রাজেশ তার ছোটবেলার বন্ধু ছিলো কিন্তুু এভাবে হঠাৎ করে রাজেশের মারা যাওয়াটা ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারছেনা বিকাশ। আজ সকালে রাজেশের ভাই ফোন করে খবরটা দেবার পর থেকেই যেনো আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেনা বিকাশ। কদিন আগেই তো ফোনে কথা হলো তার রাজেশের সাথে। ভালোই তো কথা হয়েছিলো, রাজেশ বলেছিল একদিন তার ফ্ল্যাট দেখতে আসবে, কিন্তুু একি হয়ে গেলো, আজ আর রাজেশ নেই, না সত্যি এটা মানতে পারছেনা বিকাশ। অনেক কষ্টে মনকে শক্ত করলো বিকাশ, শেষ দেখাটা সে দেখতে যাবে রাজেশকে, যাবে সে নিজের ছোটো বেলার বন্ধুর শেষ যাত্রায় তার সঙ্গী হতে। নিজের গ্রামের পথে রওনা দিলো বিকাশ। আজ তার নিজের গ্রামের চেনা পথ গুলো খুব যেনো একা লাগছিলো। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার এবং রাজেশের এই পথ ঘাটে। সেই ছোটো বেলায় বিকালে একসাথে খেলতে যাওয়া, লোকের বাড়ির বাগান থেকে ফল চুরি করা, কতো আনন্দের দিন ছিলো কিন্তুু আজ তার বন্ধু, তার সঙ্গী তাকে চিরো কালের মতো ছেড়ে চলে গেলো। অবশেষে রাকেশের বাড়ি পৌঁছালো সে। উঠনেই রাখা হয়েছে রাজেশের নিষ্প্রাণ দেহটা, পাশে বসে কেদে চলেছে তার হতভাগী মা। বিকাশ যেনো তাকাতে পারছিলনা রাজেশের সেই মুখের দিকে, কান্নায় ফেটে যাচ্ছিলো তার বুক, মনে পড়ছিলো তার রাজেশের সেই হাসি হাসি মুখটা, তাদের একসাথে আড্ডা দেবার দিন গুলো, একসাথে করা দুষ্টুমি গুলো। কিন্তুু আজ সব শেষ, আর কোনো দিনও রাজেশ সাড়া দেবে না তার ডাকে। বিকাশ রাজেশের ভাইকে ডেকে জিজ্ঞাস করলো কি করে হলো ? রাজেশের ভাই বললো তার দাদা নাকি আজ সকালে বিকাশের ফ্ল্যাটে তার সাথে দেখা করতে যাবে ঠিক করেছিল তাই সকাল সকাল স্নান করতে গেছিলো কিন্তুু হঠাৎ করে বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে জ্ঞান হারায়। কিছুক্ষন পর তার মা বাথরুমে গিয়ে সব দেখে ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে তার দাদাকে মৃত বলে ঘোষণা করে। এবার যেনো আরো বেশি করে কেদে উঠল বিকাশের মনটা, তার সাথে দেখা করতেই তো আসছিলো রাজেশ, কিন্তুু ভগবানের একি খেলা, শেষ দেখাটাও হলো না। বিকেল ৫টা নাগাদ রাজেশের শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো। আজ বাড়ি ফিরতে ফিরতে শুধু রাজেশের মুখটাই মনে পড়ছিল বিকাশের। রাজেশ তো তার সাথেই দেখা করতে আসছিলো। বলেছিল তার ফ্ল্যাট এসে দেখে যাবে। আর আসা হলোনা রাজেশের। এই ভেবে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল বারবার বিকাশ। বাস থেকে যখন নামলো বিকাশ ঘড়িতে রাত ১১টা বাজে। একেই রাত হয়েছে তার উপর আবার শীতকালের রাত, রাস্তা ঘাট পুরো নিঝুম হয়ে আছে। আজ আর খাবার কিনলো না বিকাশ। যদিও সকাল থেকে কিছুই খায়নি আজ বিকাশ কিন্তুু তবুও আজ তার খিদে নেই, বাড়ি পৌঁছে এক গ্লাস জল খেয়ে শুয়ে পড়লো বিকাশ। কিন্তুু ঘুম তার কিছুতেই আসছে না। সে যেনো ভুলতে পারছে না তার বন্ধুর সেই করুন মুখটা। হঠাৎ কিসের যেনো একটা আওয়াজ এলো, বেশ চমকে উঠলো বিকাশ। মনে হলো কে যেনো একবার তার দরজাতে ঠকঠকালো। ধরপরিয়ে উঠে বসলো বিকাশ। এতো রাতে কে এলো আবার। বিকাশ লাইট জ্বালিয়ে দেখলো রাত তখন
২টো বাজে। এতো রাতে কে এলো তার দরজায়?? বিকাশ উঠে গিয়ে দরজা খুললো কিন্তুু কোথায় কে..কেউ নেই। অন্ধকার ফাঁকা সিড়ি বাদে আর কিছুই নেই বাইরে। হয়তো মনের ভুল হলো বিকাশের, আসলে সকাল দিয়ে কিছু খায়নি তো সে তাই হয়তো এসব ভুলভাল ভ্রম হচ্ছে তার। আবার বিকাশ নিজের বিছানায় শুতে এলো কিন্তুু বৃথা চেষ্টা, ঘুম তার এবারও এলো না। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে হঠাৎ আবার সেই ঠক ঠক শব্দ। বিকাশ এবার উঠে বসলো, না কোনো ভ্রম হয়নি তার, সে স্পষ্ট শুনেছে এবার। কে যেনো তার দরজায় টোকা মারলো " ঠক ঠক ", " ঠক ঠক " । কিন্তুু এতো রাতে কে বারবার মজা করছে তার সাথে। হঠাৎ পিঠের শিকদারা বেয়ে যেনো বরফের স্রোত বয়ে গেলো তার। হঠাৎ তার মনে এলো রাজেশের ভাইয়ের কথা গুলো। তার বন্ধুতো তার সাথে দেখা করতে আজ তার ফ্ল্যাটেই আসছিলো। তবেকি....তবেকি অশরীরী হয়ে শেষ দেখাটা দিতে এলো বিকাশকে। বিকাশের মাথা কাজ করছে না, তার হৃদস্পন্দন যেনো ১০০ গুন বেড়ে গেছে। এই শীতকালেও মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে বিকাশের। হঠাৎ আবার সেই আওয়াজ " ঠক ঠক " ঠক ঠক "। এবার যেনো আওয়াজটা একটু দ্রুত হলো যেনো দরজার ওপর প্রান্তের জীবটি অধৈর্য হয়ে উঠছে ভেতরে প্রবেশের জন্য। ক্রমশ আওয়াজটা যেনো দ্রুততর হতে লাগলো। বিকাশের বুকের ভেতর যেনো দামামা বাজতে লাগলো। গলা শুকিয়ে এসেছে বিকাশের। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হতে লাগলো বিকাশের, সে দেখলো যেনো তার বন্ধু হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে আর সেও যেনো এগিয়ে যাচ্ছে তার ডাকে সাড়া দিতে!!!!!!!!.........
দারোগা বাবু দরোয়ান কে ডেকে বললো তুমিই প্রথম দেখলে লাশটা। দারোয়ান বললো হ্যা স্যার। রোজ সকালে বিকাশ বাবুর ঘরে আমি বাজার থেকে দূধ কিনে দিয়ে আসি। আজ গিয়ে দেখি বাবুর দরজা বন্ধ। অনেক্ষন ডাকাডাকি করেও কোনো ফল হলো না দেখে আমার সন্দেহ হয় তাই অফিস রুমে গিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে গেট খুলে দেখি বিকাশ বাবু মাটিতে পরে আছেন। আমি তারাতারি ডাক্তার বাবু কে ডেকে আনি। ডাক্তার বাবু এসে পরীক্ষা করে ওনাকে মৃত ঘোষনা করেন। কেউ কি এসেছিল কাল তোমার বাবুর সাথে দেখা করতে? দারোয়ান বললো না স্যার। কিন্তুু কাল বাবু অনেক রাত করে বাড়ি ফেরেন। মুখ দেখে একটু দুঃখী দুঃখী মনে হচ্ছিলো। "ঠিক আছে তুমি যাও" দারোগা বাবু বললো।
ফ্ল্যাটটা একটু ঘুরে দেখেছিল দারোগা। হঠাৎ দরজায় আওয়াজ হলো "ঠক ঠক" , "ঠক ঠক" l
দারোগা বেরিয়ে বিরক্ত হয়ে হাবিলদার কে বললো "ঠক ঠক" করছিস কেনো ? দরজাতো খোলাই আছে, দেখছিস না আমি একটু ইন্সপেকশন করছি ফ্ল্যাটটা। হাবিলদার একটু ভয়ে থতমতো খেয়ে বললো আজ্ঞে স্যার আমি "ঠক ঠক" করিনি স্যার, দরজার বাইরের দিক দিয়ে দুটো টিকটিকি দৌড়াচ্ছিল দরজর উপর দিয়ে স্যার, তাই আওয়াজ হলো, আমি কিছু করিনি।
দারোগা বিরক্ত হয়ে বললো ঠিক আছে, ঠিক আছে, অনেক হোয়েছে এবার দয়া করে গিয়ে জিপটা স্টার্ট করো আর লাশটা কে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করো।