Wednesday, April 22, 2020

ভয়

খবরটা পাবার পর থেকেই মনটা ভালো নেই বিকাশের।
রাজেশ তার ছোটবেলার বন্ধু ছিলো কিন্তুু এভাবে হঠাৎ করে রাজেশের মারা যাওয়াটা ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারছেনা বিকাশ। আজ সকালে রাজেশের ভাই ফোন করে খবরটা দেবার পর থেকেই যেনো আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেনা বিকাশ। কদিন আগেই তো ফোনে কথা হলো তার রাজেশের সাথে। ভালোই তো কথা হয়েছিলো, রাজেশ বলেছিল একদিন তার ফ্ল্যাট দেখতে আসবে, কিন্তুু একি হয়ে গেলো, আজ আর রাজেশ নেই, না সত্যি এটা মানতে পারছেনা বিকাশ। অনেক কষ্টে মনকে শক্ত করলো বিকাশ, শেষ দেখাটা সে দেখতে যাবে রাজেশকে, যাবে সে নিজের ছোটো বেলার বন্ধুর শেষ যাত্রায় তার সঙ্গী হতে। নিজের গ্রামের পথে রওনা দিলো বিকাশ। আজ তার নিজের গ্রামের চেনা পথ গুলো খুব যেনো একা লাগছিলো। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার এবং রাজেশের এই পথ ঘাটে। সেই ছোটো বেলায় বিকালে একসাথে খেলতে যাওয়া, লোকের বাড়ির বাগান থেকে ফল চুরি করা, কতো আনন্দের দিন ছিলো কিন্তুু আজ তার বন্ধু, তার সঙ্গী তাকে চিরো কালের মতো ছেড়ে চলে গেলো। অবশেষে রাকেশের বাড়ি পৌঁছালো সে। উঠনেই রাখা হয়েছে রাজেশের নিষ্প্রাণ দেহটা, পাশে বসে কেদে চলেছে তার হতভাগী মা। বিকাশ যেনো তাকাতে পারছিলনা রাজেশের সেই মুখের দিকে, কান্নায় ফেটে যাচ্ছিলো তার বুক, মনে পড়ছিলো তার রাজেশের সেই হাসি হাসি মুখটা, তাদের একসাথে আড্ডা দেবার দিন গুলো, একসাথে করা দুষ্টুমি গুলো। কিন্তুু আজ সব শেষ, আর কোনো দিনও রাজেশ সাড়া দেবে না তার ডাকে। বিকাশ রাজেশের ভাইকে ডেকে জিজ্ঞাস করলো কি করে হলো ? রাজেশের ভাই বললো তার দাদা নাকি আজ সকালে বিকাশের ফ্ল্যাটে তার সাথে দেখা করতে যাবে ঠিক করেছিল তাই সকাল সকাল স্নান করতে গেছিলো কিন্তুু হঠাৎ করে বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে জ্ঞান হারায়। কিছুক্ষন পর তার মা বাথরুমে গিয়ে সব দেখে ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে তার দাদাকে মৃত বলে ঘোষণা করে। এবার যেনো আরো বেশি করে কেদে উঠল বিকাশের মনটা, তার সাথে দেখা করতেই তো আসছিলো রাজেশ, কিন্তুু ভগবানের একি খেলা, শেষ দেখাটাও হলো না। বিকেল ৫টা নাগাদ রাজেশের শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো। আজ বাড়ি ফিরতে ফিরতে শুধু রাজেশের মুখটাই মনে পড়ছিল বিকাশের। রাজেশ তো তার সাথেই দেখা করতে আসছিলো। বলেছিল তার ফ্ল্যাট এসে দেখে যাবে। আর আসা হলোনা রাজেশের। এই ভেবে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল বারবার বিকাশ। বাস থেকে যখন নামলো বিকাশ ঘড়িতে রাত ১১টা বাজে। একেই রাত হয়েছে তার উপর আবার শীতকালের রাত, রাস্তা ঘাট পুরো নিঝুম হয়ে আছে। আজ আর খাবার কিনলো না বিকাশ। যদিও সকাল থেকে কিছুই খায়নি আজ বিকাশ কিন্তুু তবুও আজ তার খিদে নেই, বাড়ি পৌঁছে এক গ্লাস জল খেয়ে শুয়ে পড়লো বিকাশ। কিন্তুু ঘুম তার কিছুতেই আসছে না। সে যেনো ভুলতে পারছে না তার বন্ধুর সেই করুন মুখটা। হঠাৎ কিসের যেনো একটা আওয়াজ এলো, বেশ চমকে উঠলো বিকাশ। মনে হলো কে যেনো একবার তার দরজাতে ঠকঠকালো। ধরপরিয়ে উঠে বসলো বিকাশ। এতো রাতে কে এলো আবার। বিকাশ লাইট জ্বালিয়ে দেখলো রাত তখন 
২টো বাজে। এতো রাতে কে এলো তার দরজায়?? বিকাশ উঠে গিয়ে দরজা খুললো কিন্তুু কোথায় কে..কেউ নেই। অন্ধকার ফাঁকা সিড়ি বাদে আর কিছুই নেই বাইরে। হয়তো মনের ভুল হলো বিকাশের, আসলে সকাল দিয়ে কিছু খায়নি তো সে তাই হয়তো এসব ভুলভাল ভ্রম হচ্ছে তার। আবার বিকাশ নিজের বিছানায় শুতে এলো কিন্তুু বৃথা চেষ্টা, ঘুম তার এবারও এলো না। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে হঠাৎ আবার সেই ঠক ঠক শব্দ। বিকাশ এবার উঠে বসলো, না কোনো ভ্রম হয়নি তার, সে স্পষ্ট শুনেছে এবার। কে যেনো তার দরজায় টোকা মারলো " ঠক ঠক ", " ঠক ঠক " । কিন্তুু এতো রাতে কে বারবার মজা করছে তার সাথে। হঠাৎ পিঠের শিকদারা বেয়ে যেনো বরফের স্রোত বয়ে গেলো তার। হঠাৎ তার মনে এলো রাজেশের ভাইয়ের কথা গুলো। তার বন্ধুতো তার সাথে দেখা করতে আজ তার ফ্ল্যাটেই আসছিলো। তবেকি....তবেকি অশরীরী হয়ে শেষ দেখাটা দিতে এলো বিকাশকে। বিকাশের মাথা কাজ করছে না, তার হৃদস্পন্দন যেনো ১০০ গুন বেড়ে গেছে। এই শীতকালেও মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে বিকাশের। হঠাৎ আবার সেই আওয়াজ " ঠক ঠক " ঠক ঠক "। এবার যেনো আওয়াজটা একটু দ্রুত হলো যেনো দরজার ওপর প্রান্তের জীবটি অধৈর্য হয়ে উঠছে ভেতরে প্রবেশের জন্য। ক্রমশ আওয়াজটা যেনো দ্রুততর হতে লাগলো। বিকাশের বুকের ভেতর যেনো দামামা বাজতে লাগলো। গলা শুকিয়ে এসেছে বিকাশের। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হতে লাগলো বিকাশের, সে দেখলো যেনো তার বন্ধু হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে আর সেও যেনো এগিয়ে যাচ্ছে তার ডাকে সাড়া দিতে!!!!!!!!.........

দারোগা বাবু দরোয়ান কে ডেকে বললো তুমিই প্রথম দেখলে লাশটা। দারোয়ান বললো হ্যা স্যার। রোজ সকালে বিকাশ বাবুর ঘরে আমি বাজার থেকে দূধ কিনে দিয়ে আসি। আজ গিয়ে দেখি বাবুর দরজা বন্ধ। অনেক্ষন ডাকাডাকি করেও কোনো ফল হলো না দেখে আমার সন্দেহ হয় তাই অফিস রুমে গিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে গেট খুলে দেখি বিকাশ বাবু মাটিতে পরে আছেন। আমি তারাতারি ডাক্তার বাবু কে ডেকে আনি। ডাক্তার বাবু এসে পরীক্ষা করে ওনাকে মৃত ঘোষনা করেন। কেউ কি এসেছিল কাল তোমার বাবুর সাথে দেখা করতে? দারোয়ান বললো না স্যার। কিন্তুু কাল বাবু অনেক রাত করে বাড়ি ফেরেন। মুখ দেখে একটু দুঃখী দুঃখী মনে হচ্ছিলো। "ঠিক আছে তুমি যাও" দারোগা বাবু বললো।
ফ্ল্যাটটা একটু ঘুরে দেখেছিল দারোগা। হঠাৎ দরজায় আওয়াজ হলো "ঠক ঠক" , "ঠক ঠক" l
দারোগা বেরিয়ে বিরক্ত হয়ে হাবিলদার কে বললো "ঠক ঠক" করছিস কেনো ? দরজাতো খোলাই আছে, দেখছিস না আমি একটু ইন্সপেকশন করছি ফ্ল্যাটটা। হাবিলদার একটু ভয়ে থতমতো খেয়ে বললো আজ্ঞে স্যার আমি "ঠক ঠক" করিনি স্যার, দরজার বাইরের দিক দিয়ে দুটো টিকটিকি দৌড়াচ্ছিল দরজর উপর দিয়ে স্যার, তাই আওয়াজ হলো, আমি কিছু করিনি।
দারোগা বিরক্ত হয়ে বললো ঠিক আছে, ঠিক আছে, অনেক হোয়েছে এবার দয়া করে গিয়ে জিপটা স্টার্ট করো আর লাশটা কে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করো।

Monday, April 13, 2020

অতীত

১২ ই এপ্রিল, দিনটা কখনো ভুলবে না অনিকেত। একবছর আগে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা আজকের দিনটাকে তার কাছে করে রেখেছে চির বিভীষিকাময়।
আজও অবসরে সে ভাবে সত্যি কি ঘটেছিল সেদিন?? কি দেখেছিল সে, সে কি....!!! না ঘটনাটা প্রথম থেকেই বলা দরকার। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগের কথা, আজকেরই দিনে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল সে, কিন্তুু অন্য দিনের চেয়ে আজ একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে তার। যাইহোক রোজকারই মতন আজও একটা অটোর অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে সে, অবশেষে একটা অটো পেলো কিন্তুু রোজকার মত আজ অটোটা পুরো ফাঁকা না, প্রথম থেকেই একজন মাঝ বয়সি মহিলা প্যাসেঞ্জার বসে রয়েছে। যাইহোক ভালই হলো একলা যাবার থেকে একটা সঙ্গী খারাপ কি। যাইহোক অটোতে চেপে বসলো অনিকেত। পাশে বসে বেশ ভালই লাগছিল অনিকেতের, যুবতীকে দেখে বাঙালি মনে হচ্ছে, দেখতেও বেশ সুশ্রী। বেশ কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল অনিকেতের, কিন্তুু সংকোচ বোধ হচ্ছিল পাছে সে অনিকেত কে ভুল বোঝে। একেই অনেক রাত তার উপর একলা মেয়ে, থাক দরকার নেই কথা বলে, কোথায় আবার কি ভাববে, শেষে দেখবে হয়তো সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে বসে আছে সে। না থাক দরকার নেই। এইসব ভাবছে অনিকেত হঠাৎ পাশ থেকে একটা প্রশ্ন এলো " অফিস থেকে ফিরছেন ? " সত্যি বলতে একটু হকচকিয়ে গেলো অনিকেত, অপ্রস্তুত ভাবে উত্তর দিলো " মানে ওই মানে একটু দেরি ".. যুবতী হেসে উঠলো " আরে আপনি ভয় পাচ্ছেন কেনো? " একটু লজ্জা পেয়ে অনিকেত বললো না না আসলে মানে ঠিক বুঝতে পারিনি। মেয়েটি আবার হেসে জিজ্ঞাস করলো তো আপনার নাম কি ? অনিকেত উত্তর দিলো। এবার অনিকেত একটু সাহস পেলো সেও যুবতীটিকে তার নাম জিজ্ঞাস করলো। যুবতী বললো তার নাম অনুরাধা। সে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। আস্তে আস্তে কথা শুরু হলো দুজনের। বেশ ভালো লাগছিলো পুরো ব্যাপারটা অনিকেতের। হয়তো অনুরাধারও বেশ ভালই লাগছিল অনিকেতকে। কিন্তুু হঠাৎ একটি বিকট শব্দে কথা বন্ধ হলো তাদের। "কি হলো ভাই ? " অটোওয়ালা কে জিজ্ঞাস করলো অনিকেত। দাদা টায়ার ফেটেছে। অটো আর যাবে না। আপনারা এখানেই নেমে যান। যথারীতি বাধ্য হয়ে অটো থেকে নেমে গেলো তারা, অনিকেত জোর করে দুজনেরই ভাড়াই মিটিয়ে দিলো। অটোওয়ালা অটো ঠেলতে ঠেলতে ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো। এখন নিঝুম রাতের শান্ত পরিবেশে শুধু দুটি প্রাণী অনিকেত আর অনুরাধা। কেমন একটা ভাব হচ্ছিল অনিকেতের। আগে কখনো এরম পরিস্থিতিতে পড়েনি সে। অনিকেত হঠাৎ দেখলো অনুরাধার মুখটা একটু ম্লান হয়ে এসছে। সে একটু সাহস করে অনুরাধাকে বললো " আপনি কিছু মনে না করলে আমি কি আপনাকে বাড়ি ছেড়ে দেবো ? " অনুরাধা কিছু উত্তর করলো না কিন্তু তার মুখ দেখে অনিকেত বুঝছিলো সে ভয় পেয়েছে কোনো কারণে। অনিকেত আবার সাহস করে বললো " দেখুন এখন এখানে কোনো গাড়ি পাবেন না, তার চেয়ে বরং চলুন হাঁটা শুরু করি একসাথে। আমি না হয় আপনাকে বাড়ি অবদি ছেড়ে দিয়ে আসবো। অনুরাধা এবার একবার মুখ তুলে চাইলো অনিকেতের দিকে। আহা কি সুন্দর মুখ খানি, কি মায়া এ চোখের। এ চোখ যেনো এক দৃষ্টিতেই পাষাণ হৃদয়েও প্রেম জাগাতে পারে। অনুরাধা হাটতে শুরু করলো অনিকেতের সাতে। অনিকেত আবার একটু সাহস করে জিজ্ঞাস করলো " আপনি কি ভয় পেয়েছেন কিছুতে ? " এবার অনুরাধা উত্তর দিল "না আসলে এত রাতে মানে আমরা দুজন একা, আজকাল দিনের যা অবস্থা তাই
একটু মনটা কেমন কেমন করছে আর কি" অনিকেত এবার শক্ত করে অনুরাধার হাতটা চেপে ধরলো, বললো তুমি ভয় পেও না অনুরাধা, আমি আছি তোমার সাতে। "আপনি" থেকে দুটি প্রাণী "তুমি" তে এসে পৌঁছালো। একে অপরের প্রতি বিশ্বাসটা যেনো বেশ শক্ত হচ্ছিলো। কথা বলতে বলতে এগিয়ে চললো দুজনে। অনিকেত শক্ত করে ধরে রেখেছে অনুরাধার হাত। অনুরাধা ও যেনো ভরসা ফিরে পেয়েছে, তার মুখের সেই ভয়ার্থ ভাব কেটে বেশ সেই হাসি খুশি মুখটা ফিরে এসেছে। কিন্তুু সামনে ওরা করা এগিয়ে আসছে। একদল ছেলে সামনে এসে দাড়ালো অনিকেত ও অনুরাধার। ঘিরে ধরলো তাদের। অনিকেত শক্ত করে চেপে ধরে রয়েছে অনুরাধাকে। হঠাৎ একজন অনুরাধার হাত ধরতে এলো অমনি বিদ্যুৎবেগে তার উপর ঝাপিয়ে আক্রমণ করলো অনিকেত। একে একে সবাই এবার ঘিরে ধরলো অনিকেত কে। কিছুক্ষন হাতাহাতি চললো, হঠাৎ পেছন থেকে কি যেনো একটা মাথায় লাগলো অনিকেতের, মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে, ওরা সবাই অনুরাধাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অনুরাধা চিৎকার করছে বাঁচাও অনিকেত, অনিকেত পরে রইলো, তার ওঠার ক্ষমতা নেই, নিজের সমস্ত ক্ষমতা দিয়েও উঠে দাড়াতে পারলো না অনিকেত। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে এলো অনিকেতের, শুধু কানে ভেসে আসছিলো অনুরাধার করুন চিৎকার, "আমায় ছেড়ে দাও তোমরা, অনিকেত বাঁচাও, বাঁচাও অনিকেত"....
পরদিন সকালে যখন অনিকেত চোখ খুললো তখন তাকে ঘিরে কিছু লোক দাড়িয়ে। তারা অটো নিয়ে যাচ্ছিলো, রাস্তার ধারে তারা অনিকেত কে পরে থাকতে দেখে। অনিকেত তাদের সমস্ত ঘটনা বললো। অনিকেত তাদের সাতে তন্ন তন্ন করে খুঁজলো অনুরাধাকে, না হয়তো অনুরাধাকে না, হয়তো খুঁজছিল গতরাতে পাশবিক অত্যাচারের শিকার হওয়া অনুরাধার ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে। কিন্তুু না কিছু নেই। অনিকেত দুঃখে এবং রাগে ভেঙ্গে পড়লো। কি দোষ ছিলো সেই নিষ্পাপ মেয়েটার। তার এখন নিজেকে ছেলে বলতে ঘেন্না হচ্ছে। না তবে ভেঙ্গে পড়লে হবে না। সে বেঁচে আছে এখনো। বদলা সে নেবে। অনুরাধার যারা সর্বনাশ করলো অনিকেত তাদের ছাড়বে না। যতদূর যেতে হয় সে যাবে কিন্তুু বদলা সে নেবে। অনিকেত এবার সোজা পুলিশ স্টেশন গেলো। গিয়ে সমস্ত ঘটনা বললো। থানার ওসি আশ্চর্য ভাবে অনিকেতকে জিজ্ঞাস করলো আপনি সঠিক বলছেন সব, মেয়েটিকে দেখলে চিনতে পারবেন? অনিকেত বললো নিশ্চই। ওসি একটি ফাইল এগিয়ে দিলো অনিকেতের দিকে। অনিকেত ফাইলটা খুলে আশ্চর্য হলো, আরে এতো অনুরাধার ছবি। অনিকেত বললো এই তো অনুরাধা। এবার থানার ওসি আশ্চর্য্য হয়ে অনিকেত কে বললো সে যেটা বলছে সেটা সম্ভব না কারন ঠিক কালকের দিনেই আজ থেকে একবছর আগে অনুরাধা বলে এই মেয়েটিকে রাতের অন্ধকারে কিছু দুষ্কৃতী ধর্ষণ করে খুন করে। সেই সময় অনুরাধার সাথে যেই ছেলেটি ছিলো সেও গুরুতর আহত হয়। সেই ছেলেটি এসেই এই রিপোর্টটা লেখায়। এসব শুনে অনিকেতের মাথা ঘুরতে লাগলো সে তার হাতের ফাইলটা উল্টে পাল্টে দেখতে লাগলো হঠাৎ তার নজর পড়লো FIR টা যে করেছে অনুরাধার সেই বন্ধুর নামের উপর।
নামটা খুবই চেনা তার, নামটা "অনিকেত" !!!!!!!! 
অনিকেতের কানে যেনো আবারও ভেসে আসতে লাগলো সেই আর্তনাদ " বাঁচাও অনিকেত, বাঁচাও "।

Friday, April 10, 2020

এপ্রিল ফুল

আরও একটা দিন কেটে গেল অজয়ের জীবনের। কিন্তুু চাকরিটা আজও হলো না তার। কমাস আগের ই কথা, ভালই চলছিল তার সব। পাঁচ বছর আগে একটা ফুটফুটে ছেলেও হয়েছে তার। বৌ ছেলেকে নিয়ে বেশ সুখেই সংসার কাটছিল তার। কিন্তুু কি থেকে কি হয়ে গেলো। হঠাৎ রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেলো অজয়ের কোম্পানী। তিন মাস কেটে গেছে তারপর থেকে, অজয় রোজ সকালে চাকরি খুঁজতে বেরোয় কিন্তুু শুধু নিরাশ হয়ে বাড়ি ফেরে। তার কষ্ট হয় তার বউ বানীর করুন মুখটা দেখে। সত্যি বেচারী নিজের সব সখ আলহাদ বাদ দিয়ে মুখ বুজে রয়েছে অজয়ের সাতে। একটা শাড়ি পর্যন্ত কিনে দিতে পারেনি অজয় শেষ তিন মাসে তাকে। আর তার পাঁচ বছরের ছেলে বিল্টু, সে ও কতো দাবি নিয়ে আসে অজয়ের কাছে, কিন্তুু কি করবে অজয়। ভগবান তো তার প্রতি মুখ তুলে চাইছেন না। এক এক সময় ভাবে চাইনা তার এরম জীবন কিন্তুু আবার ভাবে তার চলে যাবার পর বানী আর বিল্টু কে দেখবে কে, তারা তো কোনো দোষ করেনি। এসব ই ভাবতে ভাবতে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, হঠাৎ স্টেশনের কোলাহল এ ঘুম ভাঙলো তার। আরে স্টেশন এসে গেছে, তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নামলো অজয়, ভাগ্যিস ঘুমটা ভেঙেছিল নয়তো নাজানি কোথায় চলে যেত ট্রেনের সাতে। যাই হোক আজ সে হেঁটেই বাড়ি যাবে ঠিক করেছে, রোজ রোজ দশ টাকা রিকশা ভাড়াটা আজ তার কাছে বিলাসিতার ই সমান হতে দারিয়েছে। রাত সাড়ে আটটা, অবশেষে বাড়ি পৌঁছালো অজয়। বানী জিজ্ঞাস করলো " কিগো আজ এতো দেরি হলো, কিছু ভালো খবর আছে নাকি?" অজয় রেগে গিয়ে বললো " হ্যাঁ সুখবরই তো, আজ হেঁটে বাড়ি এসছি স্টেশন থেকে, যতঃসব, চাকরি পেলে তো এসেই বলতাম, যাও আর মাথা খেও না, বিল্টু কোথায় ? " বিল্টু পাশের ঘর থেকে বাবার কথা শুনে বেরিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো বাবাকে, বললো বাবা পরের সপ্তাহে তো আমার জন্মদিন তো ১২ এপ্রিল, এই বছর একটা তিনতলা কেক আনবে বাবা? শুনেই অজয়ের গেলো মাথা গরম হয়ে, এক বকা দিলো। পাশের ঘর থেকে বানী এসে বিল্টুর চোখ মুছতে মুছতে নিয়ে গেলো। রাতে খেতে বসে বানী বললো " আজ কেনো বকলে ছেলেটাকে ওরম করে, ও তো বাচ্চা মানুষ, ওর তো আবদার করাটাই স্বাভাবিক, আর সত্যি তো আর কদিন এভাবে চলবে বলো, বিল্টুর স্কুলে দুমাসের মাইনে বাকি, মুদি দোকানে ধার বাকী, লজ্জায় আমি বাড়ি থেকে বেরোই না, ঘরে যা চাল ডাল ছিল তাও শেষের মুখে, কিছু একটা করো তুমি শিগগিরি। " 
অজয় সব শুনলো কিন্তুু কোনো উত্তর করলো না, ঠিক করলো কাল একটু সকাল সকাল বেরোবে, কাল সে যেখান থেকে হোক টাকা জোগাড় করে আনবে, দরকারে চুরি করতেও পিছপা হবে না সে। 
সকাল সকাল আজ বেরোলো অজয়, বানী কে কথা দিয়ে গেলো আজ সে টাকা আনবেই। স্টেশনে ঢুকতে গিয়ে ধাক্কা লেগে হাত থেকে গেলো ফাইলটা পরে, " আরে মশাই দেখে চলতে পারেননা, একি !! এতো সুবীর। সুবীর আর অজয়, কলেজের বন্ধু ছিলো, একদম যাকে বলে হরিহর আত্মা। আরে অজয় তুই এখানে, কতদিন পর দেখছি তোকে, কোথায় ছিলিস এতো দিন, কাকু কাকিমা কেমন আছেন, কাকুর বিজনেস কেমন চলছে?
আরে দারা বলছি বলছি আগে তুই বল তুই কোথায় ছিলি এতদিন, সেই তো কলেজের পর এই মুখ দেখলাম তোর, তোকে তো বিয়েতেও ডাকতে পারিনি, তোর নাম্বার ছিলো না আর সত্যি বলতে ভাই ভুলেও গেছিলাম। আর তুইও তো কোনো খোজ ই রাখলি না কলেজের পর। সুবীর এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললো, আর বলিস না ভাই, তোর তো বাবার ব্যাবসা ছিলো, তুই তো চলে গেলি এম বি এ করতে, আর এদিকে বাবার চাকরিটা গেলো চলে, আমি যে ইন্সুরেন্স এর কাজটা করতাম সেটাতেও মন্দা দেখা দিলো, বাড়ি ভাড়া দিতে পারিনি তাই বাড়িওয়াল দিলো তাড়িয়ে, ভেবেছিলাম তোকে জানাই কিন্তু ভাবলাম কষ্টের কথা বড়লোক বন্ধুকে বলে সাহায্য নেবো, কেমন যেনো বিবেকে বাঁধলো। অজয় মনে মনে ভাবলো, আর বড়োলোক, সুবীর কি আর জানে যে তার বন্ধুর এখন দুবেলা পেটভরে খাবার অবস্থাও নেই। সুবীর বলে চললো তারপর আস্তে আস্তে একটা চাকরি জোগাড় করলাম আর সাতে ইন্সুরেন্স এর ব্যাবসা টাও চালালাম, বেশ টাকাও করলাম জানিস তো তোদের দয়াতে আজ বাড়ি করেছি নিজের, মোটামুটি ভালই আছি। বলছি চলনা তোর খুব তাড়া না থাকলে একটু আড্ডা দি। সেই কলেজের পর এই তো দেখা। অজয় জিজ্ঞাস করলো তো তুই যাচ্ছিল ই কোথায়? সুবীর বললো আরে আমি যাচ্ছিলাম আমার এক ক্লায়েন্ট এর বাড়িতে টাকা দিতে, তার টাকাটা ম্যাচিউর হোয়ে গেছে। হঠাৎ করে অজয় মনে একটা কথা খেলে গেলো, সেকি সুবীরের থেকে টাকা চাইবে? নানা সেটা বাজে দেখাব, তালে কি চুপি চুপি সুবীরের ব্যাগটা চুরি করে নেবে সে? অনেক টা টাকা, সুবীরের তো এখন অবস্থা ভালই, তালে সে নিয়ে নিলে ক্ষতি কি, কলেজে থাকতে সেও তো সুবীর কে কতো সাহায্য করেছে, সুবীরের কলেজের ফিস কতবার সে দিয়েছে, তালে আজ যদি সুবীরের অজান্তে টাকাটা সে হাতিয়ে নেয় তালে ক্ষতি কি, আর সুবীর তার ছোটবেলার বন্ধু, যদি সে চুরি করে ধরাও পরে তালেও সুবীর তো তাকে আর হাজতবাস করাবে না। সামনের চায়ের দোকানে সুবীর দুটো চা আর দুটো ডিম টোস্ট অর্ডার দিলো। আর বল অজয় বাকিদের খবর কি, যোগাযোগ আছে বাকিদের সাতে, আমার তো আর যোগাযোগ নেই কাউর সাতেই। অজয় বললো নারে আমারও আর তেমন যোগাযোগ রাখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তুু সত্যি কি ভালো দিনগুলো ছিলো বলতো। হম সুবীর বললো, সত্যি ঠিক বলেছিস সেই কলেজে স্যারদের পেছনে লাগা, জুনিয়র মেয়েদের পটানোর ট্রাই করা, মানে সে যেনো এক আলাদাই মজা ছিলো, সত্যি রে যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই দিন গুলোয়। অজয় আনমনা ভাবে উত্তর দিল হম ঠিক, কিন্তুু তার নজর শুধু এখন সুবীরের ব্যাগ এর দিকে। কিভাবে চুরি করবে সে এই ব্যাগ সুবীরের অজান্তে, এই চিন্তাই তার মাথায় ঘুরছে। সুবীর আরও বলে চললো, তোর মনে আছে তুই আমায় কিভাবে এপ্রিল ফুল করেছিলি? অজয় উত্তর দিলো হম, আর তুই দিব্যি করেছিলি যে তুইও নাকি আমায় এপ্রিল ফুল করবি নয়তো নাকি তুই মরেও শান্তি পাবি না। সুবীর হেসে বললো বাবা তোর তো সব মনে আছে দেখছি, কিন্তুু কি করবো বল কলেজে ট্রাই তো করেছিলাম তোকে এপ্রিল ফুল করার কিন্তুু ওই পাগলা শ্যামলের জন্য সব নষ্ট হয়ে গেছিলো সেবার। ছাড় ওসব পাগলামির কথা। এখন ভাবলে হাসি পায়। ও আরে ভালো কথা মনে পড়লো বলছি তুই কলেজে থাকতে আমার কাছে একটা ইন্সুরেন্স করেছিলি, সেটা ম্যাচিউর হয়ে গেছে। তোকে  যোগাযোগ করতে পারিনি তাই  বলা  হয় নি। এবার একটু আশ্চর্য হলো অজয়, সেতো কখনো কোনো ইন্সুরেন্স করেনি সুবীরের কাছে, তালেকি সুবীর তার মতলব বুঝে তাকে গোপনে সাহায্য করতে চাইছে? লজ্জায় মুখটা ছোট হয়ে গেলো অজয়ের। সুবীর বললো কি হলো তোর, আরে তোর মনে নেই তুই কলেজে থাকতে একটা ইন্সুরেন্স করেছিলি আমার টার্গেট পুরনো হচ্ছিলনা বোলে। যাইহোক তোর সেই টাকা সব মিলিয়ে তিন লাখ হোয়েছে। তো তুই এক কাজ কর আমার ওই ক্লায়েন্ট কেও তিন লাখ ই দেবার ছিলো তো তুই এক কাজ কর এই টাকাটা তুই নিয়ে যা, আমি দেখি কাল ওই ক্লায়েন্ট কে টাকা দিয়ে আসবো। চল আজ উঠি তালে বাড়িতে আবার একটু কাজ আছে, একদিন আয়ে পারলে আমার বাড়ি, আমার মামাবাড়ী মনে আছে তো, আমরা ওর পাশেই থাকি এখন এই বলে সুবীর বিদায় জানিয়ে হারিয়ে গেলো স্টেশনের ভির এর মধ্যে। অজয় আজ টাকাটা পেঁয়ে কি বলবে সুবীরকে বুঝতে পারছিল না, হয়তো সুবীর নিজের বন্ধুর মনের কথা বুঝে চালাকি করলো তার সাতে, হয় তো এটাই সত্যিকারের বন্ধুর পরিচয়। আজ খুব খুশি হয়ে বাড়ি ফিরলো অজয়। বাণীকে ব্যাগটা দিয়ে সব কথা খুলে বললো। আজ অজয় নিজে বিল্টু কে ডেকে বললো বল তুই কি কেক খাবি বার্থডেতে, বিল্টু বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো বাবা চকোলেট কেক। বাণী কে ডেকে অজয় বললো তুমি দোকানে যা ধার বাকি আছে সেটা মিটিয়ে এসো আর আমাদের ছেলের জন্য একটা ছোটো বার্থডে পার্টি হবে তো ওর বন্ধুরদের একটু বলে এসো। বাণী বললো যে বন্ধুর জন্য আজ আমাদের সুখ ফিরলো তুমি তো তাকেও ডাকতে পারতে ছেলের জন্মদিনে। অজয়ের কথাটা বেশ ভালো লাগলো সে বললো ঠিক বলেছো সুবীরকে ও ডাকবো। কিন্তুু এবার তার মনে পড়লো যা সে তো সুবীরের ফোন নাম্বার টাই নিতে ভুলে গেছে। আচ্ছা ঠিক আছে তার বাড়ি তো অজয় জানে, কাল সকালেই যাবে সুবীরের বাড়ি। ওকে নেমন্তন্ন করে আসবে। পরদিন সকালে অজয় গেলো সুবীরের বাড়ি কিন্তুু বাড়ির সামনে এতো লোক কেনো? একটা শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান মনে হচ্ছে দেখে, কিন্তুু কে মারাগেলো, কালতো সুবীর কিছু বললো না। যাই হোক অজয় ভেতরে ঢুকলো কিন্তুু একি, এ কার শ্রাদ্ধ হচ্ছে, কার ছবি এটা, সুবীর!!!!!!
অজয়ের মাথা বনবন করে ঘুরতে লাগলো, চোখের সামনে অন্ধকার, শুধু পেছন থেকে একটা চেনা গলার স্বর ভেসে এলো --- " এপ্রিল ফুল , এপ্রিল ফুল " ।

Tuesday, April 7, 2020

নিশী

অফিস থেকে আজ বেরোতে বেশ দেরি হয়ে গেলো রমেনের। আগে দিলীপ বাবু থাকা কালীন কিন্তুু এমনটা হতো না। গতমাসে দিল্লী থেকে নতুন ম্যানেজার বদলি হয়ে আসার পর থেকে এইসব শুরু। সত্যি কেনো যে দিলীপ বাবু বদলি হয়ে গেলেন। যাইহোক কি আর করবে রমেন, নতুন বিয়ে করেছে সে, হুট করে চাকরিটা তো আর ছেড়ে দিতে পারে না সে। এসব ভাবতে ভাবতে সে পা বাড়ালো স্টেশন আর দিকে। 

"দেখি যদি কপাল ভালো থাকে তাহলে যদি লাস্ট ট্রেন টা পেতে পারে।" মনে মনে ভাবলো রমেন।

 না তবে কপালটা আজ রমেনের মন্দ গেলো না, শেষ ট্রেনটা পেলো সে, আশ্চর্যভাবে আজ একটা সিট ও পেয়ে গেলো। সিট এ বসে জানলা দিয়ে অমাবস্যার অন্ধকার ভেদ করে দূরের ছোট ছোট জ্বলতে থাকা আলো গুলোকে বেশ ভালো লাগছিলো রমেনের। বেশ একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল তার । 

সে মনে মনে ভাবতে লাগলো "সত্যি কি আশ্চর্য! দিনের আলোয় কতবারই না এই রাস্তা দিয়ে গেছে সে কিন্তু আজ রাতের অন্ধকারে সব কেমন যেনো রহস্যময় অজানা মনে হচ্ছে।"

হঠাৎ তার খেয়াল এলো আজ সকালে আসার সময় সে শুনেছিল স্টেশনের অটো উনিয়নের কোন এক লিডার গত রাতে মারা গেছেন তাই আজ সন্ধেবেলা অটো বন্ধ থাকবে। 

ইস্ কথাটা আগে মনে পড়েনি কেনো তার !!!!এবার সে কি করবে। এতো রাতে পাঁচ মাইল রাস্তা একা হেঁটে যাওয়া, আজতো শিবুদাও আগে বেরিয়ে গেছে। 

কি ভুলটাই না করলো সে!!!, আগে মনে থাকলে শিয়ালদা স্টেশনের পাশে কাকার বাড়িতে চলে যাওয়া যেত। একটা রাতের তো ব্যাপার ছিলো। কিন্তু এবার কি করবে সে...!! এতো রাতে একা হেঁটে যাবে..??

হঠাৎ তার মাথায় এলো একবার অজয় কে ফোন করে দেখি যদি ও একটু বাইক করে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারে। ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করতে গিয়ে দেখে ফোন ব্যাগে নেই। 
রমেন তন্নতন্ন করে ব্যাগ খুঁজছে, 

"একি ফোনটা কি চুরি হয়ে গেলো নাকি?" হঠাৎ রমেনের মনে এলো ফোনে চার্জ কম থাকায় তার টেবিলের পিছনে ফোনটা চার্জে দিয়েছিল। এই রে ফোনটা অফিসেই রয়ে গেছে। 

রাত সাড়ে এগারোটা ট্রেন থেকে নামলো রমেন। তবে আজ স্টেশনটা যেনো অন্যান্য দিনের থেকে একটু বেশিই ফাঁকা। বাইরে বেরিয়ে একবার অটোস্ট্যান্ড এ গেলো রমেন যদি তার বিপদ দেখে কেউ তাকে নিয়ে যেতে রাজি হয়, সে দরকারে নাহয় একটু বেশি ভাড়া দিতে অসুবিধা নেই রমেনের। কিন্তুু এযাত্রায় রমেনের ভাগ্য দেবী প্রসন্ন হলো না। অনেক খুঁজেও একটা অটো পেলো না রমেন। কি আর করবে, অগত্যা হাঁটা শুরু করলো সে। 

"উফ কি অন্ধকার, মনে হচ্ছে যেনো পৃথিবী কোনো এক জাদুবলে আদিম অন্ধকার যুগ এ ফিরে গেছে। একমাত্র রমেনই বাসিন্দা যেনো  এই পৃথিবীতে।" মনে মনে ভাবলো রমেন।

ক্রমশ হেঁটে চললো রমেন। আসেপাশের বাড়ি গুলোও আজ কেমন যেন ভৌতিক মনে হচ্ছে। এই নিঝুম পরিবেশে যেনো রমেনই একমাত্র জীবিত প্রাণী। 

হঠাৎ সামনে চোখ গেলো রমেনের। কে যেনো একটা হাঁটছে। উফ রমেন যেনো হাতে চাঁদ পেলো। যাক কাউকেতো দেখলাম। দেখি একটু এগিয়ে আলাপ করি। কথা বলতে বলতে কিছুটাতো যাওয়া যাবে। যাই হোক রমেন একটু জোড়ে পা চললো। একটু কাছে যেতে রমেন দেখলো সামনে যিনি হেঁটে চলেছেন তিনি একজন মহিলা। রমেন একটু হলেও আশ্চর্য হলো,
"এতো রাতে মহিলা একলা কি করছে !!!!"

তবে রমেন সাহসী ছেলে। কোনো কুসংসার তার মনে নেই। আশুতোষ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলো সে। রমেন মনে মনে ভাবলো হয়তো মহিলাটিও তারই মতন অফিস থেকে ফিরছে। আজকালতো মফতসল এর মহিলারাও শহরে যাচ্ছে চাকরি করতে। রমেন অনেকটাই কাছে এসে গেলো সেই মহিলার। হাত পাচেক দূরত্ব তাদের মধ্যে। রমেন মনে মনে ভাবলো একবার ডাক দেবে মহিলাকে কিন্তু যদি সে ভুল বোঝে। যদি ভুল ভেবে চিৎকার করে লোক জড়ো করে বা ছুটে পালায় তাহলে তো খুবই বাজে হবে।
না না থাক আর একটু জোড়ে পা চালিয়ে মহিলার পাশে পৌঁছালে হয়তো মহিলা তাকে দেখে নিজেই কথা বলবে। 
যতই হোক এতো রাতে একা যাবার চেয়ে একজনের সঙ্গ পাওয়া খারাপ কি। আর এমনিতেও রমেনকে সুপুরুষ দেখতে। মুখ দেখেই ভালো ছেলে মনে হয়। এসব ভেবে রমেন আরো জোড়ে পা চালালো। কিন্তুু আশ্চর্য এবার যেনো মনে হলো সেই মহিলাও আগের চেয়ে জোড়ে হাঁটা শুরু করলো। 
মহিলা কি কোনো ভাবে বুঝতে পারলো যে রমেন তার পিছনে এবং সেই ভয়ে কি আরো জোরে হাটা শুরু করলো? রমেন আরও জোড়ে হাঁটা শুরু করলো। কিন্তুু আশ্চর্য সাথেসাথে মহিলাও যেনো আরো জোড়ে হাঁটা শুরু করলো। রমেনের কেমন যেনো একটা জেদ চেপে গেলো। না তাকে পেরোতেই হবে সেই মহিলাকে। রমেন আরো আরো জোড়ে হাঁটা শুরু করলো কিন্তু আশ্চর্য মহিলাও যেনো রমেনের সাথে তাল মিলিয়ে হেঁটে চললো। রমেন যতই জোড়ে হাটে মহিলাও যেনো ততই জোড়ে হাটে। রমেনের আর দিক-বিদিক জ্ঞান রইলো না। সে জানো পাগল হয়ে উঠেছে, তাকে পেরোতেই হবে ওই মহিলাকে, নাহলে তার জীবন ব্যর্থ, তার উদ্দেশ্য শুধু ওই মহিলার আগে যাওয়া। রমেন এবার রীতি মতন দৌড়াতে শুরু করলো। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে এলো। কিন্তুু সেই মহিলা এখনও একই দূরে। 
এবার রমেন ডাক দিলো "এই যে শুনছেন আপনি দৌড়াচ্ছেন কেনো। আমি আপনার ক্ষতি চাই না। ও দিদি একটু দাড়ান। ও দিদি শুনছেন। একটু দাড়ান।"

কিন্তুু কোথায় কেউ দাঁড়াবে সেই মহিলা যেনো বাতাসে ভর করে ছুটছে। রমেন আর পারছে না ছুটতে কিন্তুু তার পা যেনো আর তার কথা শুনছে না। তার শরীরের উপর আর যেনো কোন নিয়ন্ত্রণ নেই তার। কোনো এক অজানা আকর্ষণে ছুটে চলেছে তার শরীর, কোনো এক অজানা মায়া কে অনুসরণ করে, আর রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেদ করে শুধু ভেসে উঠছে রমেনের স্বর, 
"ও দিদি শুনছেন, একটু দাড়ান, দিদি দাড়ান। "

যখন রমেনের চোখ খুললো সে দেখলো কিছু লোক তাকে ঘিরে দাড়িয়ে। সকালে ক্ষেতে জল দিতে গিয়ে তারা রমেনকে ক্ষেতের ধারে কাদা জলে পরে থাকতে দেখে। তারা পাছে রমেনকে পাগল মাতাল ভাবে তাই রমেন আর তাদের গত রাতের কথা বললো না। রমেন বললো যে না সে অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে পা পিছলে পড়ে গেছিলো। সবাই আজও তাই জানে যে সেদিন অমাবস্যার রাতে রমেন অন্ধকারে পা পিছলে পড়ে যায়। কিন্তুু সত্যিটা শুধু জানে রমেন। আজও কখনো ঘুমের মধ্যেই রমেন চিৎকার করে ওঠে " দিদি দাড়ান, একটু দাড়ান" ।