Saturday, December 14, 2024

একটি ভৌতিক রাত

অনেকদিন পর মামার বাড়ির চিঠি পেয়ে বেশ অবাকই হলো রমেন। তার মার মৃত্যুর পর এই প্রথম মামা বাড়ির চিঠি পেল রমেন। সামনের সপ্তাহে তার মামাতো বোনের বিয়ে। অনেক বছর মামা বাড়ি যায়নি সে তাই এইবার তার মামাতো বোনের বিয়েতে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো সে। রমেন চিঠিতে দেখল আগামী সপ্তাহে বুধবার তার বোনের বিয়ে। মঙ্গলবার অফিস করে সন্ধ্যের ট্রেনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো সে।
সকাল সকাল বসকে সবটা বলাতে ছুটি মঞ্জুর হলেও কাজ সেরে অফিস থেকে বেরোতে বেশ দেরি হয়ে গেল রমেনের। অগত্যা ট্রেন পেতে পেতে অনেক রাত হয়ে গেল রমনের।  রাত্রি ১০:৩০ নাগাদ জগদ্দলপুর স্টেশনে নামল রমেন। স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে সে জানতে পারলো যে আজ বিকালে একটি বাস এক্সিডেন্ট হওয়াতে এই রাস্তার সমস্ত বাস চলাচল বন্ধ আছে। এই শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল সে, একে এত রাত তার উপর শীত কাল, সে মনে মনে ঠিক করল স্টেশনের কাছে কোন থাকার ঘর পেলে একটা রাত কাটিয়ে কাল ভোর মামার বাড়ি রওনা দেবে। তবে তার এই পরিকল্পনা কিন্তু কাজে এলোনা। অনেক খুঁজেও একটা থাকার জায়গা জোগাড় করতে পারল না রমেন। এদিকে রমেনকে ব্যস্ত হয়ে এদিক ওদিক ছুটতে দেখে এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাস করলেন " কি দাদা ? নতুন নাকি ? এরম রাত্রি বেলা এদিক ওদিক করছেন ? কোন বিপদে পড়েছেন নাকি ? "

"আরে দাদা আর বলবেন না, মামাতো বোনের বিয়েতে যাব বলে কলকাতা থেকে আসছি, কিন্তু ট্রেন মিস করায় আসতে দেরি হল, এখন দেখছি বাস বন্ধ তাই ভাবছিলাম যদি একটা থাকার জায়গা পাওয়া যায় তবে রাত টুকু কাটিয়ে কাল সকালে মামা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেব"  উত্তর করলো রমেন।

"এই অজ পাড়াগাঁয়ে আর কি হোটেল আছে দাদা যে আপনি থাকার জায়গা পাবেন" হাসতে হাসতে বলল ভদ্রলোক।


"হুম....তবে এই শীতের রাতে বাইরে থাকলে তো আর দেখতে হবে না...." বলল রমেন।

"তবে কোথায় আপনার মামার বাড়ি" জিজ্ঞাস করলো ভদ্র লোকটি।
রমেন উত্তর দিলো " মোশাটপুর গ্রামে"


" মোশাটপুর.....হুম...উপায় দাদা একটা আছে,...তবে..." বলল ভদ্রলোকটি।

"কি উপায় বলুন...থামলেন কেন...?" জিজ্ঞাস করলো রমেন।

" না আসলে এই ডান দিকের রাস্তাটা দেখছেন, এই রাস্তাটা দিয়ে সোজা এক কিলোমিটার গিয়ে বাঁদিক ঘুরলেই একটা শ্মশান আছে, তার পাশ দিয়ে সোজা গেলে সামনে একটা সাঁকো পার করে ওপাশে গেলেও মোশাটপুর গ্রাম। আপনার হেঁটে যেতে হয়তো খুব জোর ঘণ্টা খানেক লাগবে" বলল ভদ্রলোক।

" বাহ, তাহলে তো ভালই হল" বলল রমেন।

" না দাদা তবে একটা গণ্ডগোল আছে, আসলে আপনার পথে যেতে যে শ্মশানটা পড়বে তার খুব বদনাম আছে, রাত্রি ছাড়ুন দিনের আলোতেও কেউ ঐ রাস্তা দিয়ে যায়না......" বলল ভদ্র লোকটি।

" ধুর দাদা, আপনি আজকের দিনে আবার এসব নিয়ে পড়েছেন। ধুর ওসব কিছু হয়না, আমি ঐ রাস্তা দিয়েই যাব। রাস্তা বলার জন্য অনেক ধন্যবাদ দাদা" এই বলে সেই ভদ্র লোকের বলা রাস্তায় হাঁটা শুরু করলো রমেন।

শীতের রাত্রি চারদিক যেন নিস্তব্দ। চারিদিক যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে গেছে। তবে সেই অন্ধকারেই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল রমেন। অবশেষে সে শ্মশানের ধারের রাস্তায় পৌঁছালো। তবে তার কিন্তু এতে কোন ভয়ের কিছু লাগলো না। গ্রামের শ্মশান সে আগেও দেখেছে তাই তার কাছে এটা নতুন কিছু না। তবে ঠান্ডাটা যেন একটু বেশিই লাগছে এখানে রমেনের। ইস আরো একটা সোয়েটার পড়ে আসা উচিত ছিল তার, এসব দিকে ঠান্ডা বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক, এসব ভাবছিল হঠাৎ পাশে একটা ছোট গুমটির দিকে চোখ গেল রমেনের।

এই নিঝুম নির্জন অন্ধকারের মধ্যে এরম একটা গুমটি এই ভেবে বেশ আশ্চর্যই হল রমেন।
আসতে আসতে গুমটির কাছে এগিয়ে গেল রমেন।
ভেতরে এক মধ্য বয়সী ছেলে কম্বম মুড়ি দিয়ে বসে আছে। রমেন ভেতরে উকি মারতেই ছেলেটি জিজ্ঞাস করে উঠল " কিছু চাই নাকি ? "
" একটু গরম কিছু খাবার পাওয়া যাবে ? ঠাণ্ডায় একদম জমে গেছি দাদা " বলল রমেন।

"চা পাবেন" কম্বলের ভেতর থেকেই বলল ছেলেটি।
" ঠিক আছে এক কাপ চা দিন তাই খাই " এই বলে গুমটির ভেতর ঢুকে বসলো রমেন।
ভেতরে ঢুকে যেন একটু শান্তি পেল রমেন। ঠান্ডা যেন তার হাড়ের মধ্যে ঢুকে কাপিয়ে দিছিল। 
"এত রাতে এদিকে কি করতে ? " হঠাৎ জিজ্ঞাস করলো গুমটির ছেলেটি
প্রশ্নটা শুনে তার দুর্ভাগ্যের কথা সবটা সে বলল এবং কিভাবে বাসস্ট্যান্ড থেকে এই রাস্তার সন্ধান পেয়ে এদিকে এলো সবটাই বলল সে।

এবার রমেন একটা কথা না জিগ্যেস করে পারল না " আচ্ছা বলছি দাদা বাসস্ট্যান্ডে শুনলাম এই রাস্তার শ্মশানটা নাকি ভাল না, রাত ছাড়ুন দিনের বেলাতেও নাকি কেউ এই মুখো হয়না। তাহলে এই নির্জনে আপনি দোকান খুলে কেন রেখেছেন? আর এই শ্মশানেরই বা এতো বদনাম কেন ?"

" এই শ্মশান চিরকাল এরম ছিল না। আজ থেকে বছর তিন আগে এই গ্রামে খুব খরা দেখা দেয়। কৃষকরা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে ওঠে। এই ঋণের বোঝা না সইতে পেরে এক কৃষক এই শ্মশানের মাঝের একটা বট গাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। প্রথমটা তেমন অসুবিধা না হলেও কিছু দিন পর থেকে গ্রামে বিভিন্ন ভৌতিক কাণ্ড ঘটতে থাকে। এই রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় কখন কারোর মুরগি গায়েব হয় তো কখন কারুর একটা আস্ত পাঠা। কেউ কেউ তো শ্মশানের চারিদিকে এক কঙ্কাল মূর্তিকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে বলেও দাবী করে উঠল। এরপর গ্রামে রোটে গেল যে এই শ্মশানে ভূতের ডেরা হয়েছে। ধীরে ধীরে এদিকে মানুষের আসা বন্ধ হয়ে গেলো। এভাবে বেশ কিছু দিন চলার পর একদিন গ্রামের এক ছোকরা বন্ধুদের সাথে শর্ত লাগিয়ে এই শ্মশানে রাতে থাকবে বলে আসে, কিন্তু পরের দিন সকালে তার অচৈতন্য দেহ শ্মশানের সামনে পরে থাকতে দেখা যায়। গ্রামের লোকেরা দেখতে পেয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু আসল গণ্ডগোল শুরু হয় এরপর থেকেই। ছেলেটির বাড়িতে এবার অদ্ভুত সব কাণ্ড শুরু হয়। ছেলেটির দাদা একদিন মাঝ রাতে ছেলেটিকে গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে দেখে এবং সাথে বিকট ভাবে হাসতে দেখে। এই দৃশ্য দেখে সে ভয় পেলেও সে বাড়িতে কিছু বলে না তবে সে নিজের ভাইয়ের প্রতি নজর রাখতে শুরু করে। আর একদিন রাতে সে দেখে তার ভাই বারান্দা থেকে হাত বাড়িয়ে পাশের বাড়ির উঠোন থেকে একটা জ্যান্ত মুরগি তুলে এনে এক কামড়ে মুরগির মাথাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল, এর পর ধীরে ধীরে মুরগির কাঁচা মাংস খেতে শুরু করল। এবার ছেলেটির দাদা বুঝতে পারল যে তার ভাই নিশ্চই কোন অপদেবতার কবলে পড়েছে। সে তার মার সাথে কথা বলে পাশের গ্রাম থেকে এক নাম করা ওঝা কে ডেকে নিয়ে এল।
ওঝা সব কিছু দেখে ছেলেটির দাদাকে কিছু জিনিস আনতে বলল এবং  বাড়ির উঠানে একটি যজ্ঞ করবে ঠিক করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটির দাদা সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হল। ইতি মধ্যেই ঘটনাটি পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে এসে বাড়ির সামনে ভিড় করেছে। ধীরে ধীরে ওঝা যোগ্য শুরু করলো। কিছুক্ষণ পরেই একটা আধ খাওয়া মরা কাক নিয়ে হাজির হল ছেলেটি। খনা গলায় বলে উঠল " কে তুই ? এই বাড়িতে কি করছিস ? বেরিয়ে যা এই বাড়ি থেকে.....নয়তো শেষ করে দেব..."

" আমি তোকে নিয়ে যেতে এসেছি.....কে বল তুই ? এই বাচ্চাটা কি ক্ষতি করেছে তোর ? ছেড়ে দে ওকে " এই বলে ওঝা হাতে একটি জল নিয়ে মন্ত্র পড়ে ছিল ছেলেটার দিকে।

অমনি সে বাবাগো, মা গো বলে চিৎকার করে উঠলো। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর অবশেষে ওঝা সেই প্রেতাত্মাকে একটি কাঁচের বোতল বন্দি করে। এই দেখে গ্রামের সবাই খুশি হয়ে ওঝা কে ধন্য ধন্য করতে থাকে।
তবে ওঝা এবার বলে যে এই বোতল টিকে সেই শ্মশানে গিয়ে মাটি খুড়ে সেই মাটিতে পুঁতে ফেলতে তবে সেটা যেন এই ছেলের সাথে রক্তের সম্পর্ক আছে এরম কেউ করে। তবে হ্যা কোন ভাবে এর আগে যদি এই বোতল ভেঙে গিয়ে এই প্রেতাত্মা মুক্তি পায় তাহলে কিন্তু সে বদলা নেবে এবং তখন আর কিছু করার থাকবে না।
তখন ছেলেটির দাদা সেই বোতল নিয়ে এই শ্মশানে পুঁতে আসবে বলে ঠিক করে। কিন্তু তার মা তাকে অনেক আটকানোর চেষ্টা করে এই বলে যে তাদের দুই জন বাদে তার আর আছে কে......এই বিপদে সে কিছুতেই তাকে যেতে দেবে না। স্বামীকে হারিয়েছে অনেক আগেই..... ছেলেদের হারাতে সে পারবে না। বরং সে নিজেই যাবে শ্মশানে, কিছু হলে তার হবে....তার দুই ছেলেতো সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু সে তার মার কথা শোনেনা.....সে জোর করে বোতলটি নিয়ে শ্মশানে পথে হাঁটা দেয়.... " এই বলে একটু থামল সেই গুমটির ছেলেটি।

"থামলে কেন ? কি হল তারপর ? এখানেই শেষ ? সেই ছেলেটার দাদার কি হল ?" বেশ কৌতূহলের সাথেই জিজ্ঞাস করলো রমেন।

একটু হেসে ছেলেটি বলল " না দাদা এখানে শেষ নয়...."
" সেই ছেলেটার দাদার.......ভাগ্য প্রসন্ন ছিলনা তার....শ্মশানে এসে তাড়াহুড়োতে তার হাত থেকে বোতলটি পরে যায়.....সাথেই গগনভেদী বিকট হাসিতে কেঁপে ওঠে পুরো শ্মশান আর সাথে সাথেই শোনা যায় এক তীব্র আর্তনাদ......" বলল গুমটির ছেলেটি।

" সেই ছেলেটার দাদা আর ফিরল না তাহলে   ? " জিজ্ঞাস করলো রমেন।

" না ফিরলো তো.....সেই দিন রাতের বেলায় ফিরে এসেছিল সেই ছেলেটির দাদা....মা আর ভাই ছুটে গিয়েছিল....
দাদা দাদা বলে জড়িয়ে ধরেছিল তার ভাই তাকে....তার মাও ছেলে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল।
.তবে সেই দিনের পর থেকে কেমন যেন উধাও হয়ে গেল সেই পরিবারটা....আর কোন খোজ পাওয়া যায়নি....."

" আচ্ছা সেই পরিবারটির কোন খোজ পাওয়া যায়নি, পুলিশ কিছু করতে পারেনি ? আচ্ছা একটা কথা বলুন...সে বোতলটা ভেঙে গেলে ওঝার কথা অনুযায়ী সেই প্রেতাত্মা বদলা নিতো তাহলে বোতল ভাঙার পরও সেই ছেলেটির দাদা বেঁচে ফিরলো কি করে....." জিজ্ঞাস করলো রমেন।

" বেঁচেতো সে ফেরেনি দাদা.....সেদিন বোতল ভাঙার পর এই শ্মশানেই সেই ছেলেটির দাদা ঘাড় মটকে মেরে ফেলে সেই প্রেতাত্মা তারপর সেই মৃত শরীর দখল করে সেই পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে নিজের বদলা পূর্ণ করে। " উত্তর করলো গুমটির ছেলেটি।
" সেকি তাহলে তো আপনি জানেন যে সেই পরিবারটি এর বেঁচে নেই.....তাহলে নিখোঁজ বলছিলেন কেন....আচ্ছা আপনি এত কিছু জানলেন কি করে ??? " বেশ কৌতূহলের সাথেই জিজ্ঞাস করলো রমেন।

" আসলে দাদা সেই প্রেতাত্মা নিজের বদলা পূর্ণ করেও শান্তি পায়নি......মানুষের শিকার তার কাছে একটা নেশাতে পরিণত হয়েছে। এবং সে আজও এরম রাতের বেলায় নিজের শিকার খুঁজে বেড়ায়...." বলল গুমটির ছেলেটি।

এবার রমেন একটু আশ্চর্য হয়ে বলল " সে তো বুঝলাম কিন্তু তুমি এত কিছু জানো কি করে...... আর সত্যি যদি সেই প্রেতাত্মা শিকার খুঁজে বেড়ায় তাহলে তুমি এখানে দোকান কেন খুলে রেখেছ ? "

এবার ছেলেটি কম্বলের মধ্যে দিয়ে একটা বিকট হাসি হেসে বলল " আমি সবটা জানব না তো কে জানবে.....আর দোকান....কোথায় দোকান....যেখানে আপনি বসে আছেন সেটা একটা আধ জ্বালা চিতা......আর আপনি আজ রাতের শিকার....."

রমেন আশ্চর্য হয়ে এদিক ওদিকে দেখতেই তার শিকদারা বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল....সত্যি কোথায় গুমটি....কোথায় রাস্তা.....অন্ধকার শ্মশানে একটা আধ পোড়া চিতার উপর বসে সে....আর সামনে একটা নর কঙ্কাল....যার চোখ দিয়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে আগুন.....আর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সে....সে প্রাণপণ চেষ্টা করল পালানোর কিন্তু কোন জাদু বলে তার সমস্ত হাত পা যেন অসার হয়ে গেছে। সে কিছুতেই যেন নড়াচড়া করতে পারছে না.....আর সামনে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সে কঙ্কাল মূর্তি...আর সাথে এক বিকট হাসি....রমেনের মাথা যেন বনবন করে ঘুরতে লাগল....ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে এলো রমেনর....শুধু কানে ভেসে আসতে লাগল এক ভয়ানক হাসি...

পরদিন সকালে গ্রামের কিছু ছেলে মিলে রমেনের অচৈতন্য দেহটা শ্মশানে পাশের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে। তার গা থেকে কিছু কিছু জায়গার মাংস খুবলে খাওয়া...গ্রামবাসীরা শিয়ালের কাজ ভেবে রমেনকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যায়...তিন দিন পর রমেনের হুস আসলে ডাক্তার তাকে সমস্ত ঘটনা বলে...তবে সেদিন রমেনও শিকার করেছিল যে তার উপর শিয়ালের আক্রমণই হয়েছিল। 
তবে সত্যিটা শুধু রয়ে গেছিল রমেনের স্মৃতিতে....আজও মাঝে মধ্যে ঘুমের মধ্যে রমেন দেখতে পায় সেই জ্বলন্ত চোখ গুল যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে....এর সাথে ভেসে আসছে এক বিকট হাসি...........।



Monday, November 25, 2024

মারিচ পুরের মরীচিকা

সকাল সকাল ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গলো সুমনের।
উফ কি ভয়ানক স্বপ্ন.......ঘামে পুর জামাকাপর ভিজে গেছে সুমনের।
পাশে বাজতে থাকা ফোন টার দিকে ছখ গেল সুমনের।
সুবীর ফোন করেছে। হাতে নিএয়া ফোনটা রিসিভ করতেই অপাস থে সুবীর বলে উঠল
" কি রে উঠেছিস ? কখন থেকে ফোন করছি...।। রেডি হয়ে নে তাড়াতাড়ি। শিয়ালদা থেকে 7:30 এর ট্রেনটা ধরবো কিন্তু দেরি করিস না, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি তোর রুমে।"

উত্তরে শুধু "হুম" বলেই ফোন রাখলো সুমন।

বিছানায় বসে বসে কাল রাতের স্বপ্নটা নিয়ে ভাবল সুমন, " হঠাৎ কেন এরম একটা স্বপ্ন দেখল সে, না হয়ত কাল জঙ্গল আর বাঘ নিয়ে এতো আলোচনার জন্যই হয়ত এরম ভুলভাল স্বপ্ন দেখেছে সে...।"

আসলে এই শীতে ওদের সুন্দরবন যাবার প্ল্যান ঠিক হয়েছে। আজ থেকে এক বছর আগে মেডিকেল কলেজ ডাক্তারি পড়তে এসে আলাপ হয় দুজনের। তখন থেকেই দুজনে যেন এক আত্মাপ্রাণ। এই শীতে ঘুরতে যাবার কথা উঠতেই হঠাত্ই সুন্দরবন যাবার কথাটা বলে বসলো সুবীর। সুমনও কখনও সুন্দরবন যায়নি, শুধু তার দাদুর কাছে গল্প শুনেছে তাই সুবীরের সুন্দরবন যাবার প্রস্তাবে সাথেসাথেই রাজি হয়ে গেলো সুমন। সুবীর অনেক দেখে শুনে সুন্দরবনের মারিচপুর গ্রামে যাবার কথা বলল, ওখানে সরকার থেকে টুরিস্টদের জন্য ক্যাম্প করেছে, বেশ ভালো ঘোরার জায়গা আছে, ভাগ্য ভালো হলে বাঘের ডাকও শোনা যায়, অনেক ভ্বসে...।"  দেখেছে সুবীর। আর সরকার থেকে ক্যাম্প করাতে খরচটাও বেশ কম তাই দুই বন্ধুতে মারিচপুর যাবারই সিদ্ধান্ত নিলো।

"কিরে রেডি হলি ?" এই বলে গেট খুলে ঘরে ঢুকলো সুবীর।
"হ্যা রে এই জুতো পড়ছিলাম, চল" বলল সুমন।
 দুই বন্ধুকে রওনা দিলো শিয়ালদা স্টেশনের দিকে। দুটো ক্যানিং এর টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়ল তারা। ভাগ্যক্রমে জানলার ধারে সিটটাও পেয়ে গেল দুজনে।
"কিরে কেমন লাগছে ?" প্রশ্ন করলো সুবীর
" কেমন এর লাগবে, এই তুই সব বুকিং গুলো করে নিয়েছিলিস তো ? " জিজ্ঞাস করলো সুমন।
"হ্যা রে ক্যানিং নামবো ওখান থেকে টোটো করে পুরো স্পটে চলে যাওয়া যাবে, আমি ভ্লগে সবটা দেখে নিয়েছি, তুই চিন্তা করিস না" বলল সুবীর।

ধীরে ধীরে ট্রেন এগিয়ে চলল, আর সাথে এগিয়ে চলল দুই বন্ধুর কথা বার্তা। কলেজের কথা থেকে ছোট বেলায় শোনা সুন্দরবন সর্ম্পকের গল্প সবই আলোচনা হতে লাগলো।

সুমন মনে মনে একদুবার রাতের স্বপ্নটার কথা সুবীরকে বলবে ভাবল, কিন্তু বললে সুবীর হয়ত আবার তার হাসি ওড়াবে, ভাববে হয়ত সে ভয় পেয়েছে, না না এসব বলে হাসির পাত্র হয়া যাবে না কোন ভাবেই, একটা ভুলভাল স্বপ্নকে এতো গুরুত্ব দিলে হবে নাহ......।" এসবই মনে মনে ভাবছিল সুমন হঠাৎ প্রশ্ন করলো সুবীর "এই বাঘ দেখার প্ল্যান করবি ?" 

" বাঘ দেখা মানে? তুই কি জঙ্গলে ঢোকার প্ল্যান করছিস নাকি ? ভাই ওগুলো কিন্তু অ্যালাও করে না শুনেছি, বেকার পুলিশ কেস কিছু হলে তখন প্রবলেম হবে, আমি তো বাড়িতেও বলিনি যে সুন্দরবন আসছি " বলল সুমন।

" আরে শোন না কোনো কেস হবে না, আমি প্ল্যান করেছি বিশ্বাস কর চাপ হবে নাহ, নৌকায় করে রাত্রি বেলায় বেরোবো, নদীর খারি ধরে নিয়ে যাবে, বাঘ আসে ওই টাইমে আর যদি না আসে তাহলে এমনিও রাতের বেলায় নৌকায়, ব্যাপারটা মন্দ হবে না কিন্তু" বলল সুবীর।

" কিন্তু সেসব পাবি কোথায় ? " জিজ্ঞাস করলো সুমন।

" সে চিন্তা করিস না, আমি ভ্লগে দেখছিলাম ওখানে খোজ নিলেই এগুলো ম্যানেজ হয়ে যায়, ওসব তুই চাপ নিস না আমি ব্যবস্থা করে নেবো " বলল সুবীর।

" তবে ভাই তুই বাড়িতে জানালি না কেন যে তুই সুন্দরবন যাচ্ছিস ? " জিজ্ঞাস করলো সুবীর।

" আরে সে আর বলিস না, আমাদের বাড়িতে সুন্দরবন যাবার নাম শুনলেই সবার মুখ চোখ বেকে যায়, ওখানে গেলেই নাকি বাঘের খপ্পরে পড়ে বিপদ হবে তাই ওসব জাগাতে যাওয়া যাবে না, তবে আমার ঠাকুরদা বেঁচে থাকতে অনেক গল্প শুনেছি ঠাকুরদার কাছে, এই মারিচপুরেই নাকি একবার আমার ঠাকুরদা এসছিলেন একটা কাজে " বলল সুমন।

" সেকি তোর ঠাকুরদা এখানে কাজে এসছিল, তাহলে তো গল্প জমে যাবে, তোর ঠাকুরদা তান্ত্রিক ছিল তো, তার কাজ মানে তো নিশ্চই কোন ভৌতিক কাণ্ড, ব্যপক ব্যাপার ভাই, বল বল কি কেস ? " বেশ কৌতূহলের সাথেই জানতে চাইলো সুবীর।

" থাক আর গল্প তোর শুনে কাজ নেই, ওই দেখ ক্যানিং ঢুকছে, চল নামতে হবে " বলল সুমন।

" সে নামতে হবে কিন্তু ভাই গল্পটা কিন্তু বাকি রইলো, রাতে নৌকায় কিন্তু শোনাতে হবে, বাঘ না পাই তোর ঠাকুরদার ভূতের গল্পই না হয় এনজয় করবো " হাসতে হাসতে বলল সুবীর।

অবশেষে বেলা 11টা নগদ দুই বন্ধুতে মারিচপুর গ্রামের ট্যুরিস্ট ক্যাম্পে পৌঁছালো। বেশ ভালই ব্যবস্থাপনা। সরকারি ক্যাম্প বলে কোনো খামতি নেই। সুবীর কাউন্টারে গিয়ে বুকিং এর টোকেনটা দেখাতেই একটা সুন্দর রুম পাওয়া গেলো।

" ওই চট জলদি তুই ফ্রেশ হয়ে নে, আর আমি এদিকে একটু দেখি রাতের ব্যাপারটা কি ব্যবস্থা করা যায় " এই বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সুবীর।
বেশ কিছুক্ষণ পর সুবীর ফিরে আসলো। ওর মুখের প্রসন্নতা দেখেই সুমন আন্দাজ করেছিল যে যেই কাজের জন্য সুবীর গেছিল সে কাজ তার হয়েছে।
" রাতের নৌকা কত নেবে বলল ? " জিজ্ঞাস করলো সুমন।

এবার একটু মুচকি হেসে সুবীর বলল " বুকিং হয়নি কিন্তু ভাই খোজ পেয়েছি, যা বুঝলাম এই মারিচপুর গ্রামের দক্ষিণ দিকে একদম শেষ প্রান্তে একটা খাড়ি আছে, সেখানে কেউ খুব একটা যায় না। রাতের বেলা 9টা 10টা নাগাদ ওখানে গেলে নৌকার মালিককে 1000 - 1200 দিলেই সে রাজি হয়ে যায়, আমি জায়গাটা বুঝে নিয়েছি, এখন চল লাঞ্চটা সেরে রেস্ট করেনি, রাতে বেরোতে হবে।"


যেমনি ভাবা তেমনি কাজ, তাড়াতাড়ি ডিনার করে রাত 10টা নাগাদ সুবীর সুমনকে নিয়ে হাজির হলো সেই গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের নির্জন খাড়ীর ধারে, কিন্তু আজ কোনো নৌকা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন কি করবে মনে মনে ভাবছিল দুজনে, হঠাতই দুর থেকে একটা নৌকা দেখা গেলো।

" ও মাঝি যাবে নাকি ? " চিৎকার করে জিজ্ঞাস করলো সুবীর।

"কত দূর ?" উত্তর এলো
" আরে তুমি পারে এসো বলছি " বলল সুবীর।
ধীরে নৌকাটা পারে এসে দাড়ালো।
"কত দূর যাবে বাবু ?" শালে মোড়া এক মানব আকৃতির ভেতর থেকে প্রশ্ন এলো।
" যাবো বলতে, একটু বাঘ দেখাতে নিয়ে যাবে ? ভালো টাকা বকশিস দেব। কলকাতা থেকে এসছি বাঘ দেখব বলে, একটু নিয়ে চলনা...." বেশ অনুরোধের সুরেই বলল সুবীর।

বেশ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এলো না।
" এ মনে হয় যাবে না ভাই, ছাড় ফেরত চল, " ফিশ ফিশ করে বললো সুমন।
মনে হলো লোকটা যেন সুমনের কথার উত্তরেই বলে উঠলো " যাবনা তো বলিনি"।

" এই যাবে রাজি হয়েছে, চল চল ওঠ তাড়াতাড়ি" এই বলে ঝটপট নৌকায় উঠে গেলো সুবীর, সুমনও পেছন পেছন উঠে এলো নৌকায়।
ধীরে ধীরে পার ছেড়ে এগিয়ে চলল নৌকা।

পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় রাতটা আজ মন্দ লাগছিল না সুমনের।
" ও দাদা বলছি বাঘ আসে এদিকটায় ? আজ দেখা মিলতে পারে ? " বলল সুবীর।

উত্তরে শুধু একবার মাথা নাড়া বাদে আর কোনো উত্তর করলো না মাঝি।
সুবীর আবার বলে উঠলো " উফফ আজ যা লাগছে না, হেব্বি ব্যাপার কিন্তু বল, এরম মাঝ রাতে পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে নৌকায় বসে দুধারে ঘন জঙ্গল, হেব্বি এডভেঞ্চার কিন্তু.....
এই ভালো কথা তোর ঠাকুরদার ওই ভূতের গল্পটা বল এবার শুনি, বাঘ না পাই নিদেনপক্ষে তোর গল্প শুনে যদি একটা ভূতও আসে তাহলেও চলবে....."
"ও মাঝিদা তুমি ভূতে ভয় পাওনাকি ? " হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলো সুবীর।
কোনো উত্তর না পেয়ে সুবীর আবার বলে উঠলো " এই ভাই তুই শুরু কর তোর গল্প, মাঝিদাও শুনুক তোর গল্প, তান্ত্রিকের নাতির মুখ থেকে ভূতের গল্প শোনা, আলাদাই একটা ব্যাপার...."এই বলে হাসতে শুরু করলো সুবীর।
"ঠিক আছে গল্প বলবো কিন্তু গল্পের মাঝে ইয়ার্কি করলে কিন্তু হবে না" বলল সুমন।
" জো হুকুম মাই লর্ড, নে নে এবার শুরু কর দেখি " বলল সুবীর।

সুমন শুরু করলো :

" অনেক দিন আগে এই মারিচপুরের গ্রামে একবার বাঘের খুব উপদ্রব দেখা দেয়। সমস্ত গ্রামের মানুস বাঘের ভয়ে তথস্ত হয়ে থাকতো। প্রথম প্রথম বাঘ শুধু পোষা গরু ছাগল নিয়ে যেত কিন্তু ধিরে ধিরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হল, এক রাতে এক বাড়ির দাওয়া থেকে রাতের বেলা একজন বয়েশ পনেরর ছেলে নিখজ হল। পরের দিন গ্রামের এই দক্ষিন দিকের জঙ্গলেই পাওয়া গেল তার মৃতদেহ, তবে মৃতদেহের মাথাটা কিন্তু পাওয়া গেল না, দেহের ক্ষত দেখে গ্রামবাসিরা বুঝতে পারল যে এটা সেই বাঘেরই কাজ। এরপর শুরু হল প্রতিনিয়ত এরম বাঘের উপদ্রব। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বাঘের শিকার হতে থাকল। গ্রামের লোকেরা এর থেকে বাঁচার জন্য গ্রামের মোরলেরকাছে গেল। মোড়ল সব শুনে বাঘের শিকার করার সিদ্ধান্ত নিল। একদিন রাতে পরিকল্পনা মাফিক ফাঁদ পাতা হল বাঘের জন্য। যথারীতি বাঘ ধরাও পড়ল। গ্রামের লোকেরা জালের মধ্যে আটকে থাকা বাঘকে পিটিয়ে হত্যা করল, সবাই খুশী মনে বাড়ি ফিরে গেল, গ্রামের মোড়লও সগৌরবে বাড়ি ফিরে এল। কিন্তু বিপদটা এল কিছুদিন পর। আবারও একই ভাবে শুরু হল বাঘের উপদ্রব। গ্রামের লোকেরা ভাবলো হয়তো ওই বাঘটার জুড়ি হবে এই বাঘটা। গ্রামের মোড়লের নির্দেশে ফের ফাঁদ পাতা হল বাঘের জন্য। কিন্তু বাঘ জালে আটকা পরার পর সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখল যে এই বাঘ সেই বাঘটাই যাকে কিছুদিন আগে জালের মধ্যেই পিটিয়ে মেরেছিল এবং তার থেকেও আশ্চর্য ব্যাপার হল যে বাঘটা দেখতে দেখতে চোখের সামনে ধীরে ধীরে হাওয়াতে মিলিয়ে গেল। এই দেখে গ্রাম বাসীরা খুব ভয় পেয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল যে এটা শুধু কোন বাঘের কাজ না, এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোন বৃহৎ অশুভ শক্তি। এর ফলে গ্রামের লোকেরা চিন্তায় পরে গেল। ভয়ের মধ্যে তাদের দিন কাটতে লাগলো। গ্রামের মোড়লের ছোট বেলার বন্ধু ছিল আমার ঠাকুরদা। সে ঠিক করলো আমার ঠাকুরদাকে সবটা জানাবে এবং তার সাহায্য নেবে। আমার ঠাকুরদা মোড়লের থেকে পাওয়া চিঠিতে সমস্ত ঘটনা জেনে মারিচপুর গ্রামের দিকে রওনা দিল। এখানে এসে মোড়লের কাছে সমস্ত ঘটনা শুনে ঠাকুরদা নিজে ব্যাপারটা অনুসন্ধান করে দেখবে ঠিক করলো। প্রথম দিন লাশটা যেখানে পাওয়া যায় , মোড়লের থেকে সেই জায়গাটা জেনে নিয়ে সেই স্থানে গিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন আমার ঠাকুরদা। বেশ কিছু দিন অনুসন্ধানের পর সে বুঝতে পারে যে এটা শুধু কোন সাধারন প্রেতে আত্মার কাজ না, এ আরও শক্তিশালী কোন কিছু। আমার ঠাকুরদা মোড়লকে গ্রামের সবাইকে এক জায়গাতে জড় হতে বলল। গ্রামের মোড়লের নির্দেশে গ্রামের সবাই মোড়লের বাড়ির উঠানে জড় হল। আমার ঠাকুরদা নিজের পরিছয় দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল " দেখুন আপনাদের গ্রামে বেশ কিছু দিন ধরে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার জন্যই আপনাদের গ্রামের মোড়ল আমায় এখানে আসতে বলে, এখানে এসে বেশ কিছুদিন অনুসন্ধান করে আমি আমার তন্ত্র সাধনার বলে বুঝতে পারি যে আপনাদের গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলর পেছনে আছে এক পিশাচ সিদ্ধ তান্ত্রিক। আপনাদের গ্রামের দক্ষিণ দিকের জঙ্গলটাতে সে নিজের আস্তানা তৈরি করে। এই কাপালিক রুপ বদলের বিদ্যায় পারদর্শী হওয়াতে সে বাঘের রূপ ধরে আপনাদের বাড়ি থেকে গরু ছাগল নিয়ে গিয়ে নিজের যজ্ঞের বলীর কাজে ব্যবহার করতে লাগলো। ধীরে ধীরে তার যজ্ঞ আর বৃহত্তর হয়ে উঠল এবং এবার তার দরকার পড়ল মানুসের রক্তের তাই একে একে মানুষ বাঘের শিকার হতে শুরু করলো। তার আরাধ্যা দেবতাকে ৩০ টি মানুসের মাথার খুলি দিয়ে বানানো মালা অর্পণ করে সে অমরত্ত লাভ করতে চায়। 
"কিন্তু আমরা তো সেই বাঘকে নিজের হাতে পিটিয়ে মেরেছিলাম, তারপরও সেই বাঘ ফিরে এল কি ভাবে?" এক গ্রামবাসী প্রশ্ন করলো।

আমার ঠাকুরদা ফের বলতে শুরু করলো, " হম তোমরা তাকে পিটিয়ে মেরেছিলে ঠিকই কিন্তু মৃত্যু তো শুধু দেহের হয়। সেই তান্ত্রিকের আত্মা নিজের কাজ পুরন করতে ফিরে এসেছে এবং সে নিজের যজ্ঞ পুরন না করে যাবে না।"

এই শুনে গ্রামবাসীদের মধ্যে শোরগোল পরে গেল। তারা সবাই আমার ঠাকুরদা কে বলল " ঠাকুর মশাই আপনি কিছু একটা করুন, আপনি আমাদের বাঁচান।"

"উপায় একটা আছে কিন্তু তাতে মনের জোর চাই" উত্তর করলো আমার ঠাকুরদা।
"আমরা সবকিছু করতে রাজি ঠাকুরমশাই, আপনি শুধু আমাদের বাঁচান" একসাথে বলে উঠল গ্রাম বাসীরা।
" ঠিক আছে তবে যেটা বলছি শোন এই বলে বলা শুরু করলো আমার ঠাকুরদা " ওই দক্ষিণের জঙ্গলের একটি বড় পোরা বট গাছের নিছে ওই তান্ত্রিক তার মৃতদেহটি লুকিয়ে রেখেছে, আমাদের মাটি খুড়ে সেই মৃতদেহটি কে বার করতে হবে এবং সেই মৃতদেহটি কে গ্রামের বাইরে নিয়ে গিয়ে চিতায় দাহ করে সেই চিতার ছাই দিয়ে গ্রামের চারিদিকে বন্ধন দিতে হবে তাহলে সেই তান্ত্রিকের আত্মা আর এই গ্রামে আসতে পারবে না বা এই গ্রামের করোর কোন ক্ষতি করতে পারবে না, কিন্তু......" 

"কি কিন্তু ঠাকুর মশাই ? " জিজ্ঞাস করলো গ্রাম বাসীরা।

" কিন্তু ওই মৃতদেহ গ্রামের বাইরে নিয়ে যাবার পথে সেই তান্ত্রিকের আত্মা অনেক বাধার সৃষ্টি করবে, তবে তাতে ভয় পেলে হবে না, নিজের মঙ্কে শক্ত করতে হবে, কোন ভয় বা মায়াতে আতকে গেলে হবে না, কারন একবার সেই মৃতদেহ কে মাটিতে রাখলে আর কোন ভাবেই সেই তান্ত্রিকের আত্মাকে আটকানো সম্ভব না। সামনের আমাবস্যায় আর দুদিন বাকি, তখনই আমাদের এই কাজ টা করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত আমি গ্রামের চারপাশে গাত্রবন্ধন করে দিছি তাতে সাময়িক ভাবে সেই আত্মাকে আটকানো সম্ভভ তবে বেসি সময়ের জন্য না তাই এই আমাবস্যা তেই আমাদের কাজটা করতে হবে" বলল ঠাকুরদা।

দুদিন পরে পরিকল্পনা মত আমাবস্যার রাতে গ্রামের মোড়ল এবং সাথে আর চারজন আমার ঠাকুরদার সাথে সেই দক্ষিণ দিকের জঙ্গলের সেই পোরা বট গাছটার নিচে পৌঁছালো, আমার ঠাকুরটা সবাইকে একটা করে তাবিজ দিয়ে নিজেদের হাতে পড়ে নিতে বলল।
সে বলল " এই তাবিজ মন্ত্রপূত, এই তাবিজ তাদের রক্ষা করবে। আর রাস্তায় যতই কিছু হোক, মনে রাখবে সব ই মায়া, কোনো দিকে ধ্যান না দিয়ে শুধু নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।"

এবার চার জন মিলে মাটি খোড়া শুরু করলো, বেশ কিছুটা খুরতেই বেরিয়ে এলো তান্ত্রিকের মৃতদেহ। আশ্চর্যের বিষয় যে সেই মৃতদেহ কোনো পচন ধরার লক্ষণ নেই। যেন মনে হচ্ছে সদ্য তাজা মৃতদেহ।
মৃতদেহটি বার করে তাড়াতাড়ি কাঁধে তুলে নিলো চারজনে। শুরু হলো মৃতদেহ নিয়ে যাত্রা। সামনে আমার ঠাকুরদা মন্ত্র বলতে বলতে চলল আর পেছনে বাকি সবাই মৃতদেহ নিয়ে অনুসরণ করে চলল। কিছু দূর চলার পরে হঠাৎ বাঘের গর্জন শোনা গেলো। সবাই একটু থতমত খেয়ে গেলো দেখে আমার ঠাকুরদা বলে উঠলো, " কেউ ভয় পেয়োনা, এ শুধু সেই তান্ত্রিকের মায়া, সবাই আমার পেছন পেছন এসো। "
বেশ কিছু দুর যেতে এবার যেন মৃত দেহটা হালকা নড়ে উঠলো, আর সাথে বিকট হাসি হাসতে শুরু করলো, শুনে সবাই ভয় দিশেহারা হয়ে গেলো। মৃতদেহ যাদের কাঁধে ছিল তারা ভয় মৃতদেহ নামতে গেলে ঠাকুরদা বাধা দিয়ে বলল " খবরদার না, এসব শুধু ছলনা, তোমরা সবাই কালীর নাম জব করো, মা সবাইকে রক্ষা করবে।" 
মা কালীর নাম জবের সাথেই সাথেই সব কিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে গেলো।
ধীরে ধীরে মৃতদেহ গ্রামের বাইরে নিয়ে আসা হলো। গ্রামের লোকেরা আগে থেকেই গ্রামের বাইরে নদীর ধারে চিতা সাজিয়ে রেখেছিল। সেখানে গিয়ে গ্রামবাসীরা চিতায় মৃতদেহকে শুয়ে দিতেই ফের মৃতদেহটি উঠে বসলো, সাথে সাথে চারিদিক থেকে প্রবল ঝড় শুরু হলো। ধীরে ধীরে মৃতদেহের মুখ বিভৎস হয়ে উঠলো আর সাথে শুরু হলো সেই বিকট হাসি। 
তখন আমার ঠাকুরদা বিড়বিড় করে মন্ত্র উচ্চারণ করা শুরু করলো, ধীরে ধীরে ঝড় থেমে গেলো। এবার ব্যাগ থেকে গঙ্গাজল নিয়ে মন্ত্র বলে ছুড়ে দিল বসে থাকা মৃতদেহের গায়ে। মৃতদেহটি কেমন যেন মুসরে পড়ে গেলো চিতার উপর। সাথে সাথে মোড়লের হাত থেকে মশালটা নিয়ে ঠাকুরদা চিতায় আগুন দিয়ে দিলো। সাথে সাথে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এলো, আর সাথে ভেসে আসলো তান্ত্রিকের হুমকি " তুই ঠিক করলি না আমি তোকে ছাড়বো না। তোর বংশ আমি শেষ করে দেব ।"
আসতে আসতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো তান্ত্রিকের কথা গুলো। চিতার আগুন শান্ত হলে সেই চিতা ভস্ম নিয়ে গ্রামের চারিদিকে বন্ধন করে দিয়েছিল আমার ঠাকুরদা। তারপর থেকে আর কখনও সেই তান্ত্রিকের আত্মা আর এই গ্রামের লোকেদের কোনো ক্ষতি করেনি।

এই বলে নিজের গল্প শেষ করলো সুমন।

গল্প শেষ হলে এবার সুবীরের হাসি শুরু হল " হা হা হা......ভাই আজকের দিনেও এসব গল্প.... সত্যি নাকি তোর ঠাকুরদা বাঘরূপী তান্ত্রিক কে মেরেছিল....ভাই সত্যি বলছি তোর ঠাকুরদা তান্ত্রিক ছিল কি ছিলনা সে জানি না কিন্তু গল্প খুব ভালই বানাতে পারত। এরম গল্প আমাদের বলিউড পেলে পুরো লুফে নেবে..." বলে ফের হাসতে শুরু করলো সুবীর।
এবার সুমন বেশ রেগে গিয়েই বলল " দেখ গল্প তুই নিজেই শুনতে চাইলি, আমি তো এই গল্প সত্যি বলেও দাবি করিনি, তুই এরম হাসাহাসি করছিস, থাক এখানেই শেষ, আর কখনও গল্প বলব না."
"এখানে শেষ নয় বাবু" হঠাৎ একটা স্বর ভেসে এলো।
বেশ চমকে উঠলো সুমন।
"কি শেষ নয় ?" বলে উঠল সুমন।
"কাহিনী এখানেই শেষ নয় দাদাবাবু" বলল মাঝি।
" কিসের কাহিনী ? " জিজ্ঞাস করলো সুমন।
" এই যে আপনি আপনার ঠাকুরদার গল্প শোনালেন, তবে কাহিনী কিন্তু এখানেই শেষ না।" বলল মাঝি।
"মানে কি বলতে চাও তুমি ?" জিজ্ঞাস করলো সুমন।
" তেমন কিছু না, তবে জানেন কি সেই তান্ত্রিকের আত্মা কিন্তু ভুল বলেনি, সেদিনের পর থেকে সে এই মরিচপুর গ্রামের লোকেদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি এটা সঠিক কিন্তু সে অপেক্ষা করে আছে নিজের প্রতিশোধের...." বলল মাঝি।

" মানে কিসের প্রতিশোধ ? " জিজ্ঞাস করলো সুবীর।

" বাবু আপনি আপনার বন্ধুর গল্পটা মন দিয়ে শোনেননি, ওই যে তান্ত্রিকের শেষ বলা কথা গুলো যে সে আপনার বন্ধুর ঠাকুরদার বংশ শেষ করে ছাড়বে " বলল মাঝি।

"ধুর এসব আবার হয়নাকি...!" হাসতে হাসতে বলল সুবীর।
" হম বাবু হয়.....এরম ও হয়" এই বলে নিজের শালটা সরিয়ে পেছন ঘুরলো মাঝি আর সাথে সাথেই তাকে দেখে রক্ত হিম হয়ে গেলো দুজনের। মানুষের শরীরে বাঘের মাথা নিয়ে সামনে দাড়িয়ে যেন স্বয়ং মৃত্যু।
"বলেছিলাম না বংশ শেষ করে দেব" এক বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল আকাশ আর পরক্ষণেই চারিদিক জুড়ে শোনা গেল দুটো মরণ আর্তনাদ। দুই বন্ধুর শেষ আর্তনাদ।

Monday, May 13, 2024

শীতলতার খোঁজে

গরমে নাকি ওষ্ঠাগত মানব জাতির প্রাণ,
সুযোগ পেলেই করছে তারা দশ বারো বার স্নান।
কিন্তু কমছে না তো গরম তাতে,
ভাবছে আর কি করি,
শঙ্কা তাদের গরমে এবার না সেদ্ধ হয়েই মরি।
করছে তারা মিটিং মিলে,
খুজতে এর উপায়,
এসি ঘরে বসে ভাবছে তারা,
এ গরম কি করে কমায় ?
বলছে তারা এসি সংখ্যা,
যদি দুই আর বাড়ানো যায়,
মন্দ হয়না ব্যাপারটা তবে,
মন্দ নয় যে এই উপায়।
তবে বলছে নাকি বিজ্ঞানীরা
এ উপায় সঠিক নয়,
গরম কমাতে এসি লাগানো,
শুধু মূর্খতার পরিচয়।
গরম যদি কমাতেই হয়,
তবে তার কারণ আগে খোঁজো,
মূর্খের সব যুক্তি রেখে,
প্রকৃত কারণ এবার বোঝো।
খুঁজে দেখো যদি তবে ইতিহাসের পাতায়,
পাবে না খুঁজে এমন অধ্যায়,
গরমেতে হয়ে নাজেহাল মানুষ,
বসে আছে যেথায় কংক্রিটের ছায়ায়?
পেতে পারো বরং এমন ইতিহাস,
যেখানে গাছের ছায়ায় মানুষের বাস,
সেই স্নিগ্ধ শীতল গাছের ছায়ায়,
মানুষ নিত স্বস্তির নিশ্বাস।
ফিরে যেতে যদি হয় সেই যুগেতে আবার,
তাহলে উপায় শুধু একটাই তার,
এসির বদলে গাছ লাগানো হোক,
আজ থেকে তবে প্রতিজ্ঞা সবার।



সুদীপ দে
লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক
ওয়ার্কিং প্ল্যান এন্ড G.I.S সার্কেল