Wednesday, June 30, 2021

পাশে আছি

#পাশে আছি#

"হ্যাঁ পাশে আছি তোর"
হ্যাঁ এটাই,
এটাইতো বলে তারা,
যারা ঘিরে আছে আসে পাশে।

প্রতিনিয়ত যাদের ভরসা করে,
এক অবুঝ পাগল মন।

কিন্তু বাড়ায় না তো কেউ হাত...
বলে না তো উঠে আয়,
উঠে আয় এই হাত ধরে,
তবুও কেন বলে তারা,
কেন বলে শুধু পাশে আছি !!

তবে শুনে খুশি হয় মন,
চায় আবেগ ভরে সে মুখপানে,
ভাবে হয়তো এবার আসবে,
এবার আসবে সেই হাত খানি,
টেনে তুলবে যে তাকে।

কিন্তু বৃথাই ভাবনা,
আসেনা কোনো হাত, যা টেনে ধরবে,
টেনে ধরবে তাকে আপন করে,
যা জোগাবে ভরসা এগিয়ে যাবার,
দেবে ইন্ধন উপরে ওঠার।

তবে কি সবটাই মিথ্যে ?
একি তবে শুধুই লৌকিকতার আড়ম্বর ?
যার অন্তরে সব কিছুই হয় শূন্য।

তবে কি এগোতে হবে একাই ?
উঠে আসতে হবে শুধু নিজেরই চেষ্টায় ?
অবলম্বন কি তবে শুধু নিজেরই বিশ্বাস ?

অবশেষে তবে বুঝেছে মন,
বুঝেছে জীবনের এ এক অব্যক্ত দৃঢ় সত্য,
তাই এগিয়েছি ধীরে ধীরে,
এগিয়েছি নিজ বিশ্বাস কেই সঙ্গী করে,
দেখেছে সে সফলতার মুখ।

তবে এখনও কথা কিছু আসে কানে,
আরে সবসময়ই তো ছিলাম, আছি, থাকবো আমি পাশে।
শুনে আনমনেই শুধু মুচকি হাসে মন,
বলে "সত্যি তোরা ছিলিস পাশে,
এভাবেই তোরা থাকবি পাশে ।।"

Saturday, June 12, 2021

অকর্মণ্য

" কী আজ দেরি করলে ফিরতে ? " গেট খুলতে খুলতে জিজ্ঞাস করলো তাপসের বউ..

তাপস : " ছেলে কোথায় ? "

তাপসের বউ : " ছেলে.......!!!! ওই তো ঘরে বসে আছেন লাট সাহেব...."

বউয়ের মেজাজ গরম দেখে এবার তাপস আসতে করে জিজ্ঞাস করলো....

তাপস : " কিছু হয়েছে নাকি....?"

তাপসের বউ : " কিছু হয়েছে....!!!! তোমার গুণধর ছেলের অঙ্কের খাতা বেরিয়েছে আজ... ১০০তে ২০ পেয়েছেন মাত্র...ইসস লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে...আমাদের বিল্টুর সাথেই স্কুলে যায় দাস বাবুর ছেলে ক্লাসে হাইয়েস্ট পেয়েছে এখুনি ফোন করে দাস বাবুর বউ বললো...ক্লাসে নাকি সবচেয়ে খারাপ তোমার গুণধর ছেলেই পেয়েছে.... ছি ছি কি ভাবে মুখ দেখাবো সবার কাছে...."

এসব শুনে রাগে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো তাপস...

তাপস : " বিল্টু....এই হতচ্ছাড়া বিল্টু...এদিকে আয়...এদিকে আয় বলছি..."

ভয়ে ভয়ে নিজের ঘর থেকে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বেরিয়ে বিল্টু বললো...

বিল্টু : " আর হবে না বাবা....প্রশ্ন খুব কঠিন ছিল..."

বিল্টুর এই সামান্য ক্ষমা প্রার্থনায় মন গল্লো না তাপসের...যতই হোক দাস বাবুর ছেলের কাছে হেরে গেছে বিল্টু...দুটো করে মাস্টার রেখেও কি ভাবে হারতে পারে বিল্টু....না না এই অপরাধের একটাই শাস্তি...মার শুধু মার....

যেমনি ভাবা তেমনি কাজ...শুরু হলো উত্তম মধ্যম...

বিল্টু মার খেতে খেতে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলো...

বিল্টু : " আর করবো না বাবা...আর মেরো না... ও মা...আর মেরো না..."

তাপসের বউ : " এই সব হয়েছে তোমার জন্য...আরো দাও ওকে ক্রিকেট খেলতে..."

কথাটা শুনে এবার তাপসের চোখ গেলো বিল্টুর আগের সপ্তাহেই "Bengal Junior Inter School Cricket Tournament"- এ " man of the tournament " প্রাইজ পাওয়া নতুন ব্যাটটার দিকে...
সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটটাকে নিয়ে এই আছার মারলো তাপস...
এবার বিল্টু তার সাধের ব্যাট টাকে জড়িয়ে ধরে বললো..
বিল্টু : " বাবা প্লিজ এটাকে ভেঙ্গ না..বাবা প্লিজ.."

কিন্তু বিল্টুতো আর কোনো ছোট অপরাধ করেনি...ক্লাস সেভেনের অঙ্ক পরীক্ষায় ফেল করেছে সে..অগত্যা বিল্টুর সে আর্জিও খারিজ হয়ে গেলো...বরং সাথে সেই ব্যাটেরই এক দুই ঘা জুটলো বিল্টুর কপালে...
অবশেষে বিল্টুর সাধের ব্যাটটা দু টুকরো হয়ে গেলো..
দুর থেকে তা শুধু দেখা আর কান্না বাদে আর কিছু করারও ছিল না বিল্টুর..

দূরে দাড়িয়ে থাকা বিল্টুর উদ্দ্যেশ্যে এবার তাপস বললো...
তাপস : " আর যদি কখন তোকে খেলতে দেখেছি তবে দেখ তোর আমি কি করি...স্কুল থেকে সোজা ঘর"

এবার নিজের বউয়ের উদ্দেশ্যে বললো তাপস...

তাপস : " এই তুমি দাস বাবুর বউকে জিজ্ঞাস কোরো তো তাদের ছেলের অঙ্কের টিউটর আমাদের বিল্টু কে পড়াবে নাকি...যদি রাজি হয় তাহলে এই সপ্তাহ থেকেই ওর আর একটা টিউশন বাড়িয়ে দাও...ওই বিকালের টাইমটা ওকে আর মাঠে যেতে দিও না ওই টাইম টাই নতুন অঙ্কের টিউশন টা করিয়ে দাও..." 

তাপস : " যেই অঙ্ক গুলো পরীক্ষায় এসেছে সেগুলো তোর স্যার করায় নি তোকে ....."

বিল্টু : " হ্যাঁ বাবা স্যার করিয়েছিল..."

তাপস : " তো তুই বুঝতে পারিসনি ? "

বিল্টু : " না বাবা পেড়েছিলাম..."

তাপস : " তাহলে ভুল হলো কেনো...."

চুপ করে দাড়িয়ে রইলো বিল্টু...

তাপস : " এক্ষুনি খাতা খুলে সব অঙ্ক গুলো একবার দেখে নিয়ে তারপর সেগুলো করে দেখাবি তারপর আজ খেতে পাবি..."

এবার নিজের বউয়ের উদ্দেশ্যে বললো তাপস..

তাপস : " এই ওর অঙ্ক না হলে আজ খেতে দেবে না ওকে "

দু ঘন্টা পর অঙ্ক খাতা হাতে নিজের রুম থেকে বেরোলো বিল্টু...
বিল্টু দেখলো তার বাবা মা দুজনে বসে টিভিতে জনপ্রিয় ডান্স শো " Bengal Dance Star Junior " দেখছে...

বিল্টু : " বাবা অঙ্ক হয়ে গেছে..."

তাপস : " আর কি করবো...যাও বই খাতা গুছিয়ে নাও কালকের স্কুলের...আর খেলার মাঠে যেনো আর না দেখি...মনে থাকে যেন..."

অগত্যা চুপ চাপ নিজের রুমের দিকে হাটা দিল বিল্টু। শুধু ফেরার সময় শুনলো তার বাবা তার মাকে বলছে..

বিল্টুর বাবা : " কি ভালো নাচ করে দেখো বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে গুলো...দেখেও ভালো লাগে...ভাগ্যবান বাবা মা এরা...এসব বাচ্ছরাই বড় হয়ে কিছু করবে...
আর আমাদের হয়েছে এক...অকর্মণ্য..."

মুচকি হেসে নিজের রুমে চলে গেলো বিল্টু....




লেখক : সুদীপ দে








Tuesday, June 8, 2021

ভুল

                 গল্প : ভুল

"ওই অসীম....."

ডাকটা শুনে হকচকিয়ে গেলো অসীম...

" হটাৎ রাস্তার উপর কে নাম ধরে ডাকলো...!!!?? "

" ওই এই দিকে রে..."

এবার অসীম দেখলো তার বা দিক থেকে একজন হাত নাড়ছে...

" আরে সুনীল যে...." বললো অসীম..

সুনীল অসীমের ছোট বেলার বন্ধু...
সুনীলের দিকে এবার এগিয়ে গেলো অসীম..

অসীম : " কি রে খবর কি ? "

সুনীল : " আর খবর.....এই অটো নিয়ে বাড়ি ফিরবো..তোদের মতন তো আর পড়া লেখা শিখতে পারিনি তাই অটো চালাই ভাই। তুই বল তুই কোথায় যাচ্ছিল ? "

অসীম : " আরে ভাই অফিস থেকে ফিরছিলাম....এই কাছেই অফিস.."

সুনীল : " তো বাড়ি যাবি তো এখন ? চল ছেড়ে দিচ্ছি...একটু গল্পও হয়ে যাবে...অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই তোদের কারুর সাথে। "

অগত্যা সুনীলের অটোতে বসলো অসীম।

অসীম : " আর বল ভাই বিয়ে করেছিস...? "

সুনীল : " হম রে ভাই এই আগের বছরই করলাম। তোদের কারুর সাথে তো যোগাযোগ নেই নইলে ডাকতাম।"

অসীম : " আরে সে ঠিক আছে ভাই..."

সুনীল : " তুই বল তুই করলি বিয়ে ? তোরা তো সব শিক্ষিত ছেলে.... বড়ো অফিসে নিশ্চয়ই চাকরি করছিস..."

উত্তরে মুচকি হেসে অসীম বললো..

অসীম : " আরে না রে...তেমন কিছু না। না না বিয়ে করিনি রে..."

সুনীল : " কেনো রে ? করে নে আর কত দেরি করবি...আমার তো দেরি হলো কারণ এই তো অটো চালাই দেখতেই পারছিস...জানিসই তো পড়াশোনা করিনি...৮ অব্দি পড়ে তো স্কুল ছাড়লাম তারপর একজনের একটা অটো চালাতাম তারপর টাকা জমিয়ে নিজের অটো কিনলাম...এখন ভাই তোদের আশির্বাদে ৩ টে অটো কিনেছি ভাই..দুটো ভাড়া খাটে আর একটা আমি নিজে চালাই...আগের বছর আমাদের ওই বাড়ি তো দেখেছিলিস ওখানে কে নিজের মেয়ে দেবে তাই এবার একটা ফ্ল্যাট নিলাম...হ্যাঁ ভাই তবে সেকেন্ড হ্যান্ড ই নিয়েছি । নতুন ফ্ল্যাট ভাই আমাদের কপালে কোথায় বল....নতুন ফ্ল্যাট সব তোরা নিবি শিক্ষিত ছেলে পুলে....তোরাই ভালো আছিস রে ভাই...
আর এসব গোছাতে গোছাতে দেরি হয়ে গেল বিয়ে করতে...."

একটু মুচকি হাসলো অসীম...

অসীম : " আরে না ভাই...সেরোম কিছু না রে..."

সুনীল : " হম ভাই দেখ...কোনো কাজই ছোট না...চুরি তো করছি না। অটো চালাচ্ছি...আমার যা যোগ্যতা তাতে খেয়ে পড়ে তো আছি ভাই "

অসীম : " না না সে তো ঠিকই..."

"এই সামনে টা দাড় করিয়ে দে ভাই একটু " : বললো অসীম..

সুনীল : " ঠিক আছে...আমার নাম্বার টা রেখে দে...একদিন রবিবার করে আয়ে না হয় একটু এই গরীব বন্ধুর বাড়িতে...জমিয়ে খাওয়া আর আড্ডা হবে..."

অসীম একটু লজ্জা পেয়ে বললো..

অসীম : " আরে ধুর কি সব বলিস না তুই....চল আসলাম ভাই...একদিন আসবো চল...টাটা.."
ধীরে ধীরে সুনীলের অটোটা মিলিয়ে গেলো..

"কিরে আজ এত তাড়াতাড়ি চলে এলি..." গেটটা খুলে জিজ্ঞাস করলো অসীমের মা...

একটু হেসে অসীম বললো...

অসীম : " আজ হেঁটে আসতে হয়নী গো...আমাদের স্কুলের সুনীলের সাথে দেখা হল... ও অটো চালায় আমায় ছেড়ে দিল.."

অসীমের মা : " কে সুনীল...?"

অসীম : " আরে মনে নেই একটু মোটা করে লম্বা করে...একবার আমার জন্মদিনে এসছিল....ওই যে ক্লাস এইটের পর পড়ালেখা ছেড়ে দিল..."

অসীমের মা : " ও হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে...তো কি বললো সে....
আর তোকে একটু বেরোতে হবে রে...একটু কয়লা নিয়ে আসবি...একদম কয়লা নেই...উনুনে ভাত চাপাতে পারছি না..."

অসীম একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে মুচকি হেসে বললো...

অসীম : " কি আর বলবে....আমার করা জীবনের ভুল গুলো গোনালো...."

অসীমের মা : " ভুল..!!!!!
তুই আবার কি ভুল করলি...."

অসীম : " করেছি মা...অনেক গুলোই করেছি...আর আজ আর তোমায় কয়লাতে রাধতে হবে না...আজ না হয় আমার করা ভুল গুলোকেই জ্বালিয়ে রান্না চাপাও..."

বলে আবার মুচকি হাসলো অসীম...

অসীমের মা : " কি সব বলছিস...ভুল আবার জ্বালানো যায় নাকি....কি পাগল হলি নাকি..."

এবার অসীম এক দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে বললো....

অসীম : " যায় যায়....ভুলও জ্বালানো যায়....পাশের ঘরে আলমারিতে দেখ...আমার ছোট থেকে করা প্রতিটা ভুল একটা ফাইলে রয়েছে...ভালো ভাষায় ওগুলোকে এতদিন আমি সার্টিফিকেট বলতাম..."

এই বলে মাথা নিচু করে নিজের ঘরে চলে গেল অসীম...


                           লেখক : সুদীপ দে






Monday, June 7, 2021

ত্যাগ


সকাল থেকে অজয় ফোন করলো না কেনো এখনও, এটাই মনে মনে ভাবছিল মধু, হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো।

"কি ফোন করতে এতো দেরি করলে কেনো?" জিজ্ঞাস করলো মধু

অজয় হেসে বলল "আরে আর বলো না , সকালে আজ উঠতে দেরি হয়ে গেছিলো। কিন্তুু হঠাৎ এই প্রশ্ন, খুব মিস করছিলে নাকি?"

মধু একটু লজ্জা পেয়ে বলল " আরে না না তেমন কিছু না, আসলে তুমি রোজ সকালে করো ফোন কিন্তুু আজ করছিল না তাই ভাবলাম কি হলো। "
"তো আজ অফিস যাবে না তুমি? কি রান্না করলে সকাল থেকে? "

অজয়  হেসে বলল " আর রান্না !!! সকাল সকাল এতো লেট হলো ঘুম ভাঙতে, এখন ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছাতে পারলে হয় !! "
"আচ্ছা চল আমি অফিস বেরোলাম, বাকি কথা পরে হবে।" 
এই বলে ফোন রাখলো অজয়


তবে অজয় ভুল কিছু বলেনি, সত্যি আজ অজয়ের ফোন আসতে দেরি হওয়াতে সত্যি মনে মনে মিস করছিল তাকে মধু।
বেশ কিছু মাস আগে এক সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে অজয়ের সাথে আলাপ মধুর। প্রথম প্রথম মধুর ঠিক ভালো লাগেনি অজয়কে, কেমন যেন ছিলো, কেমন যেন " বারোয়ারি প্রেমিক " মনে হতো অজয়কে। কিন্তুু আস্তে আস্তে সেই অজয়ই খুব আপন হয়ে এলো মধুর জীবনে।
ছোটো বেলাতেই মা বাবা কে হারিয়েছিল মধু। ছোটো থেকে তার দাদুর কাছেই মানুষ সে। কিন্তুু গত বছর তার দাদুর মৃত্যুর পরে খুবই যেন একা হয়ে গেছিলো মধু। ভাবতো এই মানুষের ভিড়ে সেই কি শুধু একা, কেউ কি নেই তার আপন!!??? দুঃখে বুকটা ভরে উঠতো মধুর। কিন্তুু অজয় যেন তার সেই দুঃখকে ভুলিয়ে দিয়েছে। আজও মধুর মনে পরে প্রথমদিন অজয় মধুর ফোন নম্বর চাওয়াতে বেশ রাগই হয়েছিল মধুর, ভেবেছিল এক্ষুনি ব্লক করবে তাকে। অজয়ের প্রোফাইল ঘেটেও দেখেছিল মধু, না ভালো মধুর লাগেনি, যেন একটু বেশিই বান্ধবী অজয়ের। সত্যি বলতে এসব দেখে অজয়কে সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটের " বারোয়ারি প্রেমিক " মনে হয়েছিল মধুর। কিন্তুু এতো কিছুর পর ও অজয়কে ব্লক করেনি মধু, সেদিন অজয়ের প্রোফাইল ঘেঁটে একটা কথা মধু জেনেছিল যে তারই মত অজয়ও একা এ জগতে। হয়তো অজয়ের নিঃসঙ্গতাই অজয়কে এমন করে তুলেছে। আসলে একলা হবার, নিঃসঙ্গ হবার জ্বালা বোঝে মধু। হয়তো তাদের মধ্যে কার এই নিঃসঙ্গতাই তাদের মাঝে সম্পর্কের সেতু তৈরি করে তুলেছিল। আজ সত্যি অজয় তার একমাত্র আপনজন, একটা মুহর্ত যেন ভালো লাগেনা মধুর অজয়কে ছাড়া কিন্তুু তবুও অজয়কে এখনও নিজের মনের কথা বলতে পারেনি মধু। যদিও অজয় অনেকবার বলেছে সে তাকে ভালোবাসে কিন্তুু মধু পারেনি মন খুলে বলতে, আসলে কোথাও হয়তো এখনো একটু ভয় আছে তার মনে, এখনও দেখা হয়নি তাদের, মধু ঠিক করেছে দেখা হলে অজয়কে সামনা সামনি নিজের মনের কথা বলে দেবে। দিল্লিতে একটা সফটওয়ার ফার্মে চাকরী করে অজয়, সে বলেছে এই পুজোতে কলকাতা এসে মধুর সাথে পুজো কাটাবে। কিন্তুু পুজোতে তো এখন অনেক সময় বাকী অতদিন কি নিজেকে আটকে রাখতে পারবে মধু!!! না আজ রাতে অজয় ফোন করলে তখনই নিজের মনের কথা বলবে মধু।

আজ অন্যদিনের ছেয়ে একটু বেশি অধীর ভাবে অপেক্ষা করছিল মধু অজয়ের ফোনের। ঘড়ির শব্দে ঘুম ভাঙলো মধুর, রাত ১১টা বাজে, তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে দেখলো মধু, না অজয়ের ফোন আসেনি। 
কিন্তু এত রাত তো করেনা অজয়, রোজ তো অফিস ফেরার সময় ওই ৮টা নাগাদই ফোন করে, মনে মনে ভাবল মধু। 

এবার ধীরে ধীরে মন অধীর হয়ে উঠলো মধুর।
 
মধু ফোন করলো অজয়কে কিন্তুু একি অজয়ের ফোনটা লাগছে না কেন!!?? ক্রমাগত ফোন করে চললো মধু কিন্তুু না লাগলোনা ফোন। ফোন করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেলো মধু... সকালে সূর্যের আলো চোখে পরায় ঘুম ভাঙ্গলো মধুর, উঠেই তাড়াতাড়ি ফোন দেখলো, না অজয় এখনও ফোন করেনি। 
আজ যেন কাজে মন লাগছিলনা মধুর, খালি ভাবছিল এই বুঝি ফোন আসবে অজয়ের, বার বার ফোন চেক করতে থাকল মধু, কিন্তুু না, অপেক্ষায় সারাদিন কেটে গেলো কিন্তুু অজয়ের ফোন এলো না। 
মধু চেষ্টা করেছে অজয়কে ফোন করার কিন্তুু তাতেও লাভ হয়নী। ফোন লাগেনি অজয়ের।

আজ এক সপ্তাহ কেটে গেলো, আবার একা মধু, মনে পড়ে খুব তার অজয়কে, মনে হয় একবার অজয় ফোন করতো, একবার সে বলতে পারতো সেও অজয়কে ভালোবাসে, সেও সাথে চায় তাকে সাড়া জীবন। চেষ্টা করেছে অনেক মধু কিন্তুু কথা হয়নি অজয়ের সাথে। কিন্তুু কেন চলে গেলো অজয় এভাবে তার জীবন থেকে!!!! সে তো কোনো দোষ করেনি, কিন্তুু তাও কেন এরম করলো অজয় তার সাথে, কেন এভাবে কাদালো তাকে।
দেখতে দেখতে একমাস কেটে গেলো, না আর ফোন আসেনি অজয়ের। আর বলা হয়নি মধুর নিজের মনের কথা গুলো অজয়কে। মধু ভাবে হয়তো ভুলটা সেই করেছিল, হয়তো সে প্রথমেই ঠিক ভেবেছিল অজয়কে, একটা ঠগ, মেয়ে দের মন নিয়ে খেলা একটা ঠগ। অজয়কে বিশ্বাস করাটাই ভুলছিল মধুর। 

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো মধুর।

অজয় : " হ্যালো মধু? " গলাটা খুব চেনা মধুর, হ্যাঁ, অজয় ফোন করেছে।
মধু চিনতে পারা সত্বেও না চেনার ভান করে জিজ্ঞাস করলো "আপনি কে বলছেন ?"

"মধু আমি বলছি তোমার অজয়" ফনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো কথা গুলো।

এবার একটু রেগেই মধু বলল " দেখুন আপনার মতন ছেলের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আপনাকে বিশ্বাস করাটাই আমার ভুল ছিলো, একটা ছোটো লোক, ঠগ, জোচ্চোর, প্রতারক। কোন সাহসে ফোন করেছো আমায় ?? " 

 "মধু আমি কলকাতাতে এসছি, একবার দেখা করো, আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো জ্বালাবো না শুধু একবার দেখা করো" বেশ মিনতির স্বরেই বলল অজয়।

"আমি কাল তোমার জন্য বিকেল ৫টায় অপেক্ষা করবো, তুমি যেই পার্কটার কথা বলেছিলে সেই পার্কটায়।" বলল অজয়।
 "ভেবে দেখবো" বেশ রেগেই এই বলে ফোনটা রেখে দিল মধু।

"সে কি যাবে দেখা করতে অজয়ের সাথে, একটা ঠগ, জোচ্চোর ছেলের সাথে দেখা করা কি ঠিক হবে?? আচ্ছা অসুবিধা কি আছে, পার্কের আশেপাশে তার অনেক বন্ধু বান্ধব থাকে, আর বিকেল ৫টায় তো অনেক লোক থাকে কিছু বেগতিক দেখলে চিৎকার করে লোক জড়ো করবে সে। মধু ঠিক করলো সে যাবে, একবার হলেও গিয়ে জানতে চাইবে কেনো অজয় খেললো তার মন নিয়ে, কি মজা পেলো এতে সে।।।" মনে মনে এসব ভাবতে লাগলো মধু।

বিকেল ৫টা, পার্কে এসে পৌঁছালো মধু, কিন্তুু অজয়কে তো দেখতে পাচ্ছে না সে। 

মধু ফোন করলো অজয়কে, " কোথায় তুমি ?"

"আমি জানতাম তুমি আসবে" বেশ খুসির সাথে উত্তর দিল অজয়।

"পেছনের দিকের গেটটার সামনে যেই বেঞ্চটা আছে আমি সেটাতে বসে আছি।" উত্তর দিল অজয়।


"হম দেখেছি, টুপি পরে বসে আছো?? " । জিজ্ঞাস করলো মধু।
"হম ঠিক, এসো" । এই বলে ফোনটা রাখল অজয়।

মধু সামনে গিয়ে দাড়ালো অজয়ের, "কিন্তু অজয় মাথা নিচু করে বসে আছে কেন? " মনে মনে ভাবল মধু।

কেমন আছো?? এই বলে হাত বাড়ালো মধু কিন্তুু অজয় হাতটা ধরলো না, এমন ভাব করলো যেন সে মধুর হাতটা দেখেইনি। বেশ রাগ হলো এবার মধুর।
"কি হলো মাথাটা কি তুলবে? দেখবে বলে ডেকে মাথা নিচু করে নাটক হচ্ছে?? ।" বেশ রেগেই বলল মধু।

 "মধু তুমি খুব সুন্দরী, অনেক স্বপ্ন ছিলো তোমায় দেখার, কিন্তুু যেনো ভগবান আমাদের সব স্বপ্ন পুরনো করতে দেয়না। অনেক সখ ছিলো কিন্তুু আজ যখন তুমি সামনে, তখন আমার আর তোমায় দেখার সাধ্য নেই।" বেশ দুঃখের সাথেই বলল অজয়।

 "কিসব বলেছো তুমি? " বেশ আশ্চর্য্য হয়েই জিজ্ঞাস করলো মধু।

ঠিকই বলছি মধু। সেদিন যখন তোমার ফোন রেখে অফিসে বেরোলাম, দেরি হয়ে গেছিলো বলে একটু জোরেই বাইকটা  চালাচ্ছিলাম। সামনে থেকে আসা একটা বাসের সাথে অ্যাকসিডেন্ট করলাম। ২০ দিন হসপিটালে ছিলাম কোমায়। জ্ঞান ফেরার পর বুঝলাম আমার চোখের দৃষ্টি চলে গেছে। চাকরিটাও চলে গেলো। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো কিন্তুু ভাবলাম একবার তোমায় জানানো দরকার। তাই আজ তোমার সাথে দেখা করতে এলাম। আর জ্বালাবো না তোমায়। কিন্তুু সত্যি বলছি আমি তোমায় ঠকাইনি, আমি জোচ্চোর নই। আমি সত্যি তোমায় খুব ভালোবাসি। আর যে কটাদিন বাঁচবো তোমায়ই ভালবাসবো। কিন্তুু সাথে আর থাকা হবেনা আমাদের। আজ আমি অন্ধ। আমি চাইনা আমার জন্য তুমি নিজের জীবন নষ্ট করো বা কেউ তোমার হাসি ওড়াক। আমি তোমার জীবনে কষ্ট বাড়াতে চাইনা l" এই বলে উঠে যেতে শুরু করলো অজয়। খুব ইচ্ছে হলো মধুর অজয়কে জড়িয়ে ধরে আটকাতে কিন্তুু পারলো না সে। আস্তে আস্তে ভিড়ের মধ্যে মিশে হারিয়ে গেলো অজয়।


আজ সকাল থেকে অজয় গতকালের কথাই ভাবছিল। কত সখ ছিলো তার নিজের মধুকে দেখার, কতো স্বপ্ন বেঁধেছিলো সে। সব শেষ তার। গতকালের পর আর কখনো দেখা হবেনা তাদের, আর কখনো তার ফোনে মধুর গলা শোনা যাবেনা।

হঠাৎ বেজে উঠলো ফোনটা।
"এই রিংটোনটা তো মধুর......!!!!!!" মুহূর্তে আনন্দে ভরে গেল অজয়ের মন।

"হ্যালো মধু......"খুশির সাথে বলে উঠল অজয় 

"হ্যালো আমি অ্যাপেলোও হসপিটাল থেকে বলছি। আপনি কি এই ফোনটি যার তাকে চেনেন ? ওনার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, আপনার নাম্বারটা ওনার ফোনের কল লিস্টের সবার প্রথম থাকায় আপনাকে ফোন করা হলো। সম্ভব হলে একবার আসুন। " ফোনটা রেখে দিল অজয়।

হসপিটালের বিছানায় শুয়ে মধু। অজয়কে দেখে নার্স বললো " আপনি কি পেশেন্টের সাথে???

"হম...হম..আমায় ফোন করা হয়েছিল সকালে.." বলল অজয়।. 

"আচ্ছা...আচ্ছা....পেশেন্ট এখন ভালো আছে কিন্তুু সে নিজের চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে।" 

শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লো অজয়। 

" একি হলো তার মধুর সাথে। ভগবান কেন করলো এরম।" মনে মনে বলল অজয়।

সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ জ্ঞান এলো মধুর।  "আপনাকে পেশেন্ট ভেতরে ডাকছে.." এসে অজয় কে জানালো নার্স।

অজয় ঘরে প্রবেশ করে মধুর নাম ধরে দেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল,

অজয়ের গলা শুনে মধু বলল " অজয় তুমি এসছ...?"

 "হম.....মধু.." কাঁদো কাঁদো সুরে বলল অজয়।

"তুমি কাদছ কেন,  এটাই তো নিয়তির পরিহাস,  সেদিন তোমায় না বুঝে আজে বাজে বলেছিলাম তাই ভগবান আমায় শিক্ষা দিলো, এখন থেকে আমিও অন্ধ। একা ছিলাম, এবার আরো একা হয়ে গেলাম ।।" বেশ এক আক্ষেপের সুর মধুর গলায়।

 দুঃখে প্রাণটা কেদে উঠলো অজয়ের। অনেক সাহস করে মধুকে বললো " আমায় বিয়ে করবে মধু ? " 

মধু একটু হেসে বললো, " কি বলবো বলো, আমি অন্ধ, আমার কি আর বলার আছে, তুমি যদি সুখী হতে পারো আমায় নিয়ে তাহলে ঠিক আছে আমি তোমায় বিয়ে করতে রাজি ।।"



আজ দেখতে দেখতে তিন মাস কেটে গেছে অজয় আর মধুর বিয়ের।বেশ সুখেই আছে দুজনে। অজয় অন্ধদের স্কুলে ইংরাজি পড়ানর চাকরী পেয়েছে। কোনো কষ্ট রাখেনি সে মধুর। সত্যি আজ দুজনেই তারা খুশি একসাথে। আজ আবার অজয়ের জন্মদিন। মধু আবার কেক অর্ডার করেছে অজয়ের জন্য।

 হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠলো।

মধু বললো দাড়াও কেকটা এসে গেছে মনে হয় নিয়ে আসি । এই বলে মগেট খুলতে গেলো মধু । 

হঠাৎ মধুর ফোন বাজছে শুনে আজয় বলল  "মধু তোমার ফোন বাজছে"

মধু বাইরে থেকে বলল "ধরে দেখো কে....আমি কেক এর ডেলিভারী নিচ্ছি" ।

অজয় ফোন ধরলো....

ওপাশ থেকে একটা স্বর ভেসে এল " হ্যালো মিস মধু, আপনি তিন মাস আগে নিজের চোখ ডোনেট করেছিলেন তো আপনাকে তিন মাস পর একটা আই চেকআপ এ আস্তে বলা হয়েছিল। আমি সেটা মনে করা তেই ফোন করলাম। আমি তালে আপনার অ্যাপয়েন্ট মেন্ট টা কি আগামী সপ্তাহে রাখবো ??"
শুনে হাত থেকে ফোনটা পরে গেলো অজয়ের। পাশের ঘর থেকে মধুর আওয়াজ এলো
" কার ফোন ছিলোগো? দেখো তোমার কেক এসে গেছে। এবার বলো জন্মদিনে কি উপহার চাই তোমার??"

অজয়ের আর কোন কথা বেরোলও না শুধু ভালবাস আর কৃতজ্ঞতার ভাবে দুচোখ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

Friday, June 4, 2021

সুখ

" বাহ বেশ ভাল দেখতে তো বাড়িটা...অনেক টাকা খরচা করে বানানো " মনে মনে কথাটা ভাবলো রমেন।

আজ তিনমাস হলো সেলসম্যানের কাজে ঢুকেছে রমেন। তার ইচ্ছে খুব বড়লোক হবে। অনেক টাকা রোজগার করে তিথিকে খুব খুশি রাখবে। প্রায় তিন বছর হতে যায় তাদের সম্পর্কের। খুব ভালোবাসে রমেন তাকে।

তবে শেষ এক সপ্তাহ ধরে কোনো বিক্রি হয়নি রমেনের। বস তাকে বলে দিয়েছে নয়তো বিক্রি করো নাহলে পরের সপ্তাহে কাজ ছেড়ে দাও। রমেন এক একবার ভাবে কাজটা ছেড়ে দেবে কিন্তু ভয় পায় যে কাজটা ছেড়ে দিলে যদি তিথিকে খুশি না রাখতে পারে সে। টাকা ছাড়া কি আর সুখ হয় ????

অগত্যা রমেন ঠিক করলো এই বাড়িটাতেই কিছু বিক্রির চেষ্টা করবে।
যেমন ভাবনা তেমনি কাজ, কলিংবেল টিপলো রমেন।

রমেন : ম্যাডাম আমি "হ্যাপি টেক সার্ভিস" থেকে আসছি। ম্যাডাম আমাদের....

"ইসস.., এত দামের হারটা কিভাবে ফেলে রেখেছে, ফালতু মেয়ে একটা, একে বিয়ে করাটাই আমার ভুল হয়েছিল।" আওয়াজটা ভেতর থেকে এক পুরুষের কণ্ঠে এলো।

বেশ রাগের একটা আমেজ বুঝতে পারলো রমেন। একটা রাগ রাগীর মাঝে এসে পড়েছে দেখে রমেন বললো : ম্যাডাম আমি পড়ে আসছি।

মহিলা : "না দাড়ান, আপনি যাবেন কেনো ?"

"এই তুমি দামের গল্প কাকে শোনাচ্ছ ? আমায় কি গরীব পরিবারের ভেবেছো নাকি ? তোমার মতন লোককে আমার বাবা বাড়ীতে চাকর রাখবে। " ভেতরে নিজের স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে চললো মহিলা।

মহিলা : কি দিয়েছো যে এত শোনাচ্ছ ? ওরম লাখ খানেকের হার আমি বহু দেখেছি,
এরম একটা মানুষকে বিয়ে করাটাই ভুল হয়েছে। সারাদিন খালি টাকা টাকা, জীবনটা নষ্ট করে দিলো আমার ।

পুরুষ : টাকা টাকা করবো না তো কি করবো, এই বাড়ি গাড়ি সব কি আকাশ থেকে পড়েছে ? সব সুখ তো এনে দিয়েছি তোমাকে, 
সত্যি বলতে তোমায় বিয়ে করাটাই ভুল ছিল ।

অবস্থা বেগতিক দেখে কিছু না বলেই আসতে আসতে বেড়িয়ে এলো রমেন।

রমেন : "না এই বাড়িতেও বিক্রি হলো না, দেখি অন্য কোথাও যদি বিক্রি করা যায় ।" 

ঘুরতে ঘুরতে বিকেল গড়িয়ে এলো, তবে বিক্রি এখনও হলো না একটাও। এদিকে রোদে ঘুরতে ঘুরতে খুব জোর জল তেষ্টা পেয়েছে রমেনের। দুপুর বেলা একটা দোকানও খোলা নেই, ব্যাগের জলটাও গেছে শেষ হয়ে।
অগত্যা এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একটা ছোট দরমার বাড়ি চোখে পড়লো রমেনের।
রমেন ভাবলো একটু জল চাওয়া যাক।

বাড়ির বাইরে গিয়ে আওয়াজ দিলো রমেন : " কেউ আছেন ? আছেন নাকি কেউ ? "

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো এক মধ্যবয়সী মহিলা। পড়নে একটা জীর্ণ শাড়ী। জায়গা জায়গা থেকে ফেটে গেছে শাড়ীটা।

মহিলা : "কি চাই ?"

রমেন : " না মানে একটু খাবার জল হবে ? সকালে কাজে বেড়িয়েছি দুপুরে রোদে ঘুরতে ঘুরতে জলটা গেলো শেষ হয়ে। তাই যদি একটু জল দেন..."

মহিলা : " নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই ।"

"কে এসে ছে গো ?" ভেতর থেকে এক পুরুষ কণ্ঠে আওয়াজটা এলো।

মহিলা : " আরে কেউনা ওই এক দাদা একটু জল চাইছেন ।"

পুরুষ : " ও আচ্ছা, হম যা গরম ।তো দাদা কে জিজ্ঞাস করো কাঁচা আমের সরবত খাবে নাকি ?"

মহিলা : " দাদা খাবেন ? দাড়ান খেয়ে যান, 
আমার বর ওই রোজ কাজ থেকে ফিরে সেই আমার জন্য সরবত নয়তো চা এসব বানাতে বসবে। সে বলে সারাটা দিন ও যেমন বাইরে কাজ করে আমিও তেমনি ঘর সমালাই তাই বিকেল থেকে সমস্ত কাজ আমরা দুজনে মিলে করবো।
জানেন বাবা মানা করেছিল, বলেছিল কামায় কম, কি করে থাকবি !!! 
কিন্তু জানেন দাদা সত্যি আমি ভালো আছি,
এমা এই দেখুন আপনাকে দাড় করিয়ে রেখেছি,
দাড়ান দাড়ান ।
"এই তোমার হলো সরবত ? দাদা আর কতক্ষন দাড়িয়ে থাকবে, একটু জলদি করো । ভেতর থেকে টুলটা দাও তো....." এই বলতে বলতে ঘরের ভেতর ঢুকলো মহিলা...

সন্ধ্যে বেলা বসের কেবিনে ঢুকলো রমেন।

রমেন : "স্যার আসতে পারি ?"

বস : "হম..হম..., এসো, আজ সেল হয়েছে ? কটা হল ?? এই মাসটায় টার্গেটটা পূর্ণ করো নয়তো কিন্তু..."

"স্যার এইটা" এই বলে একটা কাগজ রমেন বাড়িয়ে দিলো বসের দিকে।

বস : " কি এটা ? "

রমেন : " স্যার আমার রেজিগনেসান "

বস : " কি !!! রেজিগনেসান??? পাগল হলে নাকি? কাজ ছাড়ছ ?"

রমেন : " না স্যার। পাগল হয়নি, সুস্থ হলাম।সকাল থেকে সন্ধে শুধু আপনার কোম্পানীর সেলসের কথা ভাবি, রাতে বাড়ি ফিরেও ভাবি কি ভাবে পরের দিন কোথায় সেল করবো, কতদিন হয়ে গেছে বাড়ির কারুর সাথে ভালো করে কথা বলিনি, কতদিন তিথিকে নিয়ে ঘুরতে যাইনি, ও ফোন করলে কথা না বলেই ঘুমিয়ে পড়েছি, রাত রাত ভর ও জেগে থাকে আমার ফোনের আসায় আর আমি !!! আমি আপনার কোম্পানীর সেলস বাড়ানোর স্কীম ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি।
না স্যার, আপনার চাকরি আপনি রাখুন।
আমি নিজের আপনজনদের খুশি রাখি।
ভালো থাকবেন, পারলে আমার বলা আজকের কথাগুলো একবার ভেবে দেখবেন ।।"

অফিস থেকে বেরিয়ে অনেকদিন পর বেশ হালকা লাগছিল রমেনের।

" হ্যালো তিথি " তিথিকে ফোন করে বললো রমেন।

তিথি : " বলো আজ এত জলদি ফোন ?"

রমেন : " ওসব রাখো, বলছি ভালো কি সিনেমা রিলিজ হয়েছেগো ? কাল দেখে আসি চলো ।"


Thursday, June 3, 2021

ম্যাজিক

দাড়োয়ান : কাকে চাই ?

প্রশ্নটা শুনে একটু রুখে দাড়ালো সৌরভ..

সৌরভ : অবিনাশ ভেতরে আছে ? ওকে বলো সৌরভ এসছে। ফোনে কথা হয়েছিল ওর ছোট বেলার বন্ধু।

দাড়োয়ান ভিতরে গিয়ে অবিনাশ কে বললো..
দাড়োয়ান : বাবু আপনার সাথে একজন সৌরভ বলে কে দেখা করতে এসছে। বললো আপনার সাথে ফোনে কথা হয়েছিল...আপনার ছোটবেলার বন্ধু..।
অবিনাশ : সৌরভ...? 
হমম........(একটু চিন্তিত ভাবে)
আচ্ছা পাঠাও দেখি..

দাড়োয়ান বাইরে এসে বললো : বাবু আপনাকে ভেতরে যেতে বলেছে..
ঘরের ভেতর ঢুকলো সৌরভ। হাতে তার একটা ছোট্ট বক্স। নিজের বড়লোক বন্ধুর বাড়িতে ঢুকতে একটু কিন্তু কিন্তু ভাব হচ্ছিল সৌরভের। সেই কোন ছোটবেলার বন্ধু....আজ ৩০ বছর হয়ে গেল কোনো যোগাযোগ হয়নি..এতদিন পর..কি জানি কি ভাববে...

অবিনাশ....পেছন থেকে ডাকলো সৌরভ...
সৌরভ : চিনতে পারলি...?
অবিনাশ : ( একটু ভালোকরে সৌরভের জীর্ণ পোশাকটা দেখে বললো..)
হম....রামমোহন প্রাইমারি স্কুল...কেমন আছিস ? 
কি করিস এখন ?

সৌরভ একটু খুশি হলো তার বন্ধুর তাকে মনে আছে দেখে...
সৌরভ : এই চলছে রে ভাই....পড়াশুনা তো বেশিদিন করতে পারলাম না টাকার অভাবে...সখেই গ্রামের নবীন জ্যাঠার থেকে একটু ম্যাজিক শিখেছিলাম...এখন সেই  ম্যাজিক দেখিয়েই দু পেট চলে যাচ্ছে রে ভাই...

অবিনাশ : ভাই....(এবার একটু অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকালো অবিনাশ)
তা কোন রাস্তায় বসে ম্যাজিক দেখাস ...??? ( একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে জিজ্ঞাস করলো অবিনাশ )

সৌরভ : নারে ভাই...মনোরমা সার্কাস বলে একটা দলের সাথে কাজ করি....
অবিনাশ : ( এবার একটু রেগে গিয়ে...)
কি ভাই ভাই করছিস....
তোর আমি ভাই হই নাকি....
শালা ফুটপাতের দুটাকার ম্যাজিশিয়ান...
আমার একটা স্ট্যাটাস আছে...দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ীদের মধ্যে আমি একজন... আর তুই শালা দু টাকার ম্যাজিশিয়ান আমায় বলছিস ভাই.....ছোটলোক শালা...

সৌরভ : তুই আমায় ভুল বুঝছিস রে......
অবিনাশ : কি ভুল বুঝবো...বড়লোক বন্ধুর নাম যশের খবর পেয়ে টাকা চাইতে এসছিস তো ? তোর মতন এরম বহু ভিখারী রোজ আমার দুয়ারে আসে...

এই বলে সৌরভকে হাত ধরে টেনে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেল অবিনাশ..
ভেতরের এই ঘরটায় অবিনাশের জন্মদিনের পার্টি চলছিল।

অবিনাশ : এই দেখ...এই হচ্ছে আমার স্ট্যাটাস..
ভাই...ভাই করছে...ছোট লোক..
এই দাড়া দাড়া...
এই এই সবাই দেখো...আমাদের মাঝে এক বিশাল বড় ম্যাজিশিয়ান এসছে....
যেনো যেনো এই ম্যাজিশিয়ান এর স্পেশালিটি কি....
(হাসতে হাসতে বললো অবিনাশ...)
এই ম্যাজিশিয়ান এর স্পেশালিটি হলো বড়োলোক বন্ধুর থেকে টাকা চাওয়া...
(অট্টহাসি হেসে উঠলো অবিনাশ)
সাথে সাথে উপস্থিত সমস্ত লোকেরা সৌরভের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকলো...
খুব অপমানিত বোধ হচ্ছিলো সৌরভের...অপমানের জোরে যেনো নিজের কথা বলার শক্তিটাই হারিয়ে ফেলেছিল সৌরভ...তবুও অনেক কষ্টে বললো সৌরভ...
সৌরভ : তুই আমায় ভুল বুঝছিস অবিনাশ..
অবিনাশ : চুপ কর শালা ছোট লোক...
ভুল...আমি ভুল বুঝছি...
(এবার রেগে গিয়ে...)
এই শালা ম্যাজিশিয়ান তোর টাকা চাই তো....? শোন শালা তোকে ফোকোটে টাকা দেব না..
তুই ম্যাজিশিয়ান তো....চল তোর ম্যাজিক দিয়ে আমাদের খুশি কর...খুশি করলে টাকা পাবি...

অপমানে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল সৌরভের...সত্যি হয়ত তার ভুল হয়েছে গরীব হয়ে তার বড়োলোক বন্ধুর কাছে সাহায্যের জন্য আসা...
এসবই ভাবছিল সৌরভ...আবার অবিনাশ বলে উঠলো...
অবিনাশ : কি রে ম্যাজিশিয়ান...কই দেখা তোর ম্যাজিক...নাকি বড়োলোকের কাছে টাকা চাওয়া টাই তোর ম্যাজিক....(বলে হেসে উঠলো অবিনাশ...সাথে হেসে উঠলো উপস্থিত সমস্ত লোকজন)

এত অপমানের পরও নিজেকে অনেক কষ্টে সামলালো সৌরভ...বারবার খালি ভেসে উঠছিল তার মেয়ের মুখটা যার কাছে বড় মুখ করে সৌরভ বলে এসছিল যে তাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করার জন্য টাকা আজ সে জোগাড় করে আনবেই...
আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে ম্যাজিক দেখাতে এগিয়ে এলো সৌরভ...
তার সাধ্য মতন ম্যাজিক দেখালো সৌরভ...পায়রার ম্যাজিক... তাসের ম্যাজিক.. আরও অনেক কিছু..কিন্তু কিছুতেই যেনো মন গল্লো না অবিনাশের...ক্রমাগত হাসি উড়িয়ে গেলো তারা সৌরভের...
শেষে বাধ্য হয়ে থামলো সৌরভ...
তখনও হেসে চলেছে সবাই...

অবিনাশ : কি রে থেমে গেলি ? শেষ তোর ম্যাজিক ? ( হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলো অবিনাশ)

সৌরভ উত্তর করলো না...শুধু চুপ করে দাড়িয়ে রইলো..
অবিনাশ : ওমা....ম্যাজিশিয়ানের রাগ হোয়েছে...(ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে হেসে বললো অবিনাশ)... আচ্ছা আচ্ছা এই নে এই নে টাকা লাগবে... এতো কষ্ট করে এসব হাবিজাবি দেখালি... এইনে রাখ...

এই বলে একটা ২০০০ টাকার নোট তাচ্ছিল্যের ভাবে ছুড়ে দিল সৌরভের দিকে...

সৌরভ টাকাটা উঠিয়ে অবিনাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো...

সৌরভ : ভাই...তুই আমায় ভুল বুঝলি...যাই হোক তুই খুশি হয়ে তোর সাধ্য মতন সাহায্য করেছিস আমায়...আজ তোর জন্মদিন...এই উপহারটা তোর জন্য এনেছিলাম..এখানে রাখলাম...

এই বলে হাতের বক্সটি একটা টেবিলের উপর রেখে আসতে আসতে বেরিয়ে গেলো সৌরভ...

রাত্রি বেলা বেডরুমে এসে জামা কাপড় ছাড়তে ছাড়তে হঠাৎ সৌরভের আনা ছোট বক্সটার দিকে চোখ গেল অবিনাশের...

অবিনাশ নিজের চাকরকে জিজ্ঞাস করলো...
অবিনাশ : এই ছোট বক্সটা কে এনেছিল ?
চাকর : এইটা....এইটা তো বাবু আপনার বন্ধু এনেছিল...আপনি বললে আমি এটা বাইরে ফেলে আসছি...

এই বলে বক্সটা নিতে এগোলো অবিনাশের চাকর...
হঠাৎ অবিনাশের কেমন যেনো মায়া হলো..তার মনে পড়ে গেলো ছোট বেলার তাদের সেই বন্ধুত্বের কথা গুলো...সেই গ্রামের স্কুলে পড়া...ছুটির পরে মিত্তিরদের বাড়িতে পেয়াড়া চুরি করা..সব যেনো ভেসে উঠলো তার চোখের সামনে...মনে মনে কেমন যেনো একটা স্নেহ জেগে উঠলো তার ছোট বেলার বন্ধুর জন্য...

অবিনাশ : না না থাক....ফেলতে হবে না...যাও তুমি...

চাকর : আচ্ছা বাবু...

এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো চাকরটি।

অবিনাশ যেন কেমন হারিয়ে গেলো বক্সটার দিকে তাকিয়ে....ছোট বেলার সমস্ত স্মৃতি গুলো যেনো ক্রমশ মনে পড়তে লাগলো তার আর খালি বারবার মনে হতে লাগলো কি ভুল টাই না করলো..
এতো লোককে সাহায্য করে সে...আর ছোটবেলার এক বন্ধু সাহায্য চাইতে এসছিলো বলে সে এমন করলো....ইস... ছিছি...এমন করাটা ঠিক হয়নি...আসলে মদের নেশায় তখন রাগটা এমন চড়ে গেল... ইসস...খুব ভুল হলো...
কিন্তু এখন উপায় কি....সৌরভের তো ফোন নাম্বার টাও নেই তার কাছে...
এসবই ভাবছিল অবিনাশ হঠাৎ তার মনে পড়লো সৌরভ বলেছিল সে কোন এক মনোরমা সার্কাসে ম্যাজিক দেখায়। সাথে সাথে কম্পিউটারটা অন করে গুগলে মনোরমা সার্কাস সার্চ করতেই মনোরমা সার্কাস বলে একটা আর্টিকেল চোখে পড়লো অবিনাশের। একটা ফোন নম্বরও দেওয়া আছে সাথে..
নাম্বার টা মিলিয়ে ফোন করলো অবিনাশ....
রিং হয়ে কেটে গেলো ফোনটা...
একটু উদাস হয়ে ফোনটার দিকে তাকিয়ে ছিল অবিনাশ হঠাৎ ঘড়ির ঢং ঢং শব্দে হুস ফিরলো তার....
ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো রাত ১০ টা। মনে মনে ভাবলো এতো রাতে কোন সার্কাস খোলা থাকবে..যাক কাল সকালে অফিসে যাবার পথে দেখবো। এই বলে বিছানায় শুয়ে ছোট বেলার স্মৃতিগুলো ভাবতে ভাবতে কখন যেনো ঘুমিয়ে পড়েছিল অবিনাশ...
সকালে ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙলো অবিনাশের...
অবিনাশ ঘুম চোখে ফোনটা ধরলো...
অবিনাশ : হ্যালো....অবিনাশ ব্যানার্জী স্পিকিং...
অচেনা ব্যক্তি : কাল রাতে এই নাম্বার থেকে ফোন এসছিল..

অবিনাশের মনে পড়ে গেলো কাল রাতের কথা গুলো। তাড়াতাড়ি বিছানায় উঠে বসলো অবিনাশ।

অবিনাশ : হ্যালো... হ্যালো...মনোরামা সার্কাস ?

অচেনা ব্যক্তি : হম মনোরমা সার্কাস...বলুন...কি দরকার..

অবিনাশ : বলছি আপনাদের ওখানে সৌরভ মন্ডল বলে কেউ কাজ করে ? ওই ম্যাজিক দেখায়..

অচেনা ব্যক্তি : হম...সৌরভ মন্ডল কাজ করে..

অবিনাশ : বলছি সে আমার বন্ধু...তার সাথে একটু দরকার ছিল..তার কন্টাক্ট নাম্বারটা একটু পাওয়া যাবে....

অচেনা ব্যক্তি : সরি...আমাদের এম্প্লয়ী দের কোন রকম ইনফরমেশন আমরা কাউকে দি না..আপনার বাকি কিছু দরকার থাকলে আমাদের অফিসে এসে কথা বলুন..

অবিনাশ ভাবলো ঠিক আছে চলো কাল ওভাবে অপমান করেছি..নিজে গিয়ে সামনা সামনি কথা বলাটাই বেশি ভালো হবে..
অবিনাশ : ঠিক আছে ঠিকানাটা বলুন একটু...

ঠিকানাটা নোট করে ফ্রেশ হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরলো অবিনাশ।

আজ তার যেনো একটা আলাদাই আনন্দ হচ্ছিলো মনে মনে...ছোটবেলার বন্ধু...এতদিন পর আবার একসাথে...উফফ কত কথাই না হবে...আর কালকের জন্য সৌরভ ক্ষমা করে দেবে..ছোট থেকেইতো ও জানে অবিনাশের মাথা গরম। ছোট বেলাতেও তো কত বার এমন হয়েছে...এসব ভাবতে ভাবতে সেই ঠিকানায় এসে পৌঁছালো অবিনাশ..
কিন্ত কোথায় অফিস... এ তো শুধু ফাঁকা মাঠ আর মাঠের মাঝে একটা বড়ো কালো তাঁবু...
অবিনাশ মনে মনে ভাবলো সার্কাসের অফিস তো এরম তাঁবুই হবে...
মনে মনে একটু হেসে নিয়ে ধীরে ধীরে তাবুর দিকে এগোলো অবিনাশ।
তাঁবুর ভেতর ঢুকে অবিনাশ দেখলো একটা লোক একটা কালো আলখাল্লা পড়ে বসে আছে একটা টেবিলের সামনে..।
অবিনাশ তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো...
অবিনাশ : নমস্কার...আমার নাম অবিনাশ ব্যানার্জী..আমি আপনাদের এখানে কাজ করে সৌরভ মন্ডল.. ওর ছোটবেলার বন্ধু...একটু দেখা করতে এসছি সৌরভের সাথে..একটু যদি ডেকে দেন..

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : হম বুঝলাম....কিন্তু আমার এমপ্লয়ীদের সাথে তো আমার অনুমতি ছাড়া দেখা করা যাবে না....

অবিনাশ : মানে....মানেটা কি ? আমার বন্ধুর সাথে আমি দেখা করবো এতে আপনার অনুমতির কথা আসছে কোথা থেকে...( বেশ রাগের সাথেই চিৎকার করে বললো অবিনাশ )

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : চিৎকার করে লাভ হবেনা মিস্টার অবিনাশ...যদি দেখা করতে হয় তাহলে আমার অনুমতি নিতে হবে...আর নয়তো আপনি আসতে পারেন...

অবিনাশ রেগে গিয়ে বললো..
অবিনাশ : তুমি জানো আমি কে...
তোমার মতন কত লোক আমার অফিসের বাইরে দাড়িয়ে থাকে...আমি এখুনি চাইলে তোমার এই সার্কাস বন্ধ করিয়ে দিতে পারি।

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : সে হয় তো আপনি পারেন....কিন্তু এখন আপনার বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলে আমার অনুমতি নিতে হবে...নাহলে দেখা পাবেন না।

অবিনাশ এবার বিরক্ত হয়ে বললো...
অবিনাশ : ঠিক আছে...কি করতে হবে অনুমতি পেতে বলো...

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : তেমন কিছু না...শুধু আমার সাথে বসে ৫ দান তাস খেলতে হবে...

অবিনাশ এবার আরও রেগে গিয়ে বললো...

অবিনাশ : এই তুমি কী পাগল ?? দেশের বড়ো ব্যবসায়ীদের মধ্যে আমি একজন আর তুমি চাইছো আমি সময় নষ্ট করে এখন তাস খেলতে বসি তোমার সাথে...
তোমার মতন মানুষের সাথে কথা বলতে যাওয়াটাই ভুল...ফালতু সময় নষ্ট শুধু শুধু... রাখো তোমার অনুমতি তোমার কাছে...আমার দরকার নেই দেখা করার...আর দাড়াও তোমার এই সার্কাস আজকের মধ্যেই কি ভাবে বন্ধ করতে হয় আমি দেখছি...আমার স্ট্যাটাস সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তোমার...

এই বলে তাঁবু থেকে বেরোতে যাবে অবিনাশ হঠাৎ আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি বলে উঠলো...

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : মিস্টার অবিনাশ.... হীরা তো আপনি নিশ্চই প্রচুর দেখেছেন...কিন্তু এরম হীরা কখনো দেখেছেন কি...

বলে একটা পিংপং বলের মাপের একটা হীরা সামনে বার করে রাখলো...
না সত্যি অবিনাশ এরম হীরা দেখেনি কখনো...বেশ লোভ হলো অবিনাশের...সে হাতে নিয়ে হীরাটা কে নেরেচেরে দেখলো...একদম আসল হীরা এবং এই হীরা থেকে কেমন এক আশ্চর্য আলো বেরোচ্ছে যা যেনো অবিনাশ কে মোহিত করে তুলছে...অবিনাশের কেমন যেনো জেদ চেপে গেলো যে হীরাটা তাকে পেতেই হবে...

অবিনাশ : কত দাম এইটার ? তুমি যা দাম বলবে পেয়ে যাবে...দাম বলো...

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : এই হীরা বিক্রি হয় না মিস্টার অবিনাশ...এই হীরা জিততে হয়...আমিও জিতেছিলাম...আপনাকেও জিততে হবে...

অবিনাশ : কি করতে হবে বলো...

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : ওই যে বললাম ৫ দান তাস খেলতে হবে...সেখানে জিতলে হীরাও পাবেন আর বন্ধুর সাথে দেখা করার অনুমতিও....

অবিনাশ বেশ কিছুক্ষন ভাবলো...
তাস তো সে ভালই খেলতে তার কপাল ও ভালো যায় তাসে.. আর অসুবিধা কি আছে তাকে তো আর কিছু লাগাতে হচ্ছে না। জিতলে ভালো আর না জিতলে পড়ে পুলিশ নিয়ে এসে এই ব্যাটাকে চুরির দায়ে ফাঁসিয়ে ব্যাটার থেকে হীরেটা নিয়ে নেবো..।

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : কি হলো মিস্টার অবিনাশ...ভয় পাচ্ছেন নাকি ?

অবিনাশ : ভয়.... তাও আবার এরম এক ফালতু সার্কাসের পাগল মালিককে...(হেসে উঠলো অবিনাশ)
অবিনাশ ব্যানার্জী কাউকে ভয় করে না....

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি  মুচকি হেসে বললো...
আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : তাহলে আর দেরি কিসের...এসো শুরু করা যাক...
তবে নিয়ম গুলো একবার শুনে নাও...
৫ দান তাস হবে...
প্রতি দানে যে জিতবে সে ওপর জনের শরীরে যেকোনো একটা পার্ট একবার ছুয়ে দেখতে পারে...
এভাবে ৫ দান অব্দি যে বেশি জিতবে সেই জয়ী হবে...।

অবিনাশ এবার একটু আশ্চর্য হল... এ কেমন নিয়ম...লোকটার মতলব ঠিকতো ? লোকটাকে দেখে একটু পাগলতো প্রথমেই মনে হয়েছিল এখন তো মনে হচ্ছে পুরোপুরিই পাগল...

আবার বলে উঠলো আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি..

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : কি অবিনাশ বাবু...রাজি তো নিয়মে ? খেলবেন তো ?

অবিনাশ : হম হম রাজি রাজি খেলবো..

শুরু হলো খেলা...
এবং আশ্চর্য ভাবে আজ যেনো অবিনাশের ভাগ্য একদমই তার সঙ্গে ছিল না...এক এক করে তিন দান জিতে গেল আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি এবং এক এক করে অবিনাশের হাত, পা, বুক ছুয়ে দেখলো ব্যক্তিটি...

অবিনাশ এবার বিরক্ত হয়ে বললো...
অবিনাশ : ঠিক আছে...অনেক হয়েছে....তুমি তিন দান জিতে গেছো...তো তুমিই জয়ী...আমি চললাম...

এই বলে উঠতে যাবে অবিনাশ...হঠাৎ আবার বলে উঠলো আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি...

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : মিস্টার অবিনাশ...এতো সহজে চলে গেলে হবে...খেলা তো ৫ দানের...এখনও তো দু দান বাকি...
আচ্ছা চলুন আপনার জন্য স্পেশাল অফার...বাকি দুই দানের যদি একটি ও আপনি যেতেন তাহলে আপনি জয়ী হবেন...

এবার অবিনাশ ভাবলো শেষ দু দান দেখেই নি যদি জিতে যাই...এই হীরে যেনো অবিনাশ কে আজ কেমন লোভী করে তুলেছে...তার মন যেনো সমস্ত রকম চেষ্টা করতে চাইছে সেই হীরেকে পাবার...

অবিনাশ এবার বললো : আচ্ছা ঠিক আছে...তবে এটাই শেষ দু দান এবং এবার তাস আমি দেব...

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তি : নিশ্চয়ই...

এই বলে তাসের বান্ডিলটা অবিনাশের দিকে এগিয়ে দিল আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি...

চতুর্থ দান শুরু হলো...কিন্তু এবারও ভাগ্য লক্ষ্মী অবিনাশ কে সাথ দিল না। ফের হারলো অবিনাশ এবং সাথে সাথেই আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি এসে হাত দিল অবিনাশের গলায়....খুব নোংরা যেনো সেই স্পর্শ...
অবিনাশ রেগে গিয়ে বললো...
অবিনাশ : উফফ...ভালো লাগছে না...তাড়াতাড়ি পরের দান শুরু করো...শালা ছোটলোক কোথাকার...

কিন্তু এবার আর কোনো উত্তর করলো না আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি..
শুধু একবার দেখলো অবিনাশের দিকে....মুখে যেনো তার কেমন একটা তৃপ্তির হাসির ছাপ...

শুরু হলো শেষ দান....
কিন্তু নাহ....পরিণামে কোনো পরিবর্তন হলো না। পুনরায় জিতলো সেই আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি...
এবং এবার সে যেনো বিদ্যুতের বেগে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো অবিনাশের পুরো মুখটা...
খুব অসহ্য লাগতে লাগলো অবিনাশের...একে হীরে হারানোর দুঃখ....তার উপর এই অসহ্যকর স্পর্শ....রাগে উঠে এক ধাক্কা মারে আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি কে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল অবিনাশ...
মুখ উল্টে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি কিন্তু তাতেও যেনো রাগ কমলো না অবিনাশের...
মাটিতে পড়ে থাকা আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটিকে মারার উদ্যোগে তার সামনে গিয়ে মুখটা নিজের দিকে ঘোরাতেই বুকের রক্ত হিম হয়ে গেলো অবিনাশের...

অবিনাশ : একি...... এ তো..... এ তো... এ তো আমি...

আলখাল্লা পড়া ব্যক্তিটি এখন হুবহু অবিনাশের মতন দেখতে...
নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছে না অবিনাশ...
তাড়াতাড়ি এক ঝটকায় উঠে দাড়ালো অবিনাশ....
উঠে দাঁড়াতেই সামনে রাখা আয়নাটায় চোখ গেলো অবিনাশের...
সামনের আয়নায় অবিনাশের প্রতিবিম্ব পড়ছে কিন্তু এ মুখ... এ মুখ তো অবিনাশের না... এ মুখ তো...সেই আলখাল্লা পড়া লোকটার...

অবিনাশ রাগের সাথে চিৎকার করে জিয়াগস করলো...

অবিনাশ : একি করেছো....কে তুমি ????
 
এবার আবার আশ্চর্য হলো অবিনাশ...
এ গলা তার নয়...তাহলে কার আওয়াজে কথা বলছে সে...পরক্ষনেই তার মনে পড়লো... এ তো.... এ তো সেই আলখাল্লা পড়া লোকটার আওয়াজ....কিন্তু এ কি করে সম্ভব....

এবার উত্তর দিলো আলখাল্লা পড়া লোকটি...

আলখাল্লা পড়া লোক : আমি কে...
অট্টহাসি হেসে জবাব দিলো লোকটি...
আমি অবিনাশ ব্যানার্জী...দেশের বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন...

একি.... এ যে অবিনাশের গলা...

নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিলনা অবিনাশ...একি হলো তার সাথে...আবার কি করবে সে...

মুহূর্তের মধ্যে যেনো সব কিছু হারিয়ে গেলো অবিনাশের...তার পরিচয়...তার নাম যশ সমস্ত কিছু যেনো মুহূর্তের মধ্যেই চলে গেলো তার থেকে...রাগে দুঃখে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ল অবিনাশ...
মুহুর্তেই ঠিক করলো...তার নাম যশ যদি সে ভোগ না করতে পারে তাহলে কাউকে সে তা ভোগ করতেও দেবে না...
মুহুর্তেই মধ্যেই সামনের লোকটিকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে পড়ে থাকে একটা লোহার রড হাতে নিয়ে আক্রমণ করতে এগোলো অমনি তার পায়ে কিছু একটা বেঝে সে হুড়মুড়িয়ে পড়লো তাঁবুর দেওয়ালে এবং দেওয়াল সমেত ভেঙে পড়লো মাঠের উপর...সূর্যের আলোতে ভরে গেলো তার মুখ.......



"বাবু.... ও বাবু....উঠবেন না...বেলা বয়ে গেলো যে..." চিৎকার করে করে ডাকছে অবিনাশের চাকর...

বেলার রোদ এসে পড়ছে অবিনাশের মুখে...
চোখ খুলেই তাড়াতাড়ি উঠেই সামনে আয়নার দিকে তাকালো অবিনাশ...

হ্যাঁ....আয়নার প্রতিবিম্বের মুখ অবিনাশেরই..

চাকর বলে উঠলো : বাবু সেই কখন থেকে ঘুমাচ্ছেন....কাল রাতে আপনার বন্ধু চলে যাবার পরই তার দেওয়া বক্সটা নিয়ে রুমে চলে এলেন পার্টি ছেড়ে...সবাই কত ডাকলো আপনাকে...কোনো সাড়া শব্দ দিলেন না...রাতে খেলেনও না...আজ এত বেলা হয়ে গেছে উঠছেন না দেখে ডাকতে এলাম আপনাকে...দেখলাম এই বক্সটা বুকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছেন...
 
এই বলে চাকর একটা বক্স এগিয়ে দিল অবিনাশের দিকে...

অবিনাশ বক্সটা তাড়াতাড়ি খুললো...

বক্সের ভেতর একটা ছোট্ট কাগজে লেখা....

" আসা করি তোকে একটা ভালো ম্যাজিক দেখাতে পারলাম...মনেহয় এবার সার্কাসের নামটা ভালোই মনে থাকবে তোর...পারলে কখনো দেখে যাস "ভাই"...
ভালো থাকিস..
শুভ জন্মদিন.."