Thursday, March 17, 2022

লটারি

সকাল সকাল ছেলে সুভাষের ফোন পেয়ে একটু আশ্চর্যই হলো আজ রমেন বাবু।

সুভাষ : হ্যালো বাবা....কেমন আছো ?

রমেন বাবু : হম ভালো আছি..তোরা ভালো আছিস তো ? বৌমা আর দাদু ভাই কেমন আছে ?

সুভাষ : সবাই ভালো আছে বাবা...রমা তো রোজই বলে তোমার কথা...
আচ্ছা বলছি বাবা বিভাস কাকার কাছে শুনলাম তুমি নাকি লটারি পেয়েছ..!!??

রমেন বাবু : ( একটু লজ্জা পেয়ে ) আরে....ওই মানে..এই কদিন আগেই পেলামরে…তোদের সাথেতো তেমন কথা হয়না তাই জানানো হয়নি...সেদিন বিভাসের সাথে দেখা হওয়াতে ওকে বললাম...

সুভাষ : কত টাকার জিতলে ? 

রমেন বাবু : ওই ফার্স্ট প্রাইজ ছিল ২০ লাখ...সেটাই পেয়েছি...তবে টাকাটা এখনও পাইনি.... লটারির অফিস থেকে বললো পরের মাসে লটারী ইন্সপেক্টর আসবে। সে এসে টিকিট দেখে টাকা দেবে..

সুভাষ : সেসব ঠিক আছে...কিন্তু এত গুলো টাকার ব্যাপার...তুমি পাড়ায় একে তাকে বলে বেরিও না..আচ্ছা দিদি জানে নাকি ?

রমেন বাবু : না এখনও আমি তো তোর দিদিকে বলিনি..
তাই মনে তো হয়না তোর দিদি জানে...
( হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠলো )
আচ্ছা দাড়া কেউ এসেছে মনে হয়...
( ফোন হাতেই গেট খুলতে গেলেন রমেন বাবু )

গেট খুলতেই দেখলেন সামনে দাড়িয়ে তার মেয়ে, জামাই আর আদরের নাতনী রাণী.
 
রমেন বাবু : আরে গীতা...!!! সকাল সকাল তুই জামাই সবাই একসাথে !!!?? সব ঠিক আছে তো ?

গীতা : আরে বাবা হঠাৎ তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। তোমার জামাই বললো চলো তবে দেখে আসি বাবাকে...

রমেন বাবু : হ্যাঁ...ভালো করেছিস আয় ভেতরে আয়..
এই দেখ ভুলেই গেছি সুভাষও আজ ফোন করেছিল..পর ফোনটা কাটাই হয়নি..
" হ্যাঁ...হ্যালো সুভাষ..বাবা তোর দিদি জামাই বাবু এসেছে রে...আমি রাখছি তোকে পড়ে ফোন করবো..

( এই বলে ফোনটা রাখলো রমেন বাবু )

রমেন বাবু : তারপর বল বাবা জীবন কেমন আছো তোমার ? সেই তোমার শাশুড়ি মা গত হবার পর এই এলে। তো বল আজ কি খাবে ? বাজারটা তাড়াতাড়ি সেরে আসি নইলে এরপর আর ভালো কিছু পাবও না।

গীতা : আরে বাবা ধুর তুমি একটু বসো তো.....শরীর কি হাল বানিয়েছ !!!!! খাওয়া দাওয়া ঠিক করে করছো না নিশ্চয়ই....গঙ্গার মা ঠিক করে খেয়াল রাখছে না তোমার দেখছি। আসুক আজ দেখাচ্ছি মজা.....
 (এবার গীতা তার বরের উদ্দেশ্য বললো)
আরে তুমি বসে দেখছ কি.... যাও বাজারটা করে নিয়ে এসো... বাবার বাজার গিয়ে কাজ নেই...

রমেন বাবু : আরে তোর গঙ্গার মাকে আমি অনেকদিন আগেই কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছি....আর তোরা একবেলার জন্য এসেছিস তার মধ্যে আর বাবা জীবন কে বাজার যেতে হবে না। বাবার কাছে এসছিস বল কি খাবি আমি ই নিয়ে আসছি।

গীতা : ওমা.....সেকি কথা.... ও তো নিজের বাড়ি তেও বাজার করে...
(নিজের বর কে একটু রাগ দেখিয়ে)
এই যাওনা করে এসো বাজারটা....বাবাকে একদম যেতে দেবে না...।
( নিজের বাবার উদ্দেশ্যে)
আজ বাজারটা তোমার জামাই ই করুক....., আমরা তো আছি এখন কদিন, তুমি না হয় অন্যদিন কর....
তোমার নাতনির তো স্কুল ছুটি পড়লো....আর কদিন ধরে খুব তোমার কথা মনে পড়ছিল তাই ভাবলাম একমাস না হয় থেকেই আসি তোমার কাছে....

রমেন বাবু : বাহ ভালো করেছিস....তবে তোরা ওই কোথায় সব ঘুরতে যাস ছুটিতে সেগুলোতে যাবিনা এবার আর ?

গীতা : না...না সেসব তো যেতেই থাকি....তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল তাই ভাবলাম একটু না হয় থেকেই আসি। মা তো আর নেই। এখন তো তুমিই সব।
(এই বলে একটু চোখ টা মুছে নিলো গীতা )
 
রমেন বাবু : হমম সে তো ঠিক কথাই....হঠাৎ করেই চলে গেলো তোর মা...
( রমেন বাবু একটু দুঃখী হয়ে )

গীতা : আরে বাবা রাখো পুরনো কথা....বল আর বাকি তোমার....
গঙ্গার মাকে ছাড়ালে কেন ? খাওয়া দাওয়ার তো বিশেষ যত্ন নাওনা মনে হচ্ছে....শরীরের যা হাল বানিয়েছ...
নাহ্....তোমার জামাই বাজার থেকে আসলে আমি সাফ বলে দেবো....আমার বাপের আগের চেহারা না ফিরিয়ে আমি আর যাচ্ছি না বাপু এই বাড়ি থেকে....।

রমেন বাবু : (একটি হাসলেন) আরে নানা ধুর আমার সব ঠিক ই আছে....বাবা জীবন আর অফিস থাকে.... রানী মার স্কুল আছে...তুই থাকলে হবে নাকি....না না আমি সব সামলে নেব...

গীতা : রাখো তো তোমার সামলানো.....ওসব আমি আর শুনছি না…..তুমি ই শেষ সম্বল আমাদের...না না আমি এখন নড়ছি না এখান থেকে....

রমেন বাবু : ( একটু হেসে ) কি যে করিস বাচ্চাদের মতন....

গীতা : হম.....
ও তোমায় তো বলাই হয়নি....সেদিন তোমার জামাইয়ের সাথে বিভাস কাকার দেখা...
সে তো তোমাদের জামাই কে সে জড়িয়ে ধরে বলছে শশুর লটারি পেয়েছে এবার জামাই মিষ্টি খাওয়াবে.....
কি আশ্চর্য বলতো.....আমরাতো জানিই না কিছু....

রমেন বাবু : একটু ইতস্তত হয়ে....আরে হ্যাঁ মনে তোদের আর জানানো হয়নি রে.…..এই দুদিন আগেই রেজাল্ট এলো.... ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছি ২০ লাখ টাকার.....তবে টাকাটা এখনও পায়নি...পরের মাসে লটারি অফিসার আসবে সে দেখে শুনে তারপর টাকা দেবে...
আর উফফ এদিকে এই বিভাস টাও না....ওদিকে তোর ভাই কেও বলেছে....

গীতা : ( একটু গম্ভীর হয়ে ) ও ভাই জানে...

(সুভাষের বাড়িতে.........)

সুভাষের বউ : কি গো বাবা কি বললো ? সত্যি লটারি পেয়েছে ? কত টাকার ? আমাদের কত দেবে ?

(সুভাষ কিছুক্ষন চুপ থেকে....)

সুভাষ : হম লটারি তো পেয়েছে কিন্তু......

সুভাষের বউ : কি কিন্তু ? কি বুড়ো কিছু দেবে না বলছে নাকি ? বলি হারি তোমার বাপের....আর কদিন বাঁচবে এখনও টাকা টাকা করছে....আরে তুমি তো একমাত্র ছেলে তোমায় তো সবটা দিয়ে দেওয়া উচিত। আমার মা বাবা হলে কখনোই এরম করতো না।

সুভাষ : আরে ধুর না না সেরকম কিছু না। ব্যাপারটা হলো দিদি মনে হয় ব্যাপারটা জানতে পেরেছে। জামাই বাবু কে নিয়ে বাবার কাছে পৌঁছে গেছে। এই আমি ফোন করেছিলাম তখনই ঢুকলো বাবা বললো।

সুভাষের বউ : ওমা সেকি গো.....তাহলে তো তুমি আর কিছু পাবে না। ওই মেয়ে দেখবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সবটা নিজে নিয়ে কেটে পড়বে...তুমি তো বাড়ির ছেলে। তোমার অধিকারট তো আগে হওয়া উচিত। মেয়ে তো বিয়ে দিয়ে দিয়েছে তার অধিকার আসে কোথা থেকে...!!!!!!!!

সুভাষ : হম সেটাই তো.....কিন্তু বাবাকে এসব বোঝাবে কে.....বাবাতো মেয়ে বলতে অজ্ঞান...!!!!

সুভাষের বউ : হম....সে তো ঠিকই...কি করা যায় বলতো ?????
একবার যাবে নাকি ঐ বাড়ি ? কদিন গিয়ে একটু ওই বুড়ো কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে যদি নিজের ভাগটা নিয়ে নেওয়া যায়....

সুভাষ : হম সে তো যাওয়া যায় কিন্তু তুমি যে বললে মা বাবা আসবে এই সপ্তাহে....তারা বুড়ো মানুষ আসবে কত দিন থাকবে বললো....এখন না বললে তারা কষ্ট পাবে না ???!!!

সুভাষের বউ : না না ও মা বাপিকে আমি বুঝিয়ে বলে দেবো। তুমি চাপ নিও না। চলো বরং ওই বাড়ি যাই তোমার বাপের কাছ থেকে ভাগটা বুঝে নিতে....

সুভাষ : হম সেই বরং ভালো...

(রমেন বাবুর বাড়িতে.......)

রমেন বাবু : রান্নাটা কিন্তু খাসা করেছিস মা.... পোনা মাছের ঝালটা যা সুন্দর হয়েছিল...পুরো যেন তোর মায়ের হাতের রান্না.... বাবা জীবন মাছ টাও খুব ভালো এনেছিল...

গীতা : (একটু হেসে.....) হম এবার থেকে আমি রোজই এরম রান্না করে আমার বাবাকে খাওয়াবো.....
(গীতা নিজের স্বামীর উদ্দেশ্যে....)
এই শুনে নিয়েছো তো বাবা যা যা মাছ ভালো খায়....তুমি সেগুলো সব কাল এনে দিয়ে তারপর অফিস যাবে...

(গীতার স্বামী মাথা নেরে সম্মতি জানালো....)

রমেন বাবু : আরে না না ধুর....এত ঝামেলার কি দরকার....তোরা এসছিশ দেখা করতে....এটাই অনেক আনন্দের...

( হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো.....)

রমেন বাবু : হ্যালো.....

সুভাষ : বাবা সুভাষ বলছি....বলছি শোন না....দিদিরা এসছে ওরা কি থাকবে ? 

রমেন বাবু : হ্যাঁ....তোর দিদি বললো কদিন থেকে নাকি আমার শরীর স্বাস্থ্য সব ভালো করে তারপর যাবে...এই তো খেয়ে উঠলাম...কি সুন্দর পোনা মাছের ঝাল বানিয়েছিল পুরো তোর মায়ের মতন...

সুভাষ : হম বাবা বলছিলাম যে তোমার বৌমাও বলছে ছেলের ছুটি আছে...কদিন তোমার ওখানে ঘুরে আসতে...তো কাল সকালে আমরা তিন জন আসছি....দিদির সাথেও দেখা হয়ে যাবে...

রমেন বাবু : আচ্ছা বাবা আয়...

( ফোনটা রাখলেন রমেন বাবু......)

গীতা : কি হলো বাবা ? কে আসছে ?

রমেন বাবু : আরে তোর ভাই...তুই এসেছিস শুনে ওদেরও আসার ইচ্ছে হয়েছে...কাল দাদু ভাই আর বৌমা কে নিয়ে আসছে....

( সন্ধ্যাবেলা.....)

(গীতা নিজের স্বামী উদ্দেশ্যে.....)

গীতা : ওই শুনেছ...কাল ভাই বউ ছেলে নিয়ে আসছে....

গীতার স্বামী : ব্যাস....হলো কাণ্ড....! এবার তো তোমার ভাই এসে নিজের অভাবের কান্না কাঁদবে আর তোমার বাপ সব ছেলেকে লিখে দেবে....আদরের ছেলে বলে কথা....তুমি হচ্ছো বোকা...তোমার আর কিছু জুটবে না...

গীতা : কি বলব....বাবাতো ছেলেকে যেনো চোখে হারায়....দেখি কাল যদি কিছু উল্টো পাল্টা দেখি আমি তো ছেড়ে কথা বলবো না....এই তোমার ঐ এক উকিল বন্ধু আছে না.... দরকারে তার সাথে কথা বলে রেখ....ভাগ ছাড়া যাবেনা...এখন তো আইনও বলে মেয়েরা সমান ভাগিদার বাবার সম্পত্তির...আর বলছি শোনো কাল অফিসটা ছুটি নাও কিছু দরকার পড়তে পারে কাল কেই একটা দফারফা করতে হবে...

(পরদিন সকালে সুভাষ ছেলে বউ নিয়ে হাজির....

রমেন বাবু : আয় আয় ভেতরে আয়....

সুভাষের বউ : ( রমেন বাবু কে একটা প্রণাম করে...) ভালো আছেন বাবা ? কত দিন দেখি না আপনাকে....আমি তো কত বলি চলো একটু বাবার কাছে যাই...না হয় ওনাকেই একটু নিয়ে এসো....কিন্তু এই আপনার ছেলে অফিস অফিস করেই শেষ....

রমেন বাবু : আরে বৌমা....আরে ও উচু পোস্টে চাকরি করে...ওর কি আর অত সময় আছে...উচু পোস্টে কত কাজের চাপ...

সুভাষ : ঠিক বলেছো বাবা....
(নিজের বউ আর উদ্দেশ্যে.....)
দেখো দেখলে বাবা ঠিক ছেলের অসুবিধাটা বোঝে.....

রমেন বাবু : আয় আয়.....এসব থাক আগে জল খাবার টা খেয়ে নে...তোর দিদি লুচি বানিয়েছে....

(জল খাবার খেতে খেতে....)

সুভাষ : আচ্ছা বাবা....তুমি লটারির কথাটা এদিক ওদিক বলে বেড়াচ্ছে কেনো ?

রমেন বাবু : আরে আমি কাউকে বলিনি....তোর বিভাস কে বলেছিলাম ব্যস্ ও সব জায়গাতে বলে বেড়াচ্ছে.....

সুভাষ : আরে তুমি আমাদের না বলে বিভাস কাক কে বলতেই বা গেলে কেন... জানোইতো লোকজোন কেমন....একলা থাকো...রাত বিরেতে কোনো বিপদ হতেই তো পারে.... চোর ডাকাতের কি অভাব বলতো....!!!!!

গীতা : হম বাবা ভাই এর কথা টা কিন্তু ঠিক....এত গুলো টাকা তোমার কাছে থাকা কিন্তু ঠিক না।

সুভাষ : বাবা বরং একটা কাজ করতে পারো...তুমি আমার ব্যাংকে রেখে দাও...তোমার যখন লাগবে আমি তুলে দিয়ে দেব....

গীতা : না সে তো তুমি চাইলে তোমার জামাইয়ের ব্যাংকেও রেখে দিতে পারো...তোমার লাগলেই আমি তুলে তোমায় দিয়ে যাবো...। তোমার জামাইতো ব্যাংকেই চাকরি করে....কোনো অসুবিধাই হবে না....বল তাহলে বলবো কি তোমার জামাই কে....

( টাকা হাত ছাড়া হচ্ছে দেখে সুভাষ তাড়াতাড়ি বলে উঠলো......)
সুভাষ : আরে না না....জামাই বাবু কে কষ্ট করার কি আছে....আমার তো সরকারি ব্যাংকেই অ্যাকাউন্ট আছে....আর আমার পোস্টিং টাও এবার চেঞ্জ হয়ে আমাদের পাড়ার কাছেই হবে...
( গীতার উদ্দেশ্য....)
তোদের অত দূর থেকে হুটহাট করে আসতে অসুবিধা হবে....
তার চেয়ে বাবা তুমি আমার অ্যাকাউন্টই টাকাটা রেখে দাও...

রমেন বাবু : দেখ রাখা তো যে কারুর কাছেই রাখা যায়....কিন্তু দেখ কথা টা হলো...আমি এখনও কিছু ভাবিনি....তোরা আছিস তো.... থাক কদিন আমি একটু ভাবনা চিন্তা করি....তারপর না হয় একটা কিছু ঠিক করা যাবে....

সুভাষ : আচ্ছা বাবা লটারিটা কোথায় রেখেছে ? মনে যত্ন করে রেখেছ তো ? এদিক ওদিক না হয়ে যায় আবার....

রমেন বাবু : (একটু হেসে.......) দাড়া একটা জিনিস দেখাই....
এই বলে ভেতরে নিজের ঘর থেকে একটা ছোট্ট লোহার সিন্দুক নিয়ে এলেন....

সুভাষ : এটা কি বাবা ? 

রমেন বাবু : এটার মধ্যেই আছে লটারি....আর এর চাবি থাকে আমার কোমরে বাঁধা...তাই এদিক ওদিক হবার কোনো সুযোগ নেই....

(এই দিনের পর থেকে শুরু হলো রমেন বাবুর সেবা পাবার পালা...বৌমা আর মেয়ের সেবার চোটে রমেন বাবুর জীবন কালেই স্বর্গ দর্শন হবার জোগাড় হল....
এত সেবা বহুকাল জোটেনি রমেন বাবুর...সুভাষ আর গীতার মা বেচেঁ থাকা কালীন এরম আদর যত্ন হতো তার। কিন্তু সে গত হবার পর...খুব কষ্টেই দিন কাটছিল তার....কিন্তু আবার বহুকাল পর মেয়ে, জামাই , ছেলে বৌমা সবার এত সেবা যত্ন পেয়ে সত্যি তার মন আনন্দে ভরে উঠলো...তার উপর নিজের দুই নাতি নাতনির কাছ থেকে দাদু ডাক আর তাদের সাথে খেলা করার আনন্দ সব মিলিয়ে রমেন বাবুর খুশির আর শেষ ছিল না....
এরম তাই তো সে চেয়েছিল...অবশেষে এই লটারির জোরে তার ইচ্ছে পূর্ণ হলো..
এভাবেই দেখতে দেখতে প্রায় এক মাস কেটে গেল.....)

( হঠাৎ একদিন সকালে রমেন বাবু কে অনেক বেলা অবদি শুয়ে থাকতে দেখে সুভাষ আর গীতার একটু সন্দেহ হলো....
বাইরে থেকে অনেক ডাকা ডাকির পরও কোনো ফল না পেয়ে বাধ্য হয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখে বিছানায় পড়ে রয়েছে রমেন বাবুর নিষ্প্রাণ দেহটা...
হ্যাঁ রমেন বাবু ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন....)

সুযোগ বুঝে তাড়াতাড়ি সুভাষ কোমর থেকে চাবিটা বার করে সিন্দুকটা খুলতে গেল....

(গীতা অমনি গম্ভীর সুরে তার ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো....)

গীতা : দাড়া.....ওই সিন্দুক খুলে তুই কি ভাবলি ওই টাকা একা তুই নিবি....শুনে রাখ ওই টাকা যদি সমান ভাগ না হয় তাহলে আমি এখুনি পুলিশ ডেকে বলবো টাকার লোভে তুই আর তোর বউ মিলে বাবাকে খুন করেছিস....

সুভাষ : সেই.....তুই বলার কে রে......বিয়ে করেছিস....শশুর বাড়ী সামলা.....এখানে এসব নাক গলাতে আসিস না...

গীতা : গলাবো....একশো বার গলাব....আমার বাপের টাকা...আমি ছাড়বো না...
( নিজের স্বামীর উদ্দেশ্যে গীতা....)
এই তুমি পুলিশকে ডাকোতো...আর তোমার ঐ উকিল বন্ধুকেও ডাকো...দেখি আজ কি করে কেউ আটকায় আমায়....

(অবস্থা বেগতিক দেখে সুভাষের বউ বললো....)

সুভাষের বউ : আরে দিদি তুমি রাগ করছো কেন...? 
( স্বামীর উদ্দেশ্যে....)
এই শোনো বলি কি এসব না করে টাকাটা অর্ধেক করে নিলেই তো হল....১০ লাখ টাও তো কম নয়....থানা পুলিশ করলে শেষে কারুরই কিছু জুটবে নাহ্।

গীতার স্বামী : কথাটা কিন্তু ঠিকই.....থানা পুলিশ করলে কারুরই কিছু জুটবে না। তারচেয়ে অর্ধেক করে নাও...

গীতা : ঠিক আছে আমি রাজি...

সুভাষও কোনো উপায় না দেখে শেষে রাজি হলো....

(এবার গীতা সুভাষ কে বললো.....)

গীতা : ঠিক আছে তাহলে এবার খোল সিন্দুকটা....

ধীরে ধীরে সিন্দুক টা খোলা হলো.....
প্রত্যেকের চোখ গুলো যেন লোভে জ্বলজ্বল করছিল....
কিন্তু তার মাঝেও দুঃখে কান্নায় দুটো চোখ ছলছল করছিল.....আর বারবার তার জিজ্ঞাস করে যাচ্ছিল তাদের দাদু কেনো কথা বলছে না....
কিন্তু লোভের আলোতে আলোকিত চোখগুলোর সামনে এই দুটি শিশুর দুঃখের কোনো মর্যাদা হয়তো সেদিন ছিল না।

কিন্তু একি.....সিন্দুক খুলে যেনো বজ্রাঘাত নেমে এলো সবার মাথায়....কোথায় লটারি.....!!!!!!!!
কোনো লটারি নেই....শুধু হাতে লেখা একটা চিঠি..!!!!!

সুভাষ চিঠিটা পড়ে.....মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো.....
সুভাষের বউ : কি হলো দাড়িয়ে রইলে কেনো ? চিঠিতে লিখেছে নাকি কোথায় লটারি ? দাও দাও আমি পড়ছি....
( এই বলে সুভাষের হাত থেকে এক টান মেরে চিঠি টা নিয়ে পড়া শুরু করলো....)

আদরের সুভাষ আর গীতা....

তোরা যখন এই চিঠিটা পড়ছিস আশা করি আমি তাহলে আর বেচেঁ নেই....দেখ আমি জানি তোরা খুব আশা করে ছিলিস যে বুড়ো বাবার থেকে যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়.... দেখ আমি কোনো লটারি পাইনি....কিছু সপ্তাহ আগে একদিন হটাৎ করেই আমি রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে যাই...তখন তোদের বিভাস কাকাই আমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়...ডাক্তার দেখে বলে আমার ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে...লাস্ট স্টেজ...খুব বেশি হলে ১ মাস হয়তো আর বাঁচবো...বিভাস বলেছিল তোদের খবরদি কিন্তু আমি জানি তোরা আসবি না...তুই তোর বড়লোক শশুর নিয়ে ব্যস্ত আর তোর দিদি নিজের শিক্ষিত বড়লোক স্বামী নিয়ে। তাই এই বুড়ো বাপের জন্য তোদের কারুরই সময় হবে না সেটা আমি ভালো ভাবেই জানি। আর তাই বিভাসকে সবটা বলি....আর তাই তোদেরকে কয়েকটা দিন আমার সাথে রাখার জন্য বিভাস এই নাটকটা করে....আর জীবনের শেষ কটা দিন এই ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি বৌমা জামাই নিয়ে কাটানোর লোভটা আমি সামলাতে পারিনি রে তাই আমিও রাজি হয়ে গেছিলাম। তোরা পারলে আমায় ক্ষমা করিস। আর আমার বিছানার তলায় দু হাজার টাকা রাখা আছে...ঐটা দিয়ে একটি আমার শ্রাদ্ধশান্তি টুকু করে দিস...তোরা ভালো থাকিস...আমার আশীর্বাদ সবসময় তোদের জন্য রইলো...
                        ইতি 
              তোদের বুড়ো বাবা



গল্প : লটারী
লেখক : সুদীপ দে

No comments:

Post a Comment