সকাল থেকে অজয় ফোন করলো না কেনো এখনও, এটাই মনে মনে ভাবছিল মধু, হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো।
"কি ফোন করতে এতো দেরি করলে কেনো?" জিজ্ঞাস করলো মধু
অজয় হেসে বলল "আরে আর বলো না , সকালে আজ উঠতে দেরি হয়ে গেছিলো। কিন্তুু হঠাৎ এই প্রশ্ন, খুব মিস করছিলে নাকি?"
মধু একটু লজ্জা পেয়ে বলল " আরে না না তেমন কিছু না, আসলে তুমি রোজ সকালে করো ফোন কিন্তুু আজ করছিল না তাই ভাবলাম কি হলো। "
"তো আজ অফিস যাবে না তুমি? কি রান্না করলে সকাল থেকে? "
অজয় হেসে বলল " আর রান্না !!! সকাল সকাল এতো লেট হলো ঘুম ভাঙতে, এখন ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছাতে পারলে হয় !! "
"আচ্ছা চল আমি অফিস বেরোলাম, বাকি কথা পরে হবে।"
এই বলে ফোন রাখলো অজয়
তবে অজয় ভুল কিছু বলেনি, সত্যি আজ অজয়ের ফোন আসতে দেরি হওয়াতে সত্যি মনে মনে মিস করছিল তাকে মধু।
বেশ কিছু মাস আগে এক সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে অজয়ের সাথে আলাপ মধুর। প্রথম প্রথম মধুর ঠিক ভালো লাগেনি অজয়কে, কেমন যেন ছিলো, কেমন যেন " বারোয়ারি প্রেমিক " মনে হতো অজয়কে। কিন্তুু আস্তে আস্তে সেই অজয়ই খুব আপন হয়ে এলো মধুর জীবনে।
ছোটো বেলাতেই মা বাবা কে হারিয়েছিল মধু। ছোটো থেকে তার দাদুর কাছেই মানুষ সে। কিন্তুু গত বছর তার দাদুর মৃত্যুর পরে খুবই যেন একা হয়ে গেছিলো মধু। ভাবতো এই মানুষের ভিড়ে সেই কি শুধু একা, কেউ কি নেই তার আপন!!??? দুঃখে বুকটা ভরে উঠতো মধুর। কিন্তুু অজয় যেন তার সেই দুঃখকে ভুলিয়ে দিয়েছে। আজও মধুর মনে পরে প্রথমদিন অজয় মধুর ফোন নম্বর চাওয়াতে বেশ রাগই হয়েছিল মধুর, ভেবেছিল এক্ষুনি ব্লক করবে তাকে। অজয়ের প্রোফাইল ঘেটেও দেখেছিল মধু, না ভালো মধুর লাগেনি, যেন একটু বেশিই বান্ধবী অজয়ের। সত্যি বলতে এসব দেখে অজয়কে সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটের " বারোয়ারি প্রেমিক " মনে হয়েছিল মধুর। কিন্তুু এতো কিছুর পর ও অজয়কে ব্লক করেনি মধু, সেদিন অজয়ের প্রোফাইল ঘেঁটে একটা কথা মধু জেনেছিল যে তারই মত অজয়ও একা এ জগতে। হয়তো অজয়ের নিঃসঙ্গতাই অজয়কে এমন করে তুলেছে। আসলে একলা হবার, নিঃসঙ্গ হবার জ্বালা বোঝে মধু। হয়তো তাদের মধ্যে কার এই নিঃসঙ্গতাই তাদের মাঝে সম্পর্কের সেতু তৈরি করে তুলেছিল। আজ সত্যি অজয় তার একমাত্র আপনজন, একটা মুহর্ত যেন ভালো লাগেনা মধুর অজয়কে ছাড়া কিন্তুু তবুও অজয়কে এখনও নিজের মনের কথা বলতে পারেনি মধু। যদিও অজয় অনেকবার বলেছে সে তাকে ভালোবাসে কিন্তুু মধু পারেনি মন খুলে বলতে, আসলে কোথাও হয়তো এখনো একটু ভয় আছে তার মনে, এখনও দেখা হয়নি তাদের, মধু ঠিক করেছে দেখা হলে অজয়কে সামনা সামনি নিজের মনের কথা বলে দেবে। দিল্লিতে একটা সফটওয়ার ফার্মে চাকরী করে অজয়, সে বলেছে এই পুজোতে কলকাতা এসে মধুর সাথে পুজো কাটাবে। কিন্তুু পুজোতে তো এখন অনেক সময় বাকী অতদিন কি নিজেকে আটকে রাখতে পারবে মধু!!! না আজ রাতে অজয় ফোন করলে তখনই নিজের মনের কথা বলবে মধু।
আজ অন্যদিনের ছেয়ে একটু বেশি অধীর ভাবে অপেক্ষা করছিল মধু অজয়ের ফোনের। ঘড়ির শব্দে ঘুম ভাঙলো মধুর, রাত ১১টা বাজে, তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে দেখলো মধু, না অজয়ের ফোন আসেনি।
কিন্তু এত রাত তো করেনা অজয়, রোজ তো অফিস ফেরার সময় ওই ৮টা নাগাদই ফোন করে, মনে মনে ভাবল মধু।
এবার ধীরে ধীরে মন অধীর হয়ে উঠলো মধুর।
মধু ফোন করলো অজয়কে কিন্তুু একি অজয়ের ফোনটা লাগছে না কেন!!?? ক্রমাগত ফোন করে চললো মধু কিন্তুু না লাগলোনা ফোন। ফোন করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেলো মধু... সকালে সূর্যের আলো চোখে পরায় ঘুম ভাঙ্গলো মধুর, উঠেই তাড়াতাড়ি ফোন দেখলো, না অজয় এখনও ফোন করেনি।
আজ যেন কাজে মন লাগছিলনা মধুর, খালি ভাবছিল এই বুঝি ফোন আসবে অজয়ের, বার বার ফোন চেক করতে থাকল মধু, কিন্তুু না, অপেক্ষায় সারাদিন কেটে গেলো কিন্তুু অজয়ের ফোন এলো না।
মধু চেষ্টা করেছে অজয়কে ফোন করার কিন্তুু তাতেও লাভ হয়নী। ফোন লাগেনি অজয়ের।
আজ এক সপ্তাহ কেটে গেলো, আবার একা মধু, মনে পড়ে খুব তার অজয়কে, মনে হয় একবার অজয় ফোন করতো, একবার সে বলতে পারতো সেও অজয়কে ভালোবাসে, সেও সাথে চায় তাকে সাড়া জীবন। চেষ্টা করেছে অনেক মধু কিন্তুু কথা হয়নি অজয়ের সাথে। কিন্তুু কেন চলে গেলো অজয় এভাবে তার জীবন থেকে!!!! সে তো কোনো দোষ করেনি, কিন্তুু তাও কেন এরম করলো অজয় তার সাথে, কেন এভাবে কাদালো তাকে।
দেখতে দেখতে একমাস কেটে গেলো, না আর ফোন আসেনি অজয়ের। আর বলা হয়নি মধুর নিজের মনের কথা গুলো অজয়কে। মধু ভাবে হয়তো ভুলটা সেই করেছিল, হয়তো সে প্রথমেই ঠিক ভেবেছিল অজয়কে, একটা ঠগ, মেয়ে দের মন নিয়ে খেলা একটা ঠগ। অজয়কে বিশ্বাস করাটাই ভুলছিল মধুর।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো মধুর।
অজয় : " হ্যালো মধু? " গলাটা খুব চেনা মধুর, হ্যাঁ, অজয় ফোন করেছে।
মধু চিনতে পারা সত্বেও না চেনার ভান করে জিজ্ঞাস করলো "আপনি কে বলছেন ?"
"মধু আমি বলছি তোমার অজয়" ফনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো কথা গুলো।
এবার একটু রেগেই মধু বলল " দেখুন আপনার মতন ছেলের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আপনাকে বিশ্বাস করাটাই আমার ভুল ছিলো, একটা ছোটো লোক, ঠগ, জোচ্চোর, প্রতারক। কোন সাহসে ফোন করেছো আমায় ?? "
"মধু আমি কলকাতাতে এসছি, একবার দেখা করো, আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো জ্বালাবো না শুধু একবার দেখা করো" বেশ মিনতির স্বরেই বলল অজয়।
"আমি কাল তোমার জন্য বিকেল ৫টায় অপেক্ষা করবো, তুমি যেই পার্কটার কথা বলেছিলে সেই পার্কটায়।" বলল অজয়।
"ভেবে দেখবো" বেশ রেগেই এই বলে ফোনটা রেখে দিল মধু।
"সে কি যাবে দেখা করতে অজয়ের সাথে, একটা ঠগ, জোচ্চোর ছেলের সাথে দেখা করা কি ঠিক হবে?? আচ্ছা অসুবিধা কি আছে, পার্কের আশেপাশে তার অনেক বন্ধু বান্ধব থাকে, আর বিকেল ৫টায় তো অনেক লোক থাকে কিছু বেগতিক দেখলে চিৎকার করে লোক জড়ো করবে সে। মধু ঠিক করলো সে যাবে, একবার হলেও গিয়ে জানতে চাইবে কেনো অজয় খেললো তার মন নিয়ে, কি মজা পেলো এতে সে।।।" মনে মনে এসব ভাবতে লাগলো মধু।
বিকেল ৫টা, পার্কে এসে পৌঁছালো মধু, কিন্তুু অজয়কে তো দেখতে পাচ্ছে না সে।
মধু ফোন করলো অজয়কে, " কোথায় তুমি ?"
"আমি জানতাম তুমি আসবে" বেশ খুসির সাথে উত্তর দিল অজয়।
"পেছনের দিকের গেটটার সামনে যেই বেঞ্চটা আছে আমি সেটাতে বসে আছি।" উত্তর দিল অজয়।
"হম দেখেছি, টুপি পরে বসে আছো?? " । জিজ্ঞাস করলো মধু।
"হম ঠিক, এসো" । এই বলে ফোনটা রাখল অজয়।
মধু সামনে গিয়ে দাড়ালো অজয়ের, "কিন্তু অজয় মাথা নিচু করে বসে আছে কেন? " মনে মনে ভাবল মধু।
কেমন আছো?? এই বলে হাত বাড়ালো মধু কিন্তুু অজয় হাতটা ধরলো না, এমন ভাব করলো যেন সে মধুর হাতটা দেখেইনি। বেশ রাগ হলো এবার মধুর।
"কি হলো মাথাটা কি তুলবে? দেখবে বলে ডেকে মাথা নিচু করে নাটক হচ্ছে?? ।" বেশ রেগেই বলল মধু।
"মধু তুমি খুব সুন্দরী, অনেক স্বপ্ন ছিলো তোমায় দেখার, কিন্তুু যেনো ভগবান আমাদের সব স্বপ্ন পুরনো করতে দেয়না। অনেক সখ ছিলো কিন্তুু আজ যখন তুমি সামনে, তখন আমার আর তোমায় দেখার সাধ্য নেই।" বেশ দুঃখের সাথেই বলল অজয়।
"কিসব বলেছো তুমি? " বেশ আশ্চর্য্য হয়েই জিজ্ঞাস করলো মধু।
ঠিকই বলছি মধু। সেদিন যখন তোমার ফোন রেখে অফিসে বেরোলাম, দেরি হয়ে গেছিলো বলে একটু জোরেই বাইকটা চালাচ্ছিলাম। সামনে থেকে আসা একটা বাসের সাথে অ্যাকসিডেন্ট করলাম। ২০ দিন হসপিটালে ছিলাম কোমায়। জ্ঞান ফেরার পর বুঝলাম আমার চোখের দৃষ্টি চলে গেছে। চাকরিটাও চলে গেলো। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো কিন্তুু ভাবলাম একবার তোমায় জানানো দরকার। তাই আজ তোমার সাথে দেখা করতে এলাম। আর জ্বালাবো না তোমায়। কিন্তুু সত্যি বলছি আমি তোমায় ঠকাইনি, আমি জোচ্চোর নই। আমি সত্যি তোমায় খুব ভালোবাসি। আর যে কটাদিন বাঁচবো তোমায়ই ভালবাসবো। কিন্তুু সাথে আর থাকা হবেনা আমাদের। আজ আমি অন্ধ। আমি চাইনা আমার জন্য তুমি নিজের জীবন নষ্ট করো বা কেউ তোমার হাসি ওড়াক। আমি তোমার জীবনে কষ্ট বাড়াতে চাইনা l" এই বলে উঠে যেতে শুরু করলো অজয়। খুব ইচ্ছে হলো মধুর অজয়কে জড়িয়ে ধরে আটকাতে কিন্তুু পারলো না সে। আস্তে আস্তে ভিড়ের মধ্যে মিশে হারিয়ে গেলো অজয়।
আজ সকাল থেকে অজয় গতকালের কথাই ভাবছিল। কত সখ ছিলো তার নিজের মধুকে দেখার, কতো স্বপ্ন বেঁধেছিলো সে। সব শেষ তার। গতকালের পর আর কখনো দেখা হবেনা তাদের, আর কখনো তার ফোনে মধুর গলা শোনা যাবেনা।
হঠাৎ বেজে উঠলো ফোনটা।
"এই রিংটোনটা তো মধুর......!!!!!!" মুহূর্তে আনন্দে ভরে গেল অজয়ের মন।
"হ্যালো মধু......"খুশির সাথে বলে উঠল অজয়
"হ্যালো আমি অ্যাপেলোও হসপিটাল থেকে বলছি। আপনি কি এই ফোনটি যার তাকে চেনেন ? ওনার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, আপনার নাম্বারটা ওনার ফোনের কল লিস্টের সবার প্রথম থাকায় আপনাকে ফোন করা হলো। সম্ভব হলে একবার আসুন। " ফোনটা রেখে দিল অজয়।
হসপিটালের বিছানায় শুয়ে মধু। অজয়কে দেখে নার্স বললো " আপনি কি পেশেন্টের সাথে???
"হম...হম..আমায় ফোন করা হয়েছিল সকালে.." বলল অজয়।.
"আচ্ছা...আচ্ছা....পেশেন্ট এখন ভালো আছে কিন্তুু সে নিজের চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে।"
শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লো অজয়।
" একি হলো তার মধুর সাথে। ভগবান কেন করলো এরম।" মনে মনে বলল অজয়।
সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ জ্ঞান এলো মধুর। "আপনাকে পেশেন্ট ভেতরে ডাকছে.." এসে অজয় কে জানালো নার্স।
অজয় ঘরে প্রবেশ করে মধুর নাম ধরে দেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল,
অজয়ের গলা শুনে মধু বলল " অজয় তুমি এসছ...?"
"হম.....মধু.." কাঁদো কাঁদো সুরে বলল অজয়।
"তুমি কাদছ কেন, এটাই তো নিয়তির পরিহাস, সেদিন তোমায় না বুঝে আজে বাজে বলেছিলাম তাই ভগবান আমায় শিক্ষা দিলো, এখন থেকে আমিও অন্ধ। একা ছিলাম, এবার আরো একা হয়ে গেলাম ।।" বেশ এক আক্ষেপের সুর মধুর গলায়।
দুঃখে প্রাণটা কেদে উঠলো অজয়ের। অনেক সাহস করে মধুকে বললো " আমায় বিয়ে করবে মধু ? "
মধু একটু হেসে বললো, " কি বলবো বলো, আমি অন্ধ, আমার কি আর বলার আছে, তুমি যদি সুখী হতে পারো আমায় নিয়ে তাহলে ঠিক আছে আমি তোমায় বিয়ে করতে রাজি ।।"
আজ দেখতে দেখতে তিন মাস কেটে গেছে অজয় আর মধুর বিয়ের।বেশ সুখেই আছে দুজনে। অজয় অন্ধদের স্কুলে ইংরাজি পড়ানর চাকরী পেয়েছে। কোনো কষ্ট রাখেনি সে মধুর। সত্যি আজ দুজনেই তারা খুশি একসাথে। আজ আবার অজয়ের জন্মদিন। মধু আবার কেক অর্ডার করেছে অজয়ের জন্য।
হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠলো।
মধু বললো দাড়াও কেকটা এসে গেছে মনে হয় নিয়ে আসি । এই বলে মগেট খুলতে গেলো মধু ।
হঠাৎ মধুর ফোন বাজছে শুনে আজয় বলল "মধু তোমার ফোন বাজছে"
মধু বাইরে থেকে বলল "ধরে দেখো কে....আমি কেক এর ডেলিভারী নিচ্ছি" ।
অজয় ফোন ধরলো....
ওপাশ থেকে একটা স্বর ভেসে এল " হ্যালো মিস মধু, আপনি তিন মাস আগে নিজের চোখ ডোনেট করেছিলেন তো আপনাকে তিন মাস পর একটা আই চেকআপ এ আস্তে বলা হয়েছিল। আমি সেটা মনে করা তেই ফোন করলাম। আমি তালে আপনার অ্যাপয়েন্ট মেন্ট টা কি আগামী সপ্তাহে রাখবো ??"
শুনে হাত থেকে ফোনটা পরে গেলো অজয়ের। পাশের ঘর থেকে মধুর আওয়াজ এলো
" কার ফোন ছিলোগো? দেখো তোমার কেক এসে গেছে। এবার বলো জন্মদিনে কি উপহার চাই তোমার??"
অজয়ের আর কোন কথা বেরোলও না শুধু ভালবাস আর কৃতজ্ঞতার ভাবে দুচোখ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
No comments:
Post a Comment