একাকীত্বের সান্নিধ্যে যখন উদাস হয় মন,
ভাবে কোথা ছিলো তব ত্রুটি,
যার ফল স্বরূপ আজ এত দূর তুমি।
তবে জানি আর আসবে না তুমি,
হবে না পূর্ণ তোমায় ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন।
তবে অবশেষে বুঝেছে মন,
করেছে নিজেকে শক্ত।
বেধেছে সে নিজ নতুন এক লক্ষ্য,
তবে ভোলেনি সে না পাবার সেই দুঃখ।
তাই আজ সে বাড়িয়েছে গতি,
হয়েছে দ্রুত থেকে দ্রুততর।
আসলে বোঝে সে আজ না পাবার যন্ত্রণা কি,
আর বোঝে সে স্বপ্ন ভাঙ্গার দুঃখ কত বড়।।

Thursday, August 18, 2022

অমূল্য তুমি

কি করে বলি কত সুন্দর তুমি,
কি করে বলি বলো,
যদি বলি তুমি চাঁদ,
আমার মনের আকাশে,
হবে কি তা যথাযথ ?
নাকি বলবো তোমায় গোলাপ,
আমার মনের বাগানে ?
নাকি বলবো তোমায় কত অমূল্য তুমি,
অমূল্য তুমি মুক্তার ন্যায় যা নিমজ্জিত মোর মনের সমুদ্র তলে।
নাকি বলবো তুমি সুন্দর ন্যায় শিশির কনা,
জমে থাকে যা শীতের ভোরের পাতায়, 
স্নিগ্ধ করে যা চারিদিক।
না তবে হয়তো যথাযথ নয়,
হয়তো যথাযথ নয় কোনো অলঙ্কারই,
যা হতে পারবে এ রূপের সমতুল্য,
তাই তো বলি
তোমার রূপের,
তুলনা তুমিই।
তুমিই এক,
তুমি অমূল্য ।।

Thursday, June 30, 2022

সঠিক

ছোটো বেলার এক ক্ষুদে শিশু মনে,
বড়ো হবার বড় ইচ্ছে ছিলো।
তবে বড় হয়ে আজ মন কেন বলে
"ছোট্ট বেলাটাই ভালো ছিলো"

মন কেন চায়,
আজ ফিরে যেতে,
ফিরে যেতে চায় সেই ক্ষণে,
ছিলনা যখন স্বার্থ কোনো,
আর ছিলো ভালোবাসা শুধু মনে।

অবশেষে মন ভাবে একলা,
ভাবে হয়তো এই ই জীবনের রীত,
কাছে থেকে যারে ভেবেছি খারাপ,
আজ দূরে সেই লাগে ঠিক।




Saturday, June 11, 2022

তুমি ছিলে সদা পাশে

জায়গাটা শুধু তোমার,
কারণ, ছিলে তুমি সদা সাথে।
ছিলে তুমি সেই সময়,
যখন আর ছিলনা কেউ আসে পাশে।

ছিলনা যখন কেউ সাহস দেবার,
তখন বলেছিলে তুমি হাতটা ধরে,
কেনো পাও তুমি ভয়,
আছি তো আমি,
আমি আছি তো তোমার সাথে।

জুগিয়ে ছিলে এগিয়ে যাবার ইন্ধন,
বলেছিলে সফল তোমায় হতেই হবে,
যতই আসুক বাধা বিপদ,
লড়াই তোমায় জিততে হবে।

অবশেষে এখন সফল আমি,
লোকে থাকতে চায় আজ মোর পাশে,
তবে দেখে এত সব আপন স্বজন,
মন যেন কেমন মুচকি মুচকি হাসে।
তবে মুচকি হেসে বলে শুধু মন,
বলে সে শুধুই বারংবার,
জায়গাতো শুধু তোমারই আছে,
আর থাকবেও শুধু তোমার।





Sunday, May 22, 2022

অচেনা সম্পর্ক

জীবন চলার একলা পথে,
গড়ে ওঠে কিছু সম্পর্ক এমন,
যার না থাকে কোনো নাম,
না থাকে পরিচয়,
যাতে থাকে না কোনো বাঁধার বাঁধন।
শুধু থেকে যায়,
শুধু থেকে যায় এক ভালোবাসার টান,
সজ্জিত হয় যা কিছু না বলা কথায়,
কিছু নিস্বার্থ যত্নের অব্যক্ত ভালোবাসায়,
যা থেকে যায় চির অগোচরে,
শান্ত মনের গভীর অতলে।

Wednesday, May 4, 2022

অপেক্ষা

প্রতিদিন রাতে ভাবনার কোলে,
মন খোঁজে তোমায় দুচোখ মেলে।
আকাশ পানে চেয়ে সে ভাবে,
আর কতদিন চুপ সে রবে।

আর কতদিন গোপনে গাইবে,
গোপনে গাইবে মনের গীত,
আর কতদিন রাখবে গোপনে,
শত সাধনায় পাওয়া জিত।

মন খুলে সে বলবে কবে,
কবে বলবে সে এই গাঁথা,
নাকি আজীবন থেকে যাবে না বলাই,
তার এই শত যুদ্ধের ব্যথা।

তাই ভেবে আজ আকুল এমন,
তবে কাটবে কি এমনেই সারাটা জীবন?
নাকি সূর্যের ন্যায় রাতের শেষে,
আসবে তুমি আকাশ জুড়ে।
ছড়িয়ে দেবে আলোর ছটা,
সব দিগন্ত প্রান্তরে।

তাই ভেবে আজ আশাবাদী মন,
শুধু গুনে যায় তার অপেক্ষার ক্ষণ,
বিশ্বাস তার তব আসবে ঠিকই,
শীঘ্রই আসবে তার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।



        সুদীপ দে








Thursday, March 17, 2022

লটারি

সকাল সকাল ছেলে সুভাষের ফোন পেয়ে একটু আশ্চর্যই হলো আজ রমেন বাবু।

সুভাষ : হ্যালো বাবা....কেমন আছো ?

রমেন বাবু : হম ভালো আছি..তোরা ভালো আছিস তো ? বৌমা আর দাদু ভাই কেমন আছে ?

সুভাষ : সবাই ভালো আছে বাবা...রমা তো রোজই বলে তোমার কথা...
আচ্ছা বলছি বাবা বিভাস কাকার কাছে শুনলাম তুমি নাকি লটারি পেয়েছ..!!??

রমেন বাবু : ( একটু লজ্জা পেয়ে ) আরে....ওই মানে..এই কদিন আগেই পেলামরে…তোদের সাথেতো তেমন কথা হয়না তাই জানানো হয়নি...সেদিন বিভাসের সাথে দেখা হওয়াতে ওকে বললাম...

সুভাষ : কত টাকার জিতলে ? 

রমেন বাবু : ওই ফার্স্ট প্রাইজ ছিল ২০ লাখ...সেটাই পেয়েছি...তবে টাকাটা এখনও পাইনি.... লটারির অফিস থেকে বললো পরের মাসে লটারী ইন্সপেক্টর আসবে। সে এসে টিকিট দেখে টাকা দেবে..

সুভাষ : সেসব ঠিক আছে...কিন্তু এত গুলো টাকার ব্যাপার...তুমি পাড়ায় একে তাকে বলে বেরিও না..আচ্ছা দিদি জানে নাকি ?

রমেন বাবু : না এখনও আমি তো তোর দিদিকে বলিনি..
তাই মনে তো হয়না তোর দিদি জানে...
( হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠলো )
আচ্ছা দাড়া কেউ এসেছে মনে হয়...
( ফোন হাতেই গেট খুলতে গেলেন রমেন বাবু )

গেট খুলতেই দেখলেন সামনে দাড়িয়ে তার মেয়ে, জামাই আর আদরের নাতনী রাণী.
 
রমেন বাবু : আরে গীতা...!!! সকাল সকাল তুই জামাই সবাই একসাথে !!!?? সব ঠিক আছে তো ?

গীতা : আরে বাবা হঠাৎ তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। তোমার জামাই বললো চলো তবে দেখে আসি বাবাকে...

রমেন বাবু : হ্যাঁ...ভালো করেছিস আয় ভেতরে আয়..
এই দেখ ভুলেই গেছি সুভাষও আজ ফোন করেছিল..পর ফোনটা কাটাই হয়নি..
" হ্যাঁ...হ্যালো সুভাষ..বাবা তোর দিদি জামাই বাবু এসেছে রে...আমি রাখছি তোকে পড়ে ফোন করবো..

( এই বলে ফোনটা রাখলো রমেন বাবু )

রমেন বাবু : তারপর বল বাবা জীবন কেমন আছো তোমার ? সেই তোমার শাশুড়ি মা গত হবার পর এই এলে। তো বল আজ কি খাবে ? বাজারটা তাড়াতাড়ি সেরে আসি নইলে এরপর আর ভালো কিছু পাবও না।

গীতা : আরে বাবা ধুর তুমি একটু বসো তো.....শরীর কি হাল বানিয়েছ !!!!! খাওয়া দাওয়া ঠিক করে করছো না নিশ্চয়ই....গঙ্গার মা ঠিক করে খেয়াল রাখছে না তোমার দেখছি। আসুক আজ দেখাচ্ছি মজা.....
 (এবার গীতা তার বরের উদ্দেশ্য বললো)
আরে তুমি বসে দেখছ কি.... যাও বাজারটা করে নিয়ে এসো... বাবার বাজার গিয়ে কাজ নেই...

রমেন বাবু : আরে তোর গঙ্গার মাকে আমি অনেকদিন আগেই কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছি....আর তোরা একবেলার জন্য এসেছিস তার মধ্যে আর বাবা জীবন কে বাজার যেতে হবে না। বাবার কাছে এসছিস বল কি খাবি আমি ই নিয়ে আসছি।

গীতা : ওমা.....সেকি কথা.... ও তো নিজের বাড়ি তেও বাজার করে...
(নিজের বর কে একটু রাগ দেখিয়ে)
এই যাওনা করে এসো বাজারটা....বাবাকে একদম যেতে দেবে না...।
( নিজের বাবার উদ্দেশ্যে)
আজ বাজারটা তোমার জামাই ই করুক....., আমরা তো আছি এখন কদিন, তুমি না হয় অন্যদিন কর....
তোমার নাতনির তো স্কুল ছুটি পড়লো....আর কদিন ধরে খুব তোমার কথা মনে পড়ছিল তাই ভাবলাম একমাস না হয় থেকেই আসি তোমার কাছে....

রমেন বাবু : বাহ ভালো করেছিস....তবে তোরা ওই কোথায় সব ঘুরতে যাস ছুটিতে সেগুলোতে যাবিনা এবার আর ?

গীতা : না...না সেসব তো যেতেই থাকি....তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল তাই ভাবলাম একটু না হয় থেকেই আসি। মা তো আর নেই। এখন তো তুমিই সব।
(এই বলে একটু চোখ টা মুছে নিলো গীতা )
 
রমেন বাবু : হমম সে তো ঠিক কথাই....হঠাৎ করেই চলে গেলো তোর মা...
( রমেন বাবু একটু দুঃখী হয়ে )

গীতা : আরে বাবা রাখো পুরনো কথা....বল আর বাকি তোমার....
গঙ্গার মাকে ছাড়ালে কেন ? খাওয়া দাওয়ার তো বিশেষ যত্ন নাওনা মনে হচ্ছে....শরীরের যা হাল বানিয়েছ...
নাহ্....তোমার জামাই বাজার থেকে আসলে আমি সাফ বলে দেবো....আমার বাপের আগের চেহারা না ফিরিয়ে আমি আর যাচ্ছি না বাপু এই বাড়ি থেকে....।

রমেন বাবু : (একটি হাসলেন) আরে নানা ধুর আমার সব ঠিক ই আছে....বাবা জীবন আর অফিস থাকে.... রানী মার স্কুল আছে...তুই থাকলে হবে নাকি....না না আমি সব সামলে নেব...

গীতা : রাখো তো তোমার সামলানো.....ওসব আমি আর শুনছি না…..তুমি ই শেষ সম্বল আমাদের...না না আমি এখন নড়ছি না এখান থেকে....

রমেন বাবু : ( একটু হেসে ) কি যে করিস বাচ্চাদের মতন....

গীতা : হম.....
ও তোমায় তো বলাই হয়নি....সেদিন তোমার জামাইয়ের সাথে বিভাস কাকার দেখা...
সে তো তোমাদের জামাই কে সে জড়িয়ে ধরে বলছে শশুর লটারি পেয়েছে এবার জামাই মিষ্টি খাওয়াবে.....
কি আশ্চর্য বলতো.....আমরাতো জানিই না কিছু....

রমেন বাবু : একটু ইতস্তত হয়ে....আরে হ্যাঁ মনে তোদের আর জানানো হয়নি রে.…..এই দুদিন আগেই রেজাল্ট এলো.... ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছি ২০ লাখ টাকার.....তবে টাকাটা এখনও পায়নি...পরের মাসে লটারি অফিসার আসবে সে দেখে শুনে তারপর টাকা দেবে...
আর উফফ এদিকে এই বিভাস টাও না....ওদিকে তোর ভাই কেও বলেছে....

গীতা : ( একটু গম্ভীর হয়ে ) ও ভাই জানে...

(সুভাষের বাড়িতে.........)

সুভাষের বউ : কি গো বাবা কি বললো ? সত্যি লটারি পেয়েছে ? কত টাকার ? আমাদের কত দেবে ?

(সুভাষ কিছুক্ষন চুপ থেকে....)

সুভাষ : হম লটারি তো পেয়েছে কিন্তু......

সুভাষের বউ : কি কিন্তু ? কি বুড়ো কিছু দেবে না বলছে নাকি ? বলি হারি তোমার বাপের....আর কদিন বাঁচবে এখনও টাকা টাকা করছে....আরে তুমি তো একমাত্র ছেলে তোমায় তো সবটা দিয়ে দেওয়া উচিত। আমার মা বাবা হলে কখনোই এরম করতো না।

সুভাষ : আরে ধুর না না সেরকম কিছু না। ব্যাপারটা হলো দিদি মনে হয় ব্যাপারটা জানতে পেরেছে। জামাই বাবু কে নিয়ে বাবার কাছে পৌঁছে গেছে। এই আমি ফোন করেছিলাম তখনই ঢুকলো বাবা বললো।

সুভাষের বউ : ওমা সেকি গো.....তাহলে তো তুমি আর কিছু পাবে না। ওই মেয়ে দেখবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সবটা নিজে নিয়ে কেটে পড়বে...তুমি তো বাড়ির ছেলে। তোমার অধিকারট তো আগে হওয়া উচিত। মেয়ে তো বিয়ে দিয়ে দিয়েছে তার অধিকার আসে কোথা থেকে...!!!!!!!!

সুভাষ : হম সেটাই তো.....কিন্তু বাবাকে এসব বোঝাবে কে.....বাবাতো মেয়ে বলতে অজ্ঞান...!!!!

সুভাষের বউ : হম....সে তো ঠিকই...কি করা যায় বলতো ?????
একবার যাবে নাকি ঐ বাড়ি ? কদিন গিয়ে একটু ওই বুড়ো কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে যদি নিজের ভাগটা নিয়ে নেওয়া যায়....

সুভাষ : হম সে তো যাওয়া যায় কিন্তু তুমি যে বললে মা বাবা আসবে এই সপ্তাহে....তারা বুড়ো মানুষ আসবে কত দিন থাকবে বললো....এখন না বললে তারা কষ্ট পাবে না ???!!!

সুভাষের বউ : না না ও মা বাপিকে আমি বুঝিয়ে বলে দেবো। তুমি চাপ নিও না। চলো বরং ওই বাড়ি যাই তোমার বাপের কাছ থেকে ভাগটা বুঝে নিতে....

সুভাষ : হম সেই বরং ভালো...

(রমেন বাবুর বাড়িতে.......)

রমেন বাবু : রান্নাটা কিন্তু খাসা করেছিস মা.... পোনা মাছের ঝালটা যা সুন্দর হয়েছিল...পুরো যেন তোর মায়ের হাতের রান্না.... বাবা জীবন মাছ টাও খুব ভালো এনেছিল...

গীতা : (একটু হেসে.....) হম এবার থেকে আমি রোজই এরম রান্না করে আমার বাবাকে খাওয়াবো.....
(গীতা নিজের স্বামীর উদ্দেশ্যে....)
এই শুনে নিয়েছো তো বাবা যা যা মাছ ভালো খায়....তুমি সেগুলো সব কাল এনে দিয়ে তারপর অফিস যাবে...

(গীতার স্বামী মাথা নেরে সম্মতি জানালো....)

রমেন বাবু : আরে না না ধুর....এত ঝামেলার কি দরকার....তোরা এসছিশ দেখা করতে....এটাই অনেক আনন্দের...

( হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো.....)

রমেন বাবু : হ্যালো.....

সুভাষ : বাবা সুভাষ বলছি....বলছি শোন না....দিদিরা এসছে ওরা কি থাকবে ? 

রমেন বাবু : হ্যাঁ....তোর দিদি বললো কদিন থেকে নাকি আমার শরীর স্বাস্থ্য সব ভালো করে তারপর যাবে...এই তো খেয়ে উঠলাম...কি সুন্দর পোনা মাছের ঝাল বানিয়েছিল পুরো তোর মায়ের মতন...

সুভাষ : হম বাবা বলছিলাম যে তোমার বৌমাও বলছে ছেলের ছুটি আছে...কদিন তোমার ওখানে ঘুরে আসতে...তো কাল সকালে আমরা তিন জন আসছি....দিদির সাথেও দেখা হয়ে যাবে...

রমেন বাবু : আচ্ছা বাবা আয়...

( ফোনটা রাখলেন রমেন বাবু......)

গীতা : কি হলো বাবা ? কে আসছে ?

রমেন বাবু : আরে তোর ভাই...তুই এসেছিস শুনে ওদেরও আসার ইচ্ছে হয়েছে...কাল দাদু ভাই আর বৌমা কে নিয়ে আসছে....

( সন্ধ্যাবেলা.....)

(গীতা নিজের স্বামী উদ্দেশ্যে.....)

গীতা : ওই শুনেছ...কাল ভাই বউ ছেলে নিয়ে আসছে....

গীতার স্বামী : ব্যাস....হলো কাণ্ড....! এবার তো তোমার ভাই এসে নিজের অভাবের কান্না কাঁদবে আর তোমার বাপ সব ছেলেকে লিখে দেবে....আদরের ছেলে বলে কথা....তুমি হচ্ছো বোকা...তোমার আর কিছু জুটবে না...

গীতা : কি বলব....বাবাতো ছেলেকে যেনো চোখে হারায়....দেখি কাল যদি কিছু উল্টো পাল্টা দেখি আমি তো ছেড়ে কথা বলবো না....এই তোমার ঐ এক উকিল বন্ধু আছে না.... দরকারে তার সাথে কথা বলে রেখ....ভাগ ছাড়া যাবেনা...এখন তো আইনও বলে মেয়েরা সমান ভাগিদার বাবার সম্পত্তির...আর বলছি শোনো কাল অফিসটা ছুটি নাও কিছু দরকার পড়তে পারে কাল কেই একটা দফারফা করতে হবে...

(পরদিন সকালে সুভাষ ছেলে বউ নিয়ে হাজির....

রমেন বাবু : আয় আয় ভেতরে আয়....

সুভাষের বউ : ( রমেন বাবু কে একটা প্রণাম করে...) ভালো আছেন বাবা ? কত দিন দেখি না আপনাকে....আমি তো কত বলি চলো একটু বাবার কাছে যাই...না হয় ওনাকেই একটু নিয়ে এসো....কিন্তু এই আপনার ছেলে অফিস অফিস করেই শেষ....

রমেন বাবু : আরে বৌমা....আরে ও উচু পোস্টে চাকরি করে...ওর কি আর অত সময় আছে...উচু পোস্টে কত কাজের চাপ...

সুভাষ : ঠিক বলেছো বাবা....
(নিজের বউ আর উদ্দেশ্যে.....)
দেখো দেখলে বাবা ঠিক ছেলের অসুবিধাটা বোঝে.....

রমেন বাবু : আয় আয়.....এসব থাক আগে জল খাবার টা খেয়ে নে...তোর দিদি লুচি বানিয়েছে....

(জল খাবার খেতে খেতে....)

সুভাষ : আচ্ছা বাবা....তুমি লটারির কথাটা এদিক ওদিক বলে বেড়াচ্ছে কেনো ?

রমেন বাবু : আরে আমি কাউকে বলিনি....তোর বিভাস কে বলেছিলাম ব্যস্ ও সব জায়গাতে বলে বেড়াচ্ছে.....

সুভাষ : আরে তুমি আমাদের না বলে বিভাস কাক কে বলতেই বা গেলে কেন... জানোইতো লোকজোন কেমন....একলা থাকো...রাত বিরেতে কোনো বিপদ হতেই তো পারে.... চোর ডাকাতের কি অভাব বলতো....!!!!!

গীতা : হম বাবা ভাই এর কথা টা কিন্তু ঠিক....এত গুলো টাকা তোমার কাছে থাকা কিন্তু ঠিক না।

সুভাষ : বাবা বরং একটা কাজ করতে পারো...তুমি আমার ব্যাংকে রেখে দাও...তোমার যখন লাগবে আমি তুলে দিয়ে দেব....

গীতা : না সে তো তুমি চাইলে তোমার জামাইয়ের ব্যাংকেও রেখে দিতে পারো...তোমার লাগলেই আমি তুলে তোমায় দিয়ে যাবো...। তোমার জামাইতো ব্যাংকেই চাকরি করে....কোনো অসুবিধাই হবে না....বল তাহলে বলবো কি তোমার জামাই কে....

( টাকা হাত ছাড়া হচ্ছে দেখে সুভাষ তাড়াতাড়ি বলে উঠলো......)
সুভাষ : আরে না না....জামাই বাবু কে কষ্ট করার কি আছে....আমার তো সরকারি ব্যাংকেই অ্যাকাউন্ট আছে....আর আমার পোস্টিং টাও এবার চেঞ্জ হয়ে আমাদের পাড়ার কাছেই হবে...
( গীতার উদ্দেশ্য....)
তোদের অত দূর থেকে হুটহাট করে আসতে অসুবিধা হবে....
তার চেয়ে বাবা তুমি আমার অ্যাকাউন্টই টাকাটা রেখে দাও...

রমেন বাবু : দেখ রাখা তো যে কারুর কাছেই রাখা যায়....কিন্তু দেখ কথা টা হলো...আমি এখনও কিছু ভাবিনি....তোরা আছিস তো.... থাক কদিন আমি একটু ভাবনা চিন্তা করি....তারপর না হয় একটা কিছু ঠিক করা যাবে....

সুভাষ : আচ্ছা বাবা লটারিটা কোথায় রেখেছে ? মনে যত্ন করে রেখেছ তো ? এদিক ওদিক না হয়ে যায় আবার....

রমেন বাবু : (একটু হেসে.......) দাড়া একটা জিনিস দেখাই....
এই বলে ভেতরে নিজের ঘর থেকে একটা ছোট্ট লোহার সিন্দুক নিয়ে এলেন....

সুভাষ : এটা কি বাবা ? 

রমেন বাবু : এটার মধ্যেই আছে লটারি....আর এর চাবি থাকে আমার কোমরে বাঁধা...তাই এদিক ওদিক হবার কোনো সুযোগ নেই....

(এই দিনের পর থেকে শুরু হলো রমেন বাবুর সেবা পাবার পালা...বৌমা আর মেয়ের সেবার চোটে রমেন বাবুর জীবন কালেই স্বর্গ দর্শন হবার জোগাড় হল....
এত সেবা বহুকাল জোটেনি রমেন বাবুর...সুভাষ আর গীতার মা বেচেঁ থাকা কালীন এরম আদর যত্ন হতো তার। কিন্তু সে গত হবার পর...খুব কষ্টেই দিন কাটছিল তার....কিন্তু আবার বহুকাল পর মেয়ে, জামাই , ছেলে বৌমা সবার এত সেবা যত্ন পেয়ে সত্যি তার মন আনন্দে ভরে উঠলো...তার উপর নিজের দুই নাতি নাতনির কাছ থেকে দাদু ডাক আর তাদের সাথে খেলা করার আনন্দ সব মিলিয়ে রমেন বাবুর খুশির আর শেষ ছিল না....
এরম তাই তো সে চেয়েছিল...অবশেষে এই লটারির জোরে তার ইচ্ছে পূর্ণ হলো..
এভাবেই দেখতে দেখতে প্রায় এক মাস কেটে গেল.....)

( হঠাৎ একদিন সকালে রমেন বাবু কে অনেক বেলা অবদি শুয়ে থাকতে দেখে সুভাষ আর গীতার একটু সন্দেহ হলো....
বাইরে থেকে অনেক ডাকা ডাকির পরও কোনো ফল না পেয়ে বাধ্য হয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখে বিছানায় পড়ে রয়েছে রমেন বাবুর নিষ্প্রাণ দেহটা...
হ্যাঁ রমেন বাবু ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন....)

সুযোগ বুঝে তাড়াতাড়ি সুভাষ কোমর থেকে চাবিটা বার করে সিন্দুকটা খুলতে গেল....

(গীতা অমনি গম্ভীর সুরে তার ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো....)

গীতা : দাড়া.....ওই সিন্দুক খুলে তুই কি ভাবলি ওই টাকা একা তুই নিবি....শুনে রাখ ওই টাকা যদি সমান ভাগ না হয় তাহলে আমি এখুনি পুলিশ ডেকে বলবো টাকার লোভে তুই আর তোর বউ মিলে বাবাকে খুন করেছিস....

সুভাষ : সেই.....তুই বলার কে রে......বিয়ে করেছিস....শশুর বাড়ী সামলা.....এখানে এসব নাক গলাতে আসিস না...

গীতা : গলাবো....একশো বার গলাব....আমার বাপের টাকা...আমি ছাড়বো না...
( নিজের স্বামীর উদ্দেশ্যে গীতা....)
এই তুমি পুলিশকে ডাকোতো...আর তোমার ঐ উকিল বন্ধুকেও ডাকো...দেখি আজ কি করে কেউ আটকায় আমায়....

(অবস্থা বেগতিক দেখে সুভাষের বউ বললো....)

সুভাষের বউ : আরে দিদি তুমি রাগ করছো কেন...? 
( স্বামীর উদ্দেশ্যে....)
এই শোনো বলি কি এসব না করে টাকাটা অর্ধেক করে নিলেই তো হল....১০ লাখ টাও তো কম নয়....থানা পুলিশ করলে শেষে কারুরই কিছু জুটবে নাহ্।

গীতার স্বামী : কথাটা কিন্তু ঠিকই.....থানা পুলিশ করলে কারুরই কিছু জুটবে না। তারচেয়ে অর্ধেক করে নাও...

গীতা : ঠিক আছে আমি রাজি...

সুভাষও কোনো উপায় না দেখে শেষে রাজি হলো....

(এবার গীতা সুভাষ কে বললো.....)

গীতা : ঠিক আছে তাহলে এবার খোল সিন্দুকটা....

ধীরে ধীরে সিন্দুক টা খোলা হলো.....
প্রত্যেকের চোখ গুলো যেন লোভে জ্বলজ্বল করছিল....
কিন্তু তার মাঝেও দুঃখে কান্নায় দুটো চোখ ছলছল করছিল.....আর বারবার তার জিজ্ঞাস করে যাচ্ছিল তাদের দাদু কেনো কথা বলছে না....
কিন্তু লোভের আলোতে আলোকিত চোখগুলোর সামনে এই দুটি শিশুর দুঃখের কোনো মর্যাদা হয়তো সেদিন ছিল না।

কিন্তু একি.....সিন্দুক খুলে যেনো বজ্রাঘাত নেমে এলো সবার মাথায়....কোথায় লটারি.....!!!!!!!!
কোনো লটারি নেই....শুধু হাতে লেখা একটা চিঠি..!!!!!

সুভাষ চিঠিটা পড়ে.....মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো.....
সুভাষের বউ : কি হলো দাড়িয়ে রইলে কেনো ? চিঠিতে লিখেছে নাকি কোথায় লটারি ? দাও দাও আমি পড়ছি....
( এই বলে সুভাষের হাত থেকে এক টান মেরে চিঠি টা নিয়ে পড়া শুরু করলো....)

আদরের সুভাষ আর গীতা....

তোরা যখন এই চিঠিটা পড়ছিস আশা করি আমি তাহলে আর বেচেঁ নেই....দেখ আমি জানি তোরা খুব আশা করে ছিলিস যে বুড়ো বাবার থেকে যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়.... দেখ আমি কোনো লটারি পাইনি....কিছু সপ্তাহ আগে একদিন হটাৎ করেই আমি রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে যাই...তখন তোদের বিভাস কাকাই আমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়...ডাক্তার দেখে বলে আমার ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে...লাস্ট স্টেজ...খুব বেশি হলে ১ মাস হয়তো আর বাঁচবো...বিভাস বলেছিল তোদের খবরদি কিন্তু আমি জানি তোরা আসবি না...তুই তোর বড়লোক শশুর নিয়ে ব্যস্ত আর তোর দিদি নিজের শিক্ষিত বড়লোক স্বামী নিয়ে। তাই এই বুড়ো বাপের জন্য তোদের কারুরই সময় হবে না সেটা আমি ভালো ভাবেই জানি। আর তাই বিভাসকে সবটা বলি....আর তাই তোদেরকে কয়েকটা দিন আমার সাথে রাখার জন্য বিভাস এই নাটকটা করে....আর জীবনের শেষ কটা দিন এই ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি বৌমা জামাই নিয়ে কাটানোর লোভটা আমি সামলাতে পারিনি রে তাই আমিও রাজি হয়ে গেছিলাম। তোরা পারলে আমায় ক্ষমা করিস। আর আমার বিছানার তলায় দু হাজার টাকা রাখা আছে...ঐটা দিয়ে একটি আমার শ্রাদ্ধশান্তি টুকু করে দিস...তোরা ভালো থাকিস...আমার আশীর্বাদ সবসময় তোদের জন্য রইলো...
                        ইতি 
              তোদের বুড়ো বাবা



গল্প : লটারী
লেখক : সুদীপ দে