তবে একবার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল তবে তা ভূত নাকি অদ্ভুত তা আমি জানি না। সেটা না হয় আপনারাই বিচার করুন।
তখন আমি কলেজে পড়ছি। বেশ ভালই ছিল দিনগুলো। কলেজে বন্ধুদের সাথে ক্যান্টিনে আড্ডা দিয়ে ভালই কাটছিল আমার। একজন গার্লফ্রেন্ডও জুটিয়ে ছিলাম। শুধু একটাই অসুবিধা ছিল। আমাদের বাড়িতে দুটো রুম। একটা মা বাবার আর একটায় আমি আর ভাই থাকি। ভাই বড়ো হয়েছে তাই ওর সামনে রোজ রাতে ফোনে প্রেম করাটা একটু দৃষ্টিকটু লাগবে। অগত্যা রাতে কথা বলার উদ্দেশ্যে আমি রাতে ছাদে শোয়া শুরু করলাম। তবে বাড়িতে অজুহাত দিলাম যে ঘরে গরম লাগে রাতে আমার তাই নিলি বিলি ঠান্ডায় আমি ছাদে শোবো। অগত্যা শুরু হল আমার ছাদে শোয়া। রাতে খোলা আকাশের নিচে হাতে সিগারেট সাথে কানে ফোন আর ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা নিজের ভালোবাসার মানুষটার মধুর কণ্ঠস্বর। রোমান্স যেন পুরো জমে উঠতো। দিনের পর দিন এভাবে বেশ ভালই চলছিল।
একদিন এরমই কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হঠাৎ একটা আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল। ধরপড়িয়ে উঠে বসলাম।
" কে? কে ওখানে ? " বলে চিৎকার করলাম।
একেই অমাবস্যার রাত। তার উপর আবার লোডশেডিং। অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবে একটু কাছে যেতে লক্ষ্য করলাম একটা মিশকালো মূর্তি পাঁচিলের গা ঘেঁষে বসে আছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে আবার জিজ্ঞাস করলাম, " কে ? কে ওখানে ? "
এবার উত্তর এলো।
"কাছে আসবেন না বাবু " উত্তর দিল ছায়া মূর্তি।
"কে তুমি ? এখানে এলে কি ভাবে ? " জিজ্ঞাস করলাম আমি।
" বাবু , আমি চোর " উত্তর দিল ছায়া মূর্তি।
" অ্যা, চোর ? বলে কী। এই ব্যাটা তুই চুরি করতে এসছিশ। দাড়া দেখাচ্ছি মজা। " এই বলে ছাদের ধারে পরে থাকা একটা লোহার রড নিয়ে এগিয়ে গেলাম ছায়ামূর্তির দিকে।
" বাবু দাড়ান এগোবেন না " বলে আর্তনাদ করলো ছায়া মূর্তি।
আমি একটু এগিয়ে দাড়িয়ে গেলাম।
একটা বিচ্ছিরি গন্ধ নাকে এলো।
" ইশ.....কি বিচ্ছিরি গন্ধরে বাবা..." বলে আমি নাক চাপা দিলাম।
" বাবু ক্ষমা করবেন। গন্ধটা আমার থেকেই আসছে।" বললো ছায়া মূর্তিটি।
" ইশ..... ডোবার জলে স্নান করিস নাকি....??? কি গন্ধরে বাবা...এই তোর বউ তোর পাশে শুতে পারে ?? " হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলাম আমি।
পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে মুখে দিয়ে দিয়াশলাইটা ধরাতে ধরাতে জিজ্ঞাস করলাম " হ্যারে চুরি করিস কেন ? আজ তো ধরা পড়ে গেলি....এবার তো পুলিশ পিটাবে...।"
"বাবু জ্বালাবেন না.... দয়া করে আগুন জ্বালাবেন না। " মিনতির সুরে আর্তনাদ করলো ছায়ামূর্তি।
এবার আমি মনে মনে একটু আশ্চর্য হলাম...
" কেন আগুন জ্বালাবো না কেন ? " জিজ্ঞাস করলাম আমি।
" বাবু আগুন জ্বালালে আমাকে চলে যেতে হবে। সদ্য সদ্য শরীর ছেড়ে তেনাদের দুনিয়াতে এসছিতো তাই স্থূল শরীর ধারণটা এখনও ভালো রপ্ত করতে পারিনি। অন্ধকারে ঠিক আছে কিন্তু আলোতে ঠিক ধরে রাখতে পারবো বলে মনে হয়না। আর বাবু হয়তো আপনিও ভয় পাবেন আমাকে দেখে। " বললো ছায়া মূর্তি।
" বলে কী লোকটা ? একি চোর নাকি পাগল?? " মনে মনে ভাবলাম আমি।
" কিসব বলছো....তেনাদের দুনিয়া মানে....ফাজলামো হচ্ছে? একে তো চুরি করতে এসছো তার উপর ফাজলামো মারছো। দাড়াও দেখাচ্ছি মজা। " এই বলে আমি এগোতে যাবো ......
অমনি ছায়া মূর্তি আবার বলে উঠলো...." বাবু আমি ফাজলামো মারছি না। আজ রাতে আমি মিত্তিরদের বাড়িতে গেসিলাম চুরি করতে....চুরি করে পালাতে গিয়ে তারা হুরোত পা পিছলে দোতলার ছাদ থেকে সোজা পরি পাশের পচা ডোবায়। বাবু আমি সাঁতার জানি না তাই আর উঠে আসতে পারিনি। ওই যে নারকেল গাছটা দেখছেন...প্রথমে ঠিক করি ওখানেই যাবো। কিন্তু গিয়ে দেখি ওখানেই আগে থেকেই কে বসে আছে। আমি অনেক বার বললাম আমায় একটু থাকতে দিতে। বললাম কিছুদিনের মধ্যেই একটা অন্য গাছ দেখে আমি চলে যাবো। না জানি কি বুঝলো সে....একদম দাঁত মুখ খিঁচিয়ে মারতে ছুটে এলো। আমি ভয়ে আপনার ছাদে এসে একটু আশ্রয় নিলাম। বাবু দোহাই আপনার....আমি নতুন নতুন ভূত হয়েছি। দয়া করে আমাকে এখন তাড়াবেন না। আমার খুব ভয় করছে। একটু আলো বেরোলেই আমি চলে যাব। এই কথা দিলাম আপনাকে। "
এবার আমার মনে মনে একটু হাসি এলো।
কি আজব ভূত রে.....ভয় দেখাবে কি.... এ তো নিজেই ভয় পেয়ে বসে আছে।
" আচ্ছা সে ঠিক আছে কিন্তু...এরম পচা গন্ধ আসছে কেন তোমার থেকে...? " জিজ্ঞাস করলাম আমি।
" বাবু , আপনাকে বললাম না পচা ডোবায় ডুবে মরেছি তাই ওই পাকের গন্ধই গায়ে একটু লেগে রয়েছে আর কি..." বললো ছায়া মূর্তি।
"হম....বুঝলাম...তো ঠিক আছে তবে তুমি থাকো এখানে। আমি নিচে গেলাম ঘুমাতে। তোমার এই পচা ডোবার গন্ধে তো আমার পক্ষে এখানে আর ঘুমানো সম্ভব না..." বলে মাদুর নিয়ে নিচের দিকে সিড়ির দিকে এগোলাম।
" বাবু....একটা সাহায্য করবেন ? " পেছন থেকে ডাকলো ছায়া মূর্তি।
"কি সাহায্য বলো শুনি....." জিজ্ঞাস করলাম আমি।
" বাবু আপনার দিয়াশলাই এর বাক্সটা আমায় দিয়ে যাবেন ? " বললো ছায়া মূর্তি।
" এই রে.... এ কেমন ভূত....ভূত হয়ে আগুন চাইছে। কি আশ্চর্য রে বাবা। " মনে মনে ভাবলাম আমি।
" তুমি তো ভূত তালে তুমি দিয়াশলাই দিয়ে কি করবে শুনি ? " জিজ্ঞাস করলাম আমি।
" আজ্ঞে বাবু ওই ডোবায় ডুবে কানে জল ঢুকে গেছে। একটু পরিষ্কার করবো নয় তো কেমন সো সো করছে....একেই গায়ের চামড়া সব চলে গেল...শরীরে সব জায়গা দিয়েই হাওয়া ঢুকছে তার উপর কানের এরম সো সো শব্দ ভালো লাগছে না...তাই একটু দিয়াশলাই দিয়ে পরিষ্কার করতাম আর কি..." বললো ছায়া মূর্তি।
" ঠিক আছে রাখো.." এই বলে দিয়াশলাইটা ছুড়ে দিলাম ছায়া মূর্তির দিকে।
সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলে গেলাম " চলে যেও কিন্তুু....কাল যেন আর না দেখি....রোজ রোজ তোমার পচা ডোবার গন্ধ আমি সহ্য করতে পারবো না.....মনে থাকে যেন। "
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো বাবার চিৎকারে।
" আরে খবর শুনেছো...কাল মিত্তির বাবুদের বাড়িতে চুরি হয়ে গেছে....দেখো এই জন্যই বলি গেটে সব সময় তালা মেরে রাখবে। কি বিপদ...কি বিপদ " বললো বাবা।
" আরে ধুর.....রাখো তোমার মিত্তির বাবুর কথা...সকাল সকাল আমাদের বাড়িতে কি হয়ে গেছে সেটার তো খোজ রাখো ???..." ....চিৎকার করতে করতে সিড়ি দিয়ে নামলো মা।
"কেন কি হয়েছ ?" জিজ্ঞাস করলো বাবা।
"কি হয়েছে.....দেখো গিয়ে ছাদে....ছাদে কে পায়খানা করে চলে গেছে। তার উপর পুরো ছাদে বিড়ির আধখাওয়া টুকরোতে ভর্তি.... ইশ্...কে পরিষ্কার করবে এখন....এই তুমি আমাদের ওই বাগান পরিষ্কার করে ছেলে টাকে ফোন করে ডাকো। আমি এসব পরিষ্কার করতে পারবো না । আর তোমার বড়ো ছেলে কোথায়....ডাকো ওকে ঘুম থেকে...আজ থেকে ওর ছাদে শোয়া আমি বার করছি " চিৎকার করতে করতে আমার রুমে ঢুকলো মা।
No comments:
Post a Comment