Friday, May 1, 2020

নিখোঁজ

একটা চিৎকারে ঘুমটা ভেঙে গেলো তুহিনের। আবার অশান্তি করছে তার বাবা। এই জিনিসটা একদম ভালো লাগেনা তুহিনের, ছোটো থেকেই সে দেখছে এই এক জিনিস। প্রায় প্রতিদিনই তার বাবা বিভিন্ন কারণে ঘরে অশান্তি করে এবং তার মাকে মারধর করে। তুহিনের খুব কষ্ট হয়। মাকে খুব ভালোবাসে সে। সে অনেকবার মাকে বুঝিয়েছে যে সে যেন তার বাবাকে ছেড়ে দেয়। তার মা আর সে এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকবে। তুহিন না হয় কোথাও একটা ছোটো খাটো কাজ করবে তাতে চলে যাবে তাদের। কিন্তু অনেক বুঝিয়েও মাকে রাজি করাতে পারেনি তুহিন। তার মার আসলে অনেক স্বপ্ন তুহিনকে নিয়ে, সে চায় তুহিন ভালো করে পড়াশুনা করে অনেক বড়ো হোক। লোকে যেনো তাকে তুহিনের মা বলে সম্মান করে, তাই শত কষ্ট, লাঞ্ছনা সত্বেও নিজের স্বামীকে ছেড়ে যায়না সে। যতই হোক তুহিনের খাওয়া পড়ার খরচ তো তার স্বামীই চালাচ্ছে, তাই ছেলের মুখ চেয়ে সব সহ্য করছে। তুহিন এসবই বোঝে কিন্তুু যখন তার বাবা তার মাকে মারধর করে তখন যেন নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনা তুহিন। মনেহয় যেন তার মার এই অবস্থার জন্য সেই দায়ী। এসব ভাবছিল তুহিন, হঠাৎ একটা খুব জোড়ে চিৎকারের আওয়াজ পেয়ে নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো তুহিন। 
বাবা, এভাবে মারছো কেন মা কে? তুহিন প্রশ্ন করলো তার বাবাকে।
"হতচ্ছাড়া ছেলে, আমার পয়সাতে খাবি পড়বি আবার আমায় প্রশ্ন করতে এসছিস??? দূর হও এখান থেকে।"
তুহিন আবার নিজের বাবাকে বললো, " তুমি যদি এভাবে মাকে মারো তাহলে কিন্তুু আমি এবার পুলিশে রিপোর্ট করবো তোমার নামে।"
এবার যেন তুহিনের বাবা আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না, রাগে যেন এক মূর্তিমান শয়তনের মত ছুটে গেলো তুহিনকে মারতে।
"খুব কথা হয়েছে তোর তাই না, পুলিশে যাবি তুই,, রিপোর্ট করবি,, দারা করাচ্ছি তোর রিপোর্ট। আজ তোকে আর তোর মাকে খুন করে আমি মুক্তি পাবো। " এই বলে একটা লোহার রড হাতে তুহিনের দিকে এগোলো তার বাবা। পেছন থেকে তুহিনের বাবার পা দুটো চেপে ধরলো তুহিনের মা, " ওকে ছেড়ে দাও, ও বাচ্চা, তোমার ছেলে ও, ওকে ছেড়ে দাও। "
"ঘরে যাও তুহিন, তোমায় আমার দিব্যি ঘরে যাও। নিজের মার কথা রাখো। ঘর থেকে বেরোবে না.." বেশ একটা আর্তনাদের সুরেই চিৎকার করে বলল তুহিনের মা।
তুহিন ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে, দরজার পেছনে দাড়িয়ে শুনতে লাগলো তার মার করুন আর্তনাদ গুলো। চোখ দুটো কষ্টে কেদে উঠলো তুহিনের।
বেলা ১২টা নাগাদ ঘড়ির শব্দে ঘুম ভাঙলো তুহিনের। নিজের অজান্তেই কাদতে কাদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।
এখন ঘর পুরো শান্ত, দরজা খুলে বেরিয়ে এলো তুহিন। তার মা বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে বললো, " গরম জল করে দিয়েছি, যাও স্নান করে এসো তুহিন, খেতে বসতে হবে "
তুহিন আশ্চর্য ভাবে তাকিয়ে রইলো তার মার দিকে,,,
এতো অত্যাচার সহ্য করেও কি ভাবে কেউ থাকতে পারে!!!! সত্যি এই জন্যই হয়তো মা সব চেয়ে মূল্যবান। নিজের সন্তানের জন্য সবকিছু মেনে নিতে পারে সে।
"কি হল,, তাকিয়ে আছিস কি??? শীতের বেলা এখন....যা তাড়াতাড়ি স্নানে যা" একটু বেশ জোরেই বললো তুহিনের মা।
"মা তুমি কেন এসব সহ্য করো বলতো?? আমিতো বলছি আমি একটা কাজ দেখছি, আমি সকালে কাজ করবো আর বিকালে পড়াশুনা করবো। কোনও অসুবিধা হবে না। আমার উপর একটু ভরসা করো একটা ছোট খাটো কাজ আমি ঠিক জোগাড় করে নেব। ও মা.. শোনো না মা..আর থেকো না এখানে। ওই লোকটা একদিন তোমায় মেরে ফেলবে।" বেশ কান্না ভেজা গলায় বললো তুহিন।
"এই দেখো পাগল ছেলে আমার, আরে পাগল এতো বর ছেলে কাদতে আছে নাকি" এই বলে তুহিনকে বুকে টেনে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে তার মা বললো ঠিক আছে এসব নিয়ে পরে কথা হবে। যাও এখন স্নানটা সেরে এসো খেতে বসতে হবে।
দুপুর দুটো নাগাদ খেয়ে উঠলো তারা দুজন। খেয়ে উঠে বাসন গোছাতে গোছাতে তুহিনের মা বললো " বেলা দুটো বেজে গেলো, তোর বাবা সেই সকালে ঝগড়া করে বেরোলো, এখনও ফিরলো না। খাবার উপরে রাগ কিসের কে জানে!!! ঘরে এসে খেয়ে যেতে পারতো। "
এবার যেন তুহিন বেশ রেগে গেলো, " মা তুমি এখনও ওই বাজে লোক টাকে নিয়ে ভাবছো!!! ভালো হয়েছে আসেনি, মুখ দেখতেও ইচ্ছে করে না.. "
"এরম বলতে নেই তুহিন, সে তোমার বাবা", বেশ একটু রেগেই বললো তুহিনের মা।
ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত ১১টা বাজলো। "তুহিন তোর বাবাতো এখনও ফিরলো না। একটু তোর সৌমেন কাকুর বাড়ি গিয়ে দেখ না তোর বাবার কোন খোঁজ পাস নাকি..." বেশ চিন্তিত ভাবেই বললো তুহিনের মা। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও খোঁজ নিতে বেরোলো তুহিন। এক ঘন্টা পরে বাড়ি ফিরলো তুহিন, না তবে তার বাবার কোন খোঁজই পায়নি সে।
দেখতে দেখতে পরদিন দুপুর হয়ে গেলো। না এখনও বাড়ি ফেরেনি তুহিনের বাবা। এবার তুহিনেরও একটু চিন্তা হল। সে নিজের মা কে বললো " কোথায় গেলো বলতো মানুষটা, দুদিন হতে চললো বাড়ি ফিরছে না!!! "
সেটা তো আমিও ভাবছি, তুই এক কাজ কর স্নানটা সেরে খেয়েনে তারপর না হয় একবার থানায় গিয়ে একটা মিসিং ডাইরি করে আয়। আজ আমি তোর জন্য খাসীর মাংস করেছি। স্নান করে এসে খেতে বসলো তুহিন। যদিও খাসীর মাংস তার খুবই পছন্দ কিন্তুু আজ যেন তার ঠিক ভালো লাগছিল না খেতে। তার মা জিনিসটা লক্ষ্য করে বললো কি হল ভালো হয়নি খেতে? এটা কিন্তু নতুন ধরনের খাসী। মন্টুর মা বললো রহিমের দোকানে নতুন খাসী এসেছে বোম্বে থেকে, খেতে একটু অন্য রকম কিন্তুু দামটা অনেক সস্তা তাই ভাবলাম তোকে একটু রান্না করেদি। তবে তোর ভালো না লাগলে আর আনবো না।
তুহিন খেতে খেতে মাথা নাড়িয়ে বললো, " না না ঠিক আছে খারাপ না, দাম কম হলে আনতে পারো । "
খেয়ে উঠে পুলিশ স্টেশন গেল তুহিন তার বাবার নামে মিসিং রিপোর্ট লেখাতে।
আরো একটা দিন কেটে গেল। না আজ ও ফিরলো না তার বাবা। তুহিন একটু চিন্তিত ভাবেই তার মাকে জিজ্ঞাস করলো " কি ব্যাপার বলতো, দুদিন হয়ে গেলো কিন্তুু বাবাতো ফিরলো না। এদিকে ঘরে খাবার ও প্রায় শেষ। বাবা টাকা না আনলে আমরা চলবো কি করে মা??? আমরা খাবো কি....???"
"তুই চিন্তা করিস না আমি আছি তো,, তুই যা গিয়ে পড়তে বস...কালকের মাংশ কিছুটা ফ্রিজে রাখা আছে আজ ওটাই করে দিচ্ছি খেয়েনে " এই বলে রান্না ঘরে গেলো তুহিনের মা।
আজ তিন দিন কাটতে চললো, না এখনও এলো না তুহিনের বাবা। তুহিন এবার কাঁদো কাঁদো মুখে তার মাকে বললো " মা....বাবা যদি টাকা নিয়ে না আসে তো আমরা খাবো কি গো, কি হবে আমাদের?? "
এবার তুহিনের মা বেশ গম্ভীর ভাবেই বললো " তুই একটা ছোটো খাটো কাজ দেখ তুহিন, যা টাকা মজুত আছে তাতে আরও এক সপ্তাহর মত চাল ডাল জোগাড় করা যাবে। আর রহিমের থেকে ধারে কিছুটা মাংশ এনে রাখছি। রহিম তোর বাবার ছোটো বেলার বন্ধু তাই আমাদের বিপদে পাশে দাড়াতে রাজি হয়ে ধারে জিনিস দিতে রাজী হয়েছে কিন্তুু তুই এর মধ্যে কোনো একটা কাজ দেখ। "
দিন কেটে চললো কিন্তুু তুহিনের বাবার কোনো খোঁজ মিললো না। রোজ সকালে তুহিন কাজ খুঁজতে বেরোয়। যেকোনো কাজ একটা হলেই হবে তার। শুধু বদলে কটা টাকা দিলেই হবে কিন্তু না কিছুই লাভ হয়না। রোজ রাতে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফেরে তুহিন। এখন যেন তুহিনের রোজের রুটিন হয়ে গেছে রোজ সকালে সেই রহিমের বোম্বাই খাসীর ঝোল খেয়ে বেরোনো তার পর সারাদিন নানা অফিস থেকে ধাক্কা খেয়ে নিরাশ হয়ে রাতে বাড়ি ফেরা। দেখতে দেখতে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল। তুহিন তার মায়ের করুন মুখটার দিকে যেন আর তাকাতে পারে না। এমনই অকর্মন্ন সে,  একটা কাজ খুঁজে দুটো টাকা রোজগার করেও মাকে দিতে পারছে না। এসবই ভাবছিল তুহিন হঠাৎ একটা ফোন এলো, হ্যালো, তুহিন অধিকারী বলছেন ? আমি নেবুলা কোম্পানী থেকে বলছি, আপনি গতকাল আমাদের এখানে ইন্টারভিউ দিয়ে গেছিলেন, আপনি ইন্টারভিউতে সিলেক্ট হয়েছেন। আপনি কাল সকালে অফিসে এসে জয়নিং ফর্মালিটিটা পূর্ণ করে যাবেন। তুহিন ঠিক করলো কাল জইনিং লেটার একেবারে এনে মাকে দেখিয়ে সারপ্রাইজ দেবে। পরদিন সকালে না খেয়েই একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলো তুহিন। মাকে বলে গেল মা আমি এসে খাবো। দুপুরের মধ্যে জইনিং লেটার নিয়ে বাড়ি ফিরছিল সে। রহিমের দোকানের পাস থেকে ফেরার সময় তার মনে হলো, তার রহিম চাচা তাদের খারাপ সময় সাহায্য করেছে তাই এই খুশির খবরটা তাকেও একবার বলা দরকার।
"ও রহিম চাচা কেমন আছো? যেন আমি চাকরি পেয়ে গেছি। বাবা মিসিং হবার পর তুমি আমাদের পাশে দাড়িয়ে ছিলে.....তার জন্য অনেক ধন্যবাদ...তবে তোমার বোম্বাই এর খাসী দামে কম হলেও খেতে কিন্তুু  তেমন ভালো না।" এই বলে নিজের হাতের খাম থেকে জইনিং লেটারটা বার করে দেখাল সে।
"শুনে খুব খুশি হলাম তুমি চাকরি পেয়েছ কিন্তুু বাবু আমি তো কোনো বোম্বের খাসী বিক্রি করি না। আমি তো তোমার কাছে এই প্রথম শুনলাম এটা।" বেশ আশ্চর্য্য ভাবেই বললো রহিম চাচা।
"কি বলছো চাচা মা তো তোমার থেকে ধার করে নিয়ে যেত। গত এক সপ্তাহ ধরে ওই খাসী খেঁয়েই তো আছি আমি আর মা। তোমার বয়েসের সাথে সাথে স্মৃতি শক্তি টাও গেছে মনে হচ্ছে.." এই বলে হাসতে হাসতে নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সে।
সত্যি রহিম চাচার কি ভুলো মন.....তবে সত্যি কি ভুলো মন নাকি তার বন্ধুর পরিবারের সবার সামনে মান সম্মান নষ্ট না হয় তাই ধারের কথাটা এরম অস্বীকার করে গেলো!!!??? সত্যি কত বর মন রহিম চাচার...শ্রদ্ধায় বুকটা ভরে উঠলো তুহিনের। বাড়ি এসে তুহিন দেখলো দরজায় তালা বন্ধ। অনেক সময় তার মা দুপুরে পাশের বাড়ির মন্টুদের বাড়িতে যায় পানের আসরে সেটা তুহিন জানতো আর চাবিটা দরজার পাশের টবের নিচে রেখে যায়। তুহিন চাবিটা বার করে ঘরে ঢুকলো। হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হল সে। সকাল দিয়ে কিছু খায়নি। খুব খিদে পেয়েচে। মাকে ডাকবে কি একবার...??? না থাক গল্প করছে করুক। এই এক সপ্তাহ খুব খারাপ সময় গেছে তাদের....একটু মন খুলে হাসেওনি তার মা....আজ একটু গল্প করুক। আজ তো তাদের খুশির দিন। সব কষ্টের অবসান তাদের। আর খাবার তো ফ্রিজে আছে সে একটু না হয় গরম করে নেবে।
কিন্তুু একি.......কালো কাপড় দিয়ে মুড়ে কি ঢাকা রয়েছে এটা ফ্রিজের ভিতর!!!!!
কাপড়টা সরাতেই যেন বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল তুহিনের...... 
নিজের চোখ কে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না তুহিন!!!!
ফ্রিজে কালো কাপড়ে মুরিয়ে রাখা হয়েছ তারই হারিয়ে যাওয়া বাবার কাটা মুন্ডু!!!!!!!!!!!!!!!
তুহিনের মনে হচ্ছিলো সে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
হঠাৎ বাইরে থেকে তুহিনের মার স্বর ভেসে এলো ,
" তুহিন তুই এসে গেছিস নাকি, এতো আগে আসবি বলে যাবি তো। তোর জন্য আজ বোম্বাই খাসীর মাথার ঝোল করবো ভেবেছিলাম। তুই হাত পা ধুয়ে নয় আমি করে দিচ্ছি ততক্ষনে। "

No comments:

Post a Comment