Tuesday, April 7, 2020

নিশী

অফিস থেকে আজ বেরোতে বেশ দেরি হয়ে গেলো রমেনের। আগে দিলীপ বাবু থাকা কালীন কিন্তুু এমনটা হতো না। গতমাসে দিল্লী থেকে নতুন ম্যানেজার বদলি হয়ে আসার পর থেকে এইসব শুরু। সত্যি কেনো যে দিলীপ বাবু বদলি হয়ে গেলেন। যাইহোক কি আর করবে রমেন, নতুন বিয়ে করেছে সে, হুট করে চাকরিটা তো আর ছেড়ে দিতে পারে না সে। এসব ভাবতে ভাবতে সে পা বাড়ালো স্টেশন আর দিকে। 

"দেখি যদি কপাল ভালো থাকে তাহলে যদি লাস্ট ট্রেন টা পেতে পারে।" মনে মনে ভাবলো রমেন।

 না তবে কপালটা আজ রমেনের মন্দ গেলো না, শেষ ট্রেনটা পেলো সে, আশ্চর্যভাবে আজ একটা সিট ও পেয়ে গেলো। সিট এ বসে জানলা দিয়ে অমাবস্যার অন্ধকার ভেদ করে দূরের ছোট ছোট জ্বলতে থাকা আলো গুলোকে বেশ ভালো লাগছিলো রমেনের। বেশ একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল তার । 

সে মনে মনে ভাবতে লাগলো "সত্যি কি আশ্চর্য! দিনের আলোয় কতবারই না এই রাস্তা দিয়ে গেছে সে কিন্তু আজ রাতের অন্ধকারে সব কেমন যেনো রহস্যময় অজানা মনে হচ্ছে।"

হঠাৎ তার খেয়াল এলো আজ সকালে আসার সময় সে শুনেছিল স্টেশনের অটো উনিয়নের কোন এক লিডার গত রাতে মারা গেছেন তাই আজ সন্ধেবেলা অটো বন্ধ থাকবে। 

ইস্ কথাটা আগে মনে পড়েনি কেনো তার !!!!এবার সে কি করবে। এতো রাতে পাঁচ মাইল রাস্তা একা হেঁটে যাওয়া, আজতো শিবুদাও আগে বেরিয়ে গেছে। 

কি ভুলটাই না করলো সে!!!, আগে মনে থাকলে শিয়ালদা স্টেশনের পাশে কাকার বাড়িতে চলে যাওয়া যেত। একটা রাতের তো ব্যাপার ছিলো। কিন্তু এবার কি করবে সে...!! এতো রাতে একা হেঁটে যাবে..??

হঠাৎ তার মাথায় এলো একবার অজয় কে ফোন করে দেখি যদি ও একটু বাইক করে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারে। ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করতে গিয়ে দেখে ফোন ব্যাগে নেই। 
রমেন তন্নতন্ন করে ব্যাগ খুঁজছে, 

"একি ফোনটা কি চুরি হয়ে গেলো নাকি?" হঠাৎ রমেনের মনে এলো ফোনে চার্জ কম থাকায় তার টেবিলের পিছনে ফোনটা চার্জে দিয়েছিল। এই রে ফোনটা অফিসেই রয়ে গেছে। 

রাত সাড়ে এগারোটা ট্রেন থেকে নামলো রমেন। তবে আজ স্টেশনটা যেনো অন্যান্য দিনের থেকে একটু বেশিই ফাঁকা। বাইরে বেরিয়ে একবার অটোস্ট্যান্ড এ গেলো রমেন যদি তার বিপদ দেখে কেউ তাকে নিয়ে যেতে রাজি হয়, সে দরকারে নাহয় একটু বেশি ভাড়া দিতে অসুবিধা নেই রমেনের। কিন্তুু এযাত্রায় রমেনের ভাগ্য দেবী প্রসন্ন হলো না। অনেক খুঁজেও একটা অটো পেলো না রমেন। কি আর করবে, অগত্যা হাঁটা শুরু করলো সে। 

"উফ কি অন্ধকার, মনে হচ্ছে যেনো পৃথিবী কোনো এক জাদুবলে আদিম অন্ধকার যুগ এ ফিরে গেছে। একমাত্র রমেনই বাসিন্দা যেনো  এই পৃথিবীতে।" মনে মনে ভাবলো রমেন।

ক্রমশ হেঁটে চললো রমেন। আসেপাশের বাড়ি গুলোও আজ কেমন যেন ভৌতিক মনে হচ্ছে। এই নিঝুম পরিবেশে যেনো রমেনই একমাত্র জীবিত প্রাণী। 

হঠাৎ সামনে চোখ গেলো রমেনের। কে যেনো একটা হাঁটছে। উফ রমেন যেনো হাতে চাঁদ পেলো। যাক কাউকেতো দেখলাম। দেখি একটু এগিয়ে আলাপ করি। কথা বলতে বলতে কিছুটাতো যাওয়া যাবে। যাই হোক রমেন একটু জোড়ে পা চললো। একটু কাছে যেতে রমেন দেখলো সামনে যিনি হেঁটে চলেছেন তিনি একজন মহিলা। রমেন একটু হলেও আশ্চর্য হলো,
"এতো রাতে মহিলা একলা কি করছে !!!!"

তবে রমেন সাহসী ছেলে। কোনো কুসংসার তার মনে নেই। আশুতোষ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলো সে। রমেন মনে মনে ভাবলো হয়তো মহিলাটিও তারই মতন অফিস থেকে ফিরছে। আজকালতো মফতসল এর মহিলারাও শহরে যাচ্ছে চাকরি করতে। রমেন অনেকটাই কাছে এসে গেলো সেই মহিলার। হাত পাচেক দূরত্ব তাদের মধ্যে। রমেন মনে মনে ভাবলো একবার ডাক দেবে মহিলাকে কিন্তু যদি সে ভুল বোঝে। যদি ভুল ভেবে চিৎকার করে লোক জড়ো করে বা ছুটে পালায় তাহলে তো খুবই বাজে হবে।
না না থাক আর একটু জোড়ে পা চালিয়ে মহিলার পাশে পৌঁছালে হয়তো মহিলা তাকে দেখে নিজেই কথা বলবে। 
যতই হোক এতো রাতে একা যাবার চেয়ে একজনের সঙ্গ পাওয়া খারাপ কি। আর এমনিতেও রমেনকে সুপুরুষ দেখতে। মুখ দেখেই ভালো ছেলে মনে হয়। এসব ভেবে রমেন আরো জোড়ে পা চালালো। কিন্তুু আশ্চর্য এবার যেনো মনে হলো সেই মহিলাও আগের চেয়ে জোড়ে হাঁটা শুরু করলো। 
মহিলা কি কোনো ভাবে বুঝতে পারলো যে রমেন তার পিছনে এবং সেই ভয়ে কি আরো জোরে হাটা শুরু করলো? রমেন আরও জোড়ে হাঁটা শুরু করলো। কিন্তুু আশ্চর্য সাথেসাথে মহিলাও যেনো আরো জোড়ে হাঁটা শুরু করলো। রমেনের কেমন যেনো একটা জেদ চেপে গেলো। না তাকে পেরোতেই হবে সেই মহিলাকে। রমেন আরো আরো জোড়ে হাঁটা শুরু করলো কিন্তু আশ্চর্য মহিলাও যেনো রমেনের সাথে তাল মিলিয়ে হেঁটে চললো। রমেন যতই জোড়ে হাটে মহিলাও যেনো ততই জোড়ে হাটে। রমেনের আর দিক-বিদিক জ্ঞান রইলো না। সে জানো পাগল হয়ে উঠেছে, তাকে পেরোতেই হবে ওই মহিলাকে, নাহলে তার জীবন ব্যর্থ, তার উদ্দেশ্য শুধু ওই মহিলার আগে যাওয়া। রমেন এবার রীতি মতন দৌড়াতে শুরু করলো। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে এলো। কিন্তুু সেই মহিলা এখনও একই দূরে। 
এবার রমেন ডাক দিলো "এই যে শুনছেন আপনি দৌড়াচ্ছেন কেনো। আমি আপনার ক্ষতি চাই না। ও দিদি একটু দাড়ান। ও দিদি শুনছেন। একটু দাড়ান।"

কিন্তুু কোথায় কেউ দাঁড়াবে সেই মহিলা যেনো বাতাসে ভর করে ছুটছে। রমেন আর পারছে না ছুটতে কিন্তুু তার পা যেনো আর তার কথা শুনছে না। তার শরীরের উপর আর যেনো কোন নিয়ন্ত্রণ নেই তার। কোনো এক অজানা আকর্ষণে ছুটে চলেছে তার শরীর, কোনো এক অজানা মায়া কে অনুসরণ করে, আর রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেদ করে শুধু ভেসে উঠছে রমেনের স্বর, 
"ও দিদি শুনছেন, একটু দাড়ান, দিদি দাড়ান। "

যখন রমেনের চোখ খুললো সে দেখলো কিছু লোক তাকে ঘিরে দাড়িয়ে। সকালে ক্ষেতে জল দিতে গিয়ে তারা রমেনকে ক্ষেতের ধারে কাদা জলে পরে থাকতে দেখে। তারা পাছে রমেনকে পাগল মাতাল ভাবে তাই রমেন আর তাদের গত রাতের কথা বললো না। রমেন বললো যে না সে অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে পা পিছলে পড়ে গেছিলো। সবাই আজও তাই জানে যে সেদিন অমাবস্যার রাতে রমেন অন্ধকারে পা পিছলে পড়ে যায়। কিন্তুু সত্যিটা শুধু জানে রমেন। আজও কখনো ঘুমের মধ্যেই রমেন চিৎকার করে ওঠে " দিদি দাড়ান, একটু দাড়ান" ।

No comments:

Post a Comment